ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট ২০২২

উখিয়ায় অতিদরিদ্ররা কর্মসৃজনের মজুরি টাকা পেলেও নয়-ছয় করছে জনপ্রতিনিধিরা

প্রকাশ: ২০২২-০৪-০৭ ২০:৪৭:৩৯ || আপডেট: ২০২২-০৪-০৭ ২৩:০২:৪০

# আগামীতে তালিকায় নাম রাখার জন্য টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছে দরিদ্র শ্রমিকরা।

# শ্রমিক প্রতি ২/৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ের নেওয়ার অভিযোগ।

পলাশ বড়ুয়া ও মো: ইমরান 
কক্সবাজারের উখিয়ায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান (ইজিপিপি) এর প্রকল্পে দরিদ্র শ্রমিকরা দীর্ঘদিন পর মজুরির টাকা পেলেও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে নয়-ছয় এর অভিযোগ উঠেছে।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিকের মজুরি টাকা প্রদান করা হলেও অফিস ম্যানেজ করার কথা বলে শ্রমিক প্রতি ২ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ৫ ইউপির একাধিক সদস্যদের বিরুদ্ধে বিশাল অংক হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে একাধিক শ্রমিক।

এর আগে কর্মসৃজন প্রকল্পে হাজিরায় গড়মিল, দায়িত্বপ্রাপ্ত এনজিও সুশীলনের নানা অনিয়ম ও ট্যাগ অফিসারদের সমন্বয়হীনতার কারণে শ্রমিকদের টাকা পেতে অনেক কষ্ট হয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২০২২ সালে বিশ্ব ব্যাংক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে উখিয়ার ৫ ইউনিয়নের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেয় সরকার।তৎমধ্যে রাজাপালং ১০৫৯ জন, জালিয়াপালং ৮২৬ জন, পালংখালী ১৬১৬ জন, রত্নাপালং ৪৬৫ জন, হলদিয়াপালং ১১৯৩ জন মোট ৫ হাজার ১৫৯ জন শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। দৈনিক ৪০০ টাকা করে ৫৮ দিনে পারিশ্রমিক পাবেন এসব শ্রমিক।

এদিকে অফিসের কথা বলে টাকা পাওয়া শ্রমিকদের কাছ থেকে ২/৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে রাজাপালং ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সালাহ উদ্দিন ও সংরক্ষিত ইউপি সদস্য রোকসানা বেগমের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক কবির আহমদ (ছদ্মনাম) এক শ্রমিকের ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলেন, আমার বিকাশ নাম্বারে প্রথম কিস্তিতে ৪ হাজার টাকা জমা হয়। মূহুর্তে আমি টাকার বিষয়টা সালাহ উদ্দিন মেম্বারকে জানালে তিনি তার বাড়ির সামনে বিকাশের দোকানে যেতে বলেন। আমি তাৎক্ষণিক দোকান গিয়ে টাকা উত্তোলন করি। দোকানদার ৪ হাজার টাকার মধ্যে আমাকে ২ হাজার টাকা দেয় বাকি ২ হাজার টাকা মেম্বার সালাউদ্দিন এর জন্য রেখে দেয়। টাকা গুলো কেন নেওয়া হয়েছে আসলে আমরা কিছুই জানি না।

আব্দুসালাম (ছদ্মনাম) আরো এক শ্রমিক বলেন, বৃদ্ধ মানুষ কষ্ট করে কোন রকম ৫৮ দিন পার করছি। প্রথম কিস্তিতে ৪ হাজার টাকা আমার বিকাশ নাম্বারে জমা হওয়ার পর থেকে দুইদিন পর্যন্ত আমার পিছু ছাড়েন’নি মেম্বারের মনোনীত মাঝি আবুল ফতাহ। মেম্বারের কাছ থেকে টাকা গুলো কেন দিতে হচ্ছে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলেন, আগে টাকা গুলো দিয়ে দাও পরে দেখা যাবে।

আগামীতেও শ্রমিক তালিকায় নিজেদের নাম নিশ্চিত করার জন্য মাঝি আবুল ফতাহ এর মাধ্যমে সালাহ উদ্দিন মেম্বারের কাছে যে যার মতো ২ হাজার টাকা করে জমা দেয়ার বিষয়ে একটি ভিডিও ফুটেজ এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

ফুটেজে দরিদ্র শ্রমিকরা অনুরোধ করে বলেছেন, এই বিষয় গুলো যেন সালাউদ্দিন মেম্বার না জানে। যদি সে জানে আমাদেরকে আর কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে নিবে না।

অপরদিকে প্রকল্পের নিয়মিত শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, আমরা দীর্ঘ ৫৮ দিন কাজ করলেও প্রথম কিস্তিতে মাত্র ৪ হাজার টাকা করে পেয়েছি।

এছাড়াও রাজাপালং ইউনিয়নের সংরক্ষিত ইউপি সদস্য রোকসানা বেগমের সাথে কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিকদের কাছে অফিস খরচের কথা বলে ৫ হাজার টাকা চাওয়ার একটি অডিও বার্তা পাওয়া গেছে।

অডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, অফিস আদালত রক্ষা করার জন্য কিছু টাকা তো প্রয়োজন। সালাউদ্দিন মেম্বারসহ আমরা সবাই বসে টাকা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোকসানা মেম্বার বলেন, শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ এর বিষয়টি সম্পুর্ন ভিত্তিহীন। তিনি এও বলেন, মেম্বার যখন হয়েছি এরকম অভিযোগ আসবেই। এসব অভিযোগে কিছু হবে না।

কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি সত্য নয় দাবী করে রাজাপালং ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য, মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, আমার ওয়ার্ডে ১২৪ জন শ্রমিকের নাম তালিকায় ছিল। তৎমধ্যে ১০ জন কাজ করেনি বাকি ১১৪ জন শ্রমিক যে কয়দিন কাজ করেছেন সবাই ১৯২০০ টাকা করে টাকা পেয়েছে। এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে একটি মহল।

একই ধরণের অভিযোগ পালংখালী ইউনিয়নের ১,২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বার ৩৭ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি নুর বানু মেম্বার বিরুদ্ধে উঠেছে, ওই প্রকল্পে শ্রমিকেরা কাজের মজুরি পাওয়ার পর নুর বানু মেম্বারের চাহিদা পূরণ না করায় প্রকাশ্যে শ্রমিকদেরকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।

তালিকাভূক্ত শ্রমিকদের অভিযোগ গত ৫ এপ্রিল ওই প্রকল্পের শ্রমিক সর্দার যথারীতি হাজিরা নিতে গেলে মহিলা মেম্বার নুর বানু জোরপূর্বক হাজিরা খাতা কেড়ে নেয়। ওই সময় প্রকল্প থেকে শ্রমিকদের তাড়িয়ে দেয় এবং প্রকল্পে কোনো ধরনের কাজ না করার জন্য অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ কাজ বন্ধের ঘোষণা দেয়।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইমরান হোসাইন সজীব বলেন, আমি যতটুকু জানি কর্মসৃজন প্রকল্পের টাকা শ্রমিকদের স্ব-স্ব মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে জমা হবে। সেখানে অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। তবুও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।