ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট ২০২২

বাবার ঘানি শিল্পকে আজও আঁকড়ে ধরে আছেন দুই ভাই

প্রকাশ: ২০২২-০১-১০ ১৬:৫৪:৪৫ || আপডেট: ২০২২-০১-১০ ১৬:৫৪:৪৫

 

আটোয়ারী (পঞ্চগড়) প্রতিনিধি: জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘানি শিল্পকে আজও আঁকড়ে ধরে আছেন, পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার আপন দুই ভাই। তাঁরা হলেন, শামসুল হক (৬৭) ও সলিম উদ্দীন (৬৫)। এই আপন দুই ভাই বাপ-দাদার পৈতৃক পেশাকে জীবনের শেষ বয়সে এসেও পরিবর্তন করেননি।

তাঁদের বাড়ী উপজেলার তোড়িয়া ইউনিয়নের সুখ্যাতি গ্রামে। তাঁরা ঐ গ্রামের মৃত দবির উদ্দিনের দুই পুত্র।

আধুনিক আর ডিজিটাল যুগেও আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি র্দীঘ ৫০ বছর ধরে তাঁরা এ পেশার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকিয়ে রেখেছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই শিল্প হারিয়ে গেলেও, তাঁরা হারিয়ে যাওয়ার ভিড়ে আজও লড়াকু সৈনিকের মতো এই ঘানি টেনেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছেন দুই ভাই।

শামসুল হক জানান, তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমি বড়। আমার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন বাবা মারা যান। তারপর কয়েক বছর পরে মাও মারা যান। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর অভাবের সংসারের হাল ধরতে হয় দুই ভাইকে। সেই দিন কোনো কূল কিনারা খুঁজে না পেয়ে বাবার রেখে যাওয়া পেশা ঘানি শিল্পটাকে বেছে নিয়েছি।

ঘানি টানার পাশাপাশি জমিতে কৃষি কাজও করেছি। এভাবে টাকা উপার্জন করে ছোট বোনকে বিয়ে দিয়েছি। এই করে চলতো আমাদের সংসার।

এখন আমার পরিবারে ৫ জন ছেলে-মেয়ে। সবাইকে বিয়ে দিয়েছি। ছেলেরা কৃষি কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা-বানিজ্য করেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোনো মতে জীবন-যাপন করছে। নাতি-নাতনিরা স্কুল-মাদ্রসায় পড়াশুনা করছে।

সলিম উদ্দীন জানান, তখনকার দিনে ঘানি সরিষা তেলের চাহিদা খুব বেশি থাকায় বড় ভাই (শামসুল হক) বাবার রেখে যাওয়া ঘানিটা চালাতো আর আমি পৃথকভাবে কাঠের ঘানি ( গাছ ) স্থাপন করি। এমনকি এখনও ঘানি গাছ দুটো চলমান রয়েছে। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির সরিষার তেল আসায়, ঘানির খাঁটি সরিষা তেলের চাহিদা অনেকটা কমে গেছে। তাই, বর্তমানে ঘানি থেকে যে তেল উৎপাদন করি তা নিয়ে আটোয়ারী উপজেলার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ফকিরগঞ্জ, তোড়িয়া ও বারঘাটি বাজারে অস্থায়ী ভিত্তিতে মাটিতে দোকান বসিয়ে দুই ভাই পাশাপাশি বসে এখনও ঘানির খাঁটি সরিষার তেল ও খৈল বিক্রি করি ।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে চাহিদা কম থাকায় দুইদিন পরপর ২০ কেজি সরিষার ঘানি টানা হয়।‌ ২০ কেজি সরিষার দাম ১৬০০ টাকা। ২০ কেজি সরিষা থেকে ৬ কেজি তেল আসে। প্রতি কেজি খাঁটি সরিষার তেল ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করি। তেলের পাশাপাশি ২০ কেজি সরিষা থেকে ১৪ কেজি খৈল আসে। ৫০ টাকা কেজি দরে খৈল বিক্রি করা হয়। ৬ কেজি তেল বিক্রি হয় ১ হাজার ৮০০ টাকা। ১৪ কেজি খৈল বিক্রি হয় ৭০০ টাকা। তেল ও খৈল ২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০ কেজি সরিষার ঘানি টেনে মাত্র ৯০০ টাকা আয় করেন সলিম উদ্দীন এবং সমপরিমাণ আয় করেন তাঁর বড় ভাই শামসুল হক।

২০ কেজি সরিষার ঘানি টানতে সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা। গড়ে প্রতি মাসে ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। আগে ঘানির খাঁটি সরিষার তেল কেনার জন্য দুর-দুরান্তর থেকে মানুষজন বাড়ীতে ভিড় করতো। আগে চাহিদা বেশি থাকায় প্রতিদিন ৩০ কেজি থেকে ১ মন সরিষার ঘানি টানতাম। এখন চাহিদা কম হওয়ায় দুইদিন পরপর ২০ কেজি সরিষার ঘানি টানতে হচ্ছে।

র্দীঘ ৫০ বছর ঘানি শিল্পের আয় দিয়েই তেমন কিছুই করতে পারেননি শামসুল ও সলিম দুই ভাই। তবে এই ঘানি থেকে যে টাকা আয় হতো তা জমিয়ে জমিয়ে ছেলে-মেয়েদেরকে কমবেশি লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। শুধু সলিম উদ্দীনের পরিবারে ৬ জন ছেলে-মেয়ের মধ্যে ছোট ছেলে মোশাররফ হোসেন আটোয়ারী মির্জা গোলাম হাফিজ ডিগ্রী কলেজে স্নাতক (বি.এ) ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত।

সে জানান, এ শিল্প যেন আমার বাবার এবং চাচার রক্তের প্রতিটি কনিকায় মিশে আছে। প্রতিদিন সকালে দেখি গরুর সঙ্গে ঘানি টানছেন বাবা ও চাচা। এই তেল বিক্রির টাকায় তিনি লেখাপড়া করছেন।

প্রতিবেশী হবিবর রহমান জানান, দু’জনে কর্মঠ এবং খুবেই সহজ-সরল ব্যক্তি। এই বয়সে এখনো কৃষি কাজের পাশাপাশি দুই ভাই গরু দিয়ে কাঠের ঘানি টেনে সরিষার তেল তৈরি করে আসছেন। এটা এক বিরল দৃষ্টান্ত।