ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট ২০২২

‘অধ্যক্ষকে সাংসদের প্রহার’ যা জানালো আমাদের

প্রকাশ: ২০২২-০৭-২০ ২১:৪২:২৫ || আপডেট: ২০২২-০৭-২০ ২১:৪২:২৫

ডা. জাহেদ উর রহমানঃ

ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের মানুষ পেটানোর খবর নতুন নয়। এমন খবর আমাদের সামনে আসে নিয়মিতভাবেই। সিগারেট ব্যবসায়ীর সঙ্গে সমস্যা হওয়া কাউকে সালিশ বসিয়ে প্রকাশ্যে চড়-থাপ্পড় মারা থেকে শুরু করে রাস্তায় নিজের মোটরসাইকেল বহরকে সাইড না দেওয়ার মতো ‘তুচ্ছ’ ঘটনা তো আছেই, সাথে আছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সমস্যার তৈরির মতো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়ে পেটানোর ঘটনাও।

এযাবৎকালে আমাদের সামনে পেটানোর যেসব ঘটনা এসেছে সেগুলো একেবারেই এক তরফা। এমপি ‘মহোদয়’ পিটিয়েছেন, আর মার খেয়েছে সাধারণ মানুষ। তবে অতি সম্প্রতি তার একটা ভিন্নতা দেখা গেলো। কুমিল্লার দেবীদ্বারের সংসদ সদস্য পেটাতে গিয়েছিলেন কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দেবীদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান নিজেও খেয়েছেন পাল্টা পিটুনি।

সর্বশেষ এই ঘটনাটির পরে কী ঘটবে, তা বলা কঠিন কিন্তু তার আগের প্রতিটি ঘটনা যেখানে একজন সাধারণ মানুষ এমপির হাতে পিটুনি খেয়েছেন তারা সেটার জন্য ন্যূনতম কোনও বিচার কেউ পেয়েছেন বলে জানা যায় না। ন্যায়বিচার দূরেই থাকুক, প্রায় সবকটি ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মামলা করার সাহস পর্যন্ত পায়নি। অর্থাৎ দেশের আর সব ক্ষেত্রের মতো কোনও অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় কী হবে আর কী হবে না, সেটা নির্ভর করে অপরাধটা কে করেছেন এবং কার ওপরে করেছেন।

এই দেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সর্বোপরি রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী মানুষ যদি তার তুলনায় দুর্বল মানুষের ওপরে কোনও অন্যায় করেন তাহলে এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ভুক্তভোগীকে যত দ্রুত সম্ভব মার খাওয়া কিংবা অপমানিত হবার ক্ষোভ দুঃখ ভুলে যেতে হবে।

তাহলে বোঝা গেলো, সংসদ সদস্য হয়েও পেটানোর সময় তাদের মনে রাখা উচিত যাকে পেটাচ্ছেন তিনি কে। এটা মনে না রাখলে পাল্টা মার তো খেতে পারেনই, সেটা না হলেও পড়তে পারেন ভিন্ন রকম একটি বিপদে। যেমন পড়েছেন রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী। শুধু তার বিপদে পড়ার গল্প নয়, জনাব ওমর ফারুকের কাণ্ডটি বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতির এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি আমাদের দেখায়।

ঘটনাটি সম্পর্কে জানা যায় ৭ জুলাই ওমর ফারুক চৌধুরী রাজশাহী নগরের থিম ওমর প্লাজার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে আরও কয়েকজন অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের সামনে গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে মারধর করেন। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় সংবাদটি প্রকাশিত হয় এবং সামাজিক মিডিয়াতেও সংবাদটি ভাইরাল হয়।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকারি দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাও বিরাট প্রভাবশালী ব্যক্তি। রাজনৈতিক ক্ষমতা তো থাকেই তার সাথে অনিবার্যভাবেই থাকে অর্থনৈতিক ক্ষমতাও। সে জায়গায় একজন সংসদ সদস্যের প্রতাপ কেমন সেটা বুঝি নিশ্চয়ই আমরা। বলা বাহুল্য সেই সংসদ সদস্যের কাছে কোনও এক কলেজের অধ্যক্ষ বর্তমান বাংলাদেশে নিতান্তই তুচ্ছ। তাই এই ঘটনায় কোনও কিছুই হবার কথা ছিল না। কিন্তু ঝামেলা হয়ে গেলো ভিন্ন জায়গায়।

২০১৪ সালের পর থেকে (বিশেষ করে ২০১৮ সালের পর) ক্ষমতাসীন দল কার্যত একেবারেই বিরোধিতাহীন হয়ে পড়েছে। সরকার, দল সব একাকার হয়ে গেছে। সরকারি দলের সামনে বিরোধীরা তেমন কোনও শক্তি আর ধারণ করে না। সরকারি দলের এখনকার একমাত্র চ্যালেঞ্জ তাদের একই দলের লোকজন।

সংসদ সদস্যের হাতে অধ্যক্ষ সেলিম রেজার পিটুনি খাওয়ার তথ্য যখন ছড়িয়ে পড়ে তখন সেটা অস্ত্র তুলে দেয় এমপির বিরোধী আওয়ামী লীগের গ্রুপটির হাতে। তারাই মূলত এটা নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে। আসলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রক্সি ওয়ার বলে যে বিষয়টির কথা আমরা জানি, এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি সেটাই। না, ঠিক সেটাই নয়, এখানে আছে আরও উদ্ভট বিষয়।

প্রক্সি ওয়ার হলে তো অন্তত অধ্যক্ষ সেলিম রেজা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা, কিন্তু আমরা দেখছি তিনি সেটা করছেন না। চোখে কালশিটের দাগ নিয়ে তিনি বরং সংসদ সদস্য আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসে লিখিত বক্তব্যে জানান, তাকে এমপি মারেননি। নানা কারণে এই সংবাদ সম্মেলনটি হয়ে উঠেছে ‘ঐতিহাসিক’, সেই আলাপ করবো পরে।

এই সংবাদ সম্মেলনের পর ঘটনাটি ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। পরের দিন রীতিমত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন করেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান। তিনি জানান শুধু চোখের নিচের কালশিটে নয়, জনাব সেলিমের শরীরের অনেক জায়গায় মারাত্মক আঘাতের দাগ আছে।

তিনি সাংবাদিকদের একটি কল রেকর্ড শোনান, যেখানে অধ্যক্ষ জনাব সেলিম রেজাকে একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়, যেখানে তিনি ওই ব্যক্তিকে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন সংসদ সদস্য তাকে কেন, কোন পরিস্থিতিতে ডেকে নেন এবং কেন ও কতটা পিটিয়েছিলেন তাকে। বর্ণনাটি বেশ পুঙ্খানুপুঙ্খ।

এতেও ঘটনা শেষ হয়ে যায়নি। সংসদ সদস্য ওমর ফারুক এর একটা নিউজ পোর্টাল আছে। আওয়ামী লীগের ওই নেতার সংবাদ সম্মেলনের পর সেই পোর্টালে জনাব সেলিম একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন তার কথা বলে যে অডিও ক্লিপটি শোনানো হয়েছে সেটি তার নয়। আওয়ামী লীগের এমন ফাঁস হওয়া অডিও’র ক্ষেত্রে তারা যেমন বলেন এসব ‘সুপার এডিট’, তেমন বললেন না জবাব সেলিম। তিনি বললেন ভিন্ন কথা– সেই বক্তব্য নাকি বানানো হয়েছে তার কণ্ঠ ক্লোন করে।

ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে যাবে না নিশ্চয়ই। এখানে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা আসলে একটা বাহানা, এখানে সংঘাতে জড়িয়েছেন আওয়ামী লীগের খুব ক্ষমতাশালী দুজন মানুষ। তাই এই গল্প চলতে থাকারই কথা।

একটু আগেই বলেছিলাম জনাব সেলিমকে নিয়ে এমপি ওমর ফারুকের ‘ঐতিহাসিক’ সংবাদ সম্মেলনটিতে ঘটেছিল অবিশ্বাস্য সব কাণ্ড। জনাব সেলিম তাকে সংসদ সদস্য পেটাননি বলে স্পষ্টভাবে বলার পরও সাংবাদিকরা সেটা মেনে নিচ্ছিলেন না। উপস্থিত সাংবাদিকরা স্পষ্টভাবেই দেখছিলেন জনাব সেলিমের চোখের নিচে কালশিটে। সেটার দিকে নির্দেশ করে যখন প্রশ্ন করেন তারা– তখন অন্য কোনও একটা সংঘাতের কথা বলা অনিবার্য হয়ে পড়ে।

এমপি সাহেবকে সেই পরিস্থিতিতে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন সেখানে উপস্থিত আরেকজন অধ্যক্ষ। তিনি জানান অধ্যক্ষরা নাকি নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে হাতাহাতিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন। তখন এমপি সাহেব নাকি তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে সরান। সেই সময় পাশে থাকা আলমারি না অন্য কোনও আসবাবে লেগে জনাব সেলিম আহত হতে পারেন।

আমি নিশ্চিত পাঠকরা যারা এই ব্যাখ্যাটি পড়লেন, তাদের মনে অজান্তেই ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধের পরে বলা গল্পটি ভেসে উঠলো।

এই একটি ঘটনা নানাভাবে বর্তমান বাংলাদেশের এক চিত্র আঁকে আমাদের সামনে। এই ঘটনায় তৈরি করা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্যটি দিয়ে শুরু করা যাক। তিনি বলেন,

‘আনসার বা পুলিশের সিপাইয়ের গায়ে কেউ হাত তুলতে সাহস পায় না। কিন্তু শিক্ষক নিরীহ, ক্ষমতাহীন। সুতরাং তার ওপর দমন-পীড়ন করা যায়। এখন দমন-পীড়ন করার যেন একটা জায়গা হয়েছে আমাদের এই নিরীহ শিক্ষকরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর এ ধরনের কাণ্ড ঘটানো কারও জন্য সহজ বিষয় নয়।’

এটা নিশ্চিত এই রাষ্ট্রের সামষ্টিক স্খলন আক্রান্ত করেছে শিক্ষক সমাজকেও। চাকরি পেতে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতে অসংখ্য শিক্ষক নানা রকম আপস করেন, দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়ান। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে ক্ষমতাশালীদের কাছে শিক্ষক সমাজ কতটা মূল্যহীন সেটার স্পষ্ট প্রতিফলন আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্যে। হোক বেসরকারি, তবুও একটি কলেজ অধ্যক্ষের এক ধরনের মূল্য, মর্যাদা, এমনকি কিছু ক্ষমতা সমাজে ছিল। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে সরকার দলীয় একজন ক্ষমতাশালীর সামনে সেটা স্রেফ কিছু না – ‘আনসার বা পুলিশের সিপাই’ এর চাইতে কম।

এই দেশে ক্ষমতাশালীদের নানা অন্যায় অবিচারের প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের মুখ বুঁজে থাকার ইতিহাস নতুন নয়। ভুক্তভোগী প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মামলা করা দূরেই থাকুক, টু শব্দটি করা সাহস করেনি, এমন উদাহরণও ভুরি ভুরি। কিন্তু আমরা এখন দেখছি এক নতুন ডায়মেনশন– ভুক্তভোগী তার সব অপমান, লজ্জা, কষ্ট দূরে রেখে নিপীড়কের পক্ষে দফায় দফায় বক্তব্য দিয়ে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। কতটা ভয়ের সংস্কৃতি কাবু করেছে আমাদের চারপাশকে।

একজন অধ্যক্ষ এমপিকে বাঁচানোর জন্য পুরো দায় নিচের ঘাড়ে নিয়েছেন, কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। সাংবাদিকদের সামনে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা একজন মানুষের আত্মমর্যাদার জন্য ভীষণ হানিকর। তবুও তেমন বক্তব্য দিতে এমপিকে রক্ষা করার বিনিময়ে তিনি অনেক বৈষয়িক লাভ পেতে পারেন, এটা বোঝে শিশুও। এই দেশে এখন যে কোনও মূল্যে বৈষয়িক অর্জন হলেই হয়, সম্মান, আত্ম-মর্যাদা এসব কথা স্রেফ অর্থহীন।

সর্বশেষ কথা হলো এই ঘটনাটি ক্ষমতাসীন দলের চরম অন্তর্কোন্দল প্রকাশিত করলো।‌ দলের সাধারণ সম্পাদক বহুবার আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘মশারির ভেতরে যেহেতু মশারি টানানো না হয়’। কিন্তু সেটা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের একটা পদ পাওয়া এখন এত বড় অর্থবিত্ত আর প্রতিপত্তির ব্যাপার হয়েছে যে মশারির ভেতরে মশারি টানানো চলছেই। তার ফলশ্রুতিতেই সংঘাত। সেই সংঘাত সংখ্যায় এবং তীব্রতায় এখন বাড়ছে, বাড়তেই থাকবে সামনের দিনগুলোতে।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট