http://www.csb24.com/archives/89108

ঢাকা, , শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০

কুশলায়ন একজন মহানায়ক ও অনুপ্রেরণার বাতিঘর

প্রকাশ: ২০২০-১১-০৩ ০২:১৩:৩২ || আপডেট: ২০২০-১১-০৩ ০২:১৩:৩২

 

মেধু কুমার বড়ুয়া:
আজ পরম শ্রদ্ধা ভরে লিখতে যাচ্ছি ইতিহাস সৃষ্টিকারী একজন মানুষের গল্প। এ হলো এমন এক মহীরুহের গল্প যিনি কল্পনা ও বাস্তবতার সর্বোচ্চ চুড়ায় ইতিহাস পাল্টে দিয়েছেন। ইতিহাসে খুব কম ব্যক্তিই সক্ষম হয়েছেন নতুন একটি সমাজ তৈরি করতে বা সমাজের পুরনো কুসংস্কার গুলিকে নিংড়ে ফেলতে। শ্রীমৎ কুশলায়ন মহাথেরো তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এ এক মহাকাব্যিক জীবন, যা গৌরব, অর্জন ও আত্মত্যাগের মহিমায় আজ সারা পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত।

যিনি আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর। তিনি আমাদের সঠিক নেতৃত্বের প্রতিভূ। কুশলায়ন নক্ষত্রের অক্ষরে রচিত একটি নাম, যা আপন আলোতেই ভাস্বর। তিনি আমাদের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন বুদ্ধ নির্দেশিত মুক্তির সঠিক মূলমন্ত্র। মানুষের জন্য অগাধ ভালবাসা ও অন্যায়ের সাথে আপোষহীনতা, সীমাহীন আত্নত্যাগ, অতুলনীয় নেতৃত্ব, দৃড় মনোবল আর মানুষের প্রতি গভীর প্রেম বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি।

তিনি এমন একজন মানুষ যিনি জাতি রক্ষায়, মানুষের কল্যাণে ও বৌদ্ধিক সমাজ বিনির্মাণে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আমাদের নীতি ও আদর্শের প্রতীক। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা ও মানব কল্যাণে ব্রতী হয়েছি। আশা করছি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম ও আগামী বৌদ্ধিক সমাজ বিনির্মাণে পুজনীয় ভন্তের নীতি ও আদর্শকে অনুসরণ করে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। কারণ উনার আদর্শ আমাদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়াবে। তাঁর নীতি ও আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়বে, যা অনুসরণ করে গড়ে উঠবে ত্যাগী ও আদর্শবাদী নেতৃত্ব ও কর্মী। যারা বদলাবে আমাদের এ সমাজ, যারা পূজনীয় ভন্তের আদর্শে আলোকিত হয়ে গড়ে তুলবে আলোকিত সমাজ, গড়ে উঠবে আলোকিত মানুষ।

ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের নির্মাতা জনগণ। কিন্তু ব্যাক্তি পালন করেন স্থপতির ভূমিকা। কিছু মানুষ তাঁর কর্ম ও নেতৃত্বগুণে সমাজ সৃষ্টি করে থাকেন। ইতিহাস তখন তার করতলগত হয়। জনগণ চিরকালই নেতৃত্বের অনুগামী। আর আমরা বড়ুয়া বৌদ্ধরা সবসময় বিহারাধ্যক্ষ ভিক্ষুর নেতৃত্ব মেনে চলে থাকি। কিন্তু জনগণ সেই নেতৃত্বকে বরণ করে, যার ভিতরে তারা নিজেদের অভিপ্রায়ের বহ্নিশিখা দেখে, স্বপ্ন, আকাঙ্খা ও আবেগের স্ফুরণ দেখে।আর আমরা কুশলায়ন ভন্তের ভিতর সেই আরাধ্য মুক্তির স্বপ্ন আমরা খুঁজে পেয়েছি।

আমার জন্য পরম সৌভাগ্য আর গৌরবের যে, আমি পূজনীয় ভন্তের একজন সেবক হতে পেরেছি। উনার কিছু কাজের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। উনার সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে চিনতে ও জানতে পারছি আর উনার মহান আদর্শগুলিকে লালন করার সুযোগ পাচ্ছি। উনার নির্দেশনা ও পরামর্শ আমাদের বিবিধ কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নে আমাদের সাহস ও প্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে তিনি আমাদের জন্য আগামীতে এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে থাকবে। ভন্তের যে কর্মময় জীবন যা তার ধৈর্য্য, মানসিকতা, দৃড়তা এবং অপরিসীম আত্মসংযম আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও চলার পথের পাথেয়। তিনি আপাদমস্তক একজন সাধক, নির্লোভ ও নিরহংকারী ব্যক্তিত্ব।

পবিত্র ভিক্ষু জীবনে আত্ননিয়োগের পর থেকেই পুজনীয় ভন্তে বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। বিশেষ করে সদ্ধর্ম ও শিক্ষার প্রসারে তিনি সদ্ধর্মের সুধা বিতরণে নানা জায়গায় বিচরণ সহ বহু সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি কলেজ জীবনে :-

পালংবৌদ্ধ ছাত্র পরিষদ নামে একটি সংগঠন করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি ছাত্রদের সুসংগঠিত করে তাদেরকে লেখাপড়ায় মনোযোগী করার জন্য সভা সেমিনার, মেধাবী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার প্রদান, গরীব ও মেধাবীদের আর্থিক সহায়তাসহ নানা কার্যক্রম চালাতেন। এছাড়াও

১। জ্ঞানসেন ভিক্ষু শ্রামণ প্রশিক্ষণ ও সাধনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে মেধাবী ভিক্ষু শ্রামণ তৈরি করছেন আর গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। যেখান থেকে বহু জ্ঞানী, গুণী ও প্রাজ্ঞ ভিক্ষু সংঘ যারা বর্তমানে দেশ বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্ব-মহিমায় মহিমান্বিত।

২। বিশ্ব জ্যোতি মিশন কল্যাণ ট্রাস্ট নামে একটি ট্রাস্ট ( যা গণপ্রজাতন্তী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত)গঠন করে বহু উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

৩। নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে বরইতলী উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন ( জমিদানসহ আজ অবধি শিক্ষবৃন্দের বেতন প্রদান ও স্কুলের নানাবিধ কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছেন।

৪৷ শাসন বংশ প্রভাতী সদ্ধর্ম শিক্ষা নিকেতন ধর্মীয় বৃত্তি পরীক্ষা পরিচালনা করে বড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষার ভিত গড়ে যাচ্ছেন। যার কারণে আজকের প্রজন্ম ধর্মীয় শিক্ষায় অনেক এগিয়ে।

৫। কুশলায়ন কিন্ডার গার্টেন প্রতিষ্ঠা করে অবস্থানরত পিছিয়ে পড়া গ্রামকে শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রসর করার জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেখানে গরীব ও মেধাবীদের বিনাবেতনে পড়ানে হয়।

৬। কুশলায়ন প্রকাশনা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করে পুজনীয় ভন্তের ও উনার শিষ্যদের লেখা, অনুবাদকৃত শতাধিক গ্রন্থ ছাপিয়েছেন যা সদ্ধর্ম প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

৭। শিক্ষা ফান্ড গঠন করে দরিদ্র, মেধাবী ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছেন। অত্র উপজেলা তথা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় সহ নানা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আছেন। আবার অনেকে লেখাপড়া শেষ করে সরকারের উচ্চপদে চাকুরীসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন।

৮। বিশ্ব জ্যোতি মিশন কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে ” শ্রীমৎ জ্যোতি রক্ষিত চিকিৎসা তহবিল” গঠন করে নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত পুজনীয় ভিক্ষু সংঘ ও মানুষদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।

৯। এছাড়া ও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মাণে আর্থিক সহায়তা প্রদান, দুর্যোগে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ, শীতার্ত মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, জ্ঞানী, গুণী ও কর্মবীরদের সম্মাননা প্রদান, যুগোপযোগী সেমিনার আয়োজন সহ নানাবিধ প্রকল্প গ্রহণ করে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

১০। পুজনীয় ভন্তের নামে দেশ বিদেশে বহু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেমনঃ কুশলায়ন ধর্ম ফাউন্ডেশন, কুশলায়ন শিশু শিক্ষা একাডেমী, কুশলায়ন মেডিটেশন সেন্টার (ফ্রান্স)সহ আরো একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যা শাসন সদ্ধর্মের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

১১। উত্তর ঘুমধুমে তিনি ফরেস্ট মেডিটেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। যেখানে ভিক্ষু সংঘ প্রতিবছর ওয়াইকে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় ধ্যান কোর্স পরিচালনা করা হয়।

শাসন ও সদ্ধর্মকে এগিয়ে নিতে উখিয়া উপজেলার বৌদ্ধদের জাগরণে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে এতদঞ্চলের ভিক্ষু সংঘ ও দায়ক সমাজ উভয়ই অনুপ্রাণিত হয়ে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি সাংঘিক জীবন চেতনার সার্থক উত্তরসূরী ও অনাগত সংঘের প্রদীপ্ত শিখা।

তিনি পুত পবিত্র সাংঘিক জীবন ধারণের পাশাপাশি বুদ্ধ শাসনের স্থিতি রক্ষার জন্য যোগ্য উত্তরসূরী শিষ্য গঠন করেছেন। তাঁর শিষ্যমন্ডলী সবসময় সদ্ধর্মের কল্যাণে আত্মনিবেদিত। উনার শিষ্যরা ইতোমধ্যে বহু বিহারের দায়িত্ব পালন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বহু সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালন, বিশ্ববিদ্যালয়সহ উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন ও পি. এইচ. ডি গবেষণারত আছেন। তাছাড়া দেশ ও বিদেশে বহু প্রতিষ্ঠান গড়েছেন।

আজ পরম পূজনীয় ভন্তের জন্মদিনে রইল আমার কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অর্ঘ্য। আজ উনার জন্মদিনকে ঘিরে, উনার মহান আদর্শকে ধারণ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে স্বতঃস্ফূর্ত ও উদ্দীপনাময় বর্নিল নানা আয়োজন। এর মাধ্যমে পুজনীয় ভন্তের জীবন ও কর্মের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের প্রত্যয়। তাঁর জীবন ও কর্মের তাৎপর্য ও উজ্জ্বলতায় অভিষিক্ত হবে কোটি কোটি মানুষ। মানুষের কীর্তি যেমন হারায় না, তেমনি হারায় না মানুষের অবদান। আলো- হাওয়া- বাতাসে এবং মানব হৃদয়ে আবেদন থেকে যায়। পুজনীয় ভন্তের ত্যাগ, তিতিক্ষা, অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও উদ্দীপনার আবেদন আমাদেরকে সারাজীবন আবেদন যোগাবে।

আমার চোখে তিনি নীতি ও আদর্শের একজন বরেণ্য ও পূণ্যপুরুষ। আমার পরম হিতৈষী ও অনুকরণীয় ব্যাক্তিক্ত্ব।

পরম পূজনীয় ভন্তের আজ শুভ জন্মদিন। এ মহতী দিনে ভন্তেকে বন্দনাসহ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি আর মহাকারুনিকের কাছে ভন্তের ভবিষ্যত নিরোগ ও দীর্ঘায়ু জীবন কামনা করছি। পূণ্যের কাছে প্রার্থনা করি আমার ভবিষ্যত প্রতিটি জন্মে যেনো আপনার মতো সদগুরুর সান্নিধ্যে থাকতে পারি।

লেখক: শিক্ষক, উখিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।