ঢাকা, সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১

‘হঠাৎ ভিআইপি’র ভালোমন্দ!

প্রকাশ: ২০২১-১১-১৮ ১০:৫৪:১৪ || আপডেট: ২০২১-১১-১৮ ১০:৫৪:১৪

মুজিবুল হক মুনির::
বসে আছি কলম্বো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে। সঙ্গে নেপালের বন্ধু, দক্ষিণ এশিয়ায় সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব Daya Sagar Shrestha. এবার শ্রীলংকা গিয়েছিলাম দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিথি হয়ে। লাইন ধরে ঢাকা বিমানবন্দরে প্রবেশ করে, চেক ইন কাউন্টারে প্রায় আরও দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে, ইমিগ্রেশনে আবার প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত, ত্যাক্ত-বিরক্ত আমি কলম্বো গিয়ে বিমান থেকে নামতেই দেখি হঠাৎ ভিআইপি হয়ে গেছি! আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো ভিআইপি লাউঞ্জে। বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী হিসেবে কলম্বো বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের সম্ভাব্য নানান প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য দলিল-দস্তাবেজসহ ব্যাপক প্রস্তুতিই ছিলো আমার। অথচ আমাদেরকে ইমিগ্রেশনে যেতেই হলো না। আমাদেরকে বসিয়ে রেখেই সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ফেলা হলো!

ফেরার দিনও নিয়ে যাওয়া হলো আবার ভিআইপি লাউঞ্জে। এবার বিড়ম্বনা। সাধারণত হাতে বেশ সময় নিয়েই আমি বিমান বন্দরে যাই, ঘুরেঘুরে সুন্দর সাজানো-গুছানো দোকানপাট দেখি। রাত ১২.৩০ টায় হোটেল থেকে বের হয়েছি, ইচ্ছে ছিলো বিমান বন্দরে হেলান দেওয়া চেয়ারে শুয়ে একটা ঘুম দেব! কিছুই হলো না! ব্যস্ততার কারণে কোন কিছুই কিনতে পারিনি, ঠিক করে রেখেছিলাম শ্রীলংকার প্রসিদ্ধ কিছু বিস্কুট আর চা অন্তত কিনবোই বিমান বন্দরের দোকান থেকে। কিন্তু লাউঞ্জ থেকে আমাকে ভিতরে পাঠানোর কোনও উদ্যোগ দেখছি না। একটু পর পর এসে কিছু লাগবে কিনা জানতে চাওয়া হচ্ছে। ঘুম পাচ্ছে খুব, ঘুমাতে পারছি না, ভিআইপি মানুষ এত বড় লাউঞ্জে দামী সোফাতে শুয়ে আবার ঘুমায় কিভাবে? আর ৪৫মিনিট আছে, আরে গেট তো বন্ধ করে দেবে? এবার ঢাকায় ফেরা নিয়ে শুরু হলো আমার টেনশন! পানি খাচ্ছি বার বার, কিন্তু গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। বসে থাকতে পারছি না। লাউঞ্জে আমি একা। ভয় হচ্ছে-এরা আবার আমার কথা ভুলেই গেলো কি না। পায়চারি করছি, স্ক্রিনে দেখছি ফাইনাল কল হচ্ছে! একি, বিমান কি ছেড়েই দিবে কি না। কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেসও করতে পারছি না, খুব টেনশন হলেও ভিআইপি হিসেবে সেটা প্রকাশ করা ঠিক হবে না ভেবে স্বাভাবিক থাকার ভান করছি! কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে আসলেই বন্দি মনে হচ্ছিলো, অসহায় লাগছে! কিছু লাগবে কি না জানতে চাইলে ধমক দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছিলো, আরে ভাই এসব ভিআইপি-সিআইপি লাগবে না, আমারে যাইতে দ্যান! দমবন্ধ লাগে!

হঠাৎ তিন-চারজন এসে বললেন, স্যার চলেন! পানির নিচ থেকে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে বাইরে এসে শ্বাস নিতে পারলে যেমন লাগে, ঠিক তেমনই মনে হলো। একটা গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হলো বোর্ডিং গেটে। লম্বা লাইন। উল্টো পথে আমাকে নিয়ে গিয়ে সামনে থাকা পুলিশ ভাই ‘সাইড প্লিজ বলে’ আমার জন্য রাস্তা বানিয়ে দিলেন! নিরাপত্তার লোকজন, এয়ার লাইন্সের লোকজন হন্তদন্ত হয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। নিজেকে বেশ দামী লোক মনে হলো, বেশ বিব্রতও লাগছে সবাই তাকিয়ে আছে দেখে। বাংলাদেশী যাত্রীদের চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করলাম। কারণ, সাধারণত প্রায়ই কোন বিমানবন্দরে কোনও বাংলাদেশী ভুয়া ভিসা বা এরকম কিছু নিয়ে আটকা পড়লে তাকে পুলিশ এসে বিমানে উঠিয়ে দেয়। আমাকেও কি তারা এমন ভাবছেন কিনা আল্লাহই জানেন!

আলাদা করে আমার ব্যাগ যখন মেশিনে চেক করা হলো, অভ্যাস বশত আমিই সেটা আনতে যাচ্ছিলাম। সঙ্গে থাকা পুলিশ স্যার স্যার বলে নিজের হাতে নিয়ে নিলেন। আমার মনে হয়ে গেলো, আমি তো ভিআইপি! আগের কষ্টগুলো ভুলে এবার কিন্তু ভিআইপি স্ট্যাটাসটা ভালোই লাগতে শুরু করলো। ইকোনমি ক্লাসের যাত্রী হলেও আমাকে বিমানে উঠানো হলো বিজনেস ক্লাসের গেট দিয়ে। বেশ কিছু আসন খালি, দেখলাম আমার পাশের আসনটা খালি রেখেই বিমান উড়াল দিলো! একজন কর্মী এসে খোঁজ নিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম। ঘুম ভেঙ্গে দেখি আমার পাশে একজন বসে আছেন। আমি জানালার পাশে বসতে চাই না, আর তিনি সম্ভবত জানালার পাশ খুব পছন্দ করেন তাই ফাঁকা পেয়ে এসে বসেছেন। একটু পরে আবার সেই কেবিন ক্রু আমার খোঁজ নিতে এসে পাশের যাত্রী দেখ অবাক হলেন! বেশ রাগত স্বরেই জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সিট নাম্বার? বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা গিয়ে কিছু বলতে গেলে আমিই কর্মকর্তাকে বললাম, ঠিক আছে! আশ্বস্ত হয়ে ফিরে গেলেন তিনি।

ঢাকায় বিমান অবতরণ করার পর, আমাকে সামনে নিয়ে যাওয়া হলো। বিজনেস ক্লাসের যাত্রীদের সঙ্গে আমাকেও সাধারণ যাত্রীদের আগে নামার সুযোগ দেওয়া হলো। বিমান থেকে নামতেই এক আনসার সদস্যের ধমক, সবাই এক লাইনে আসেন, এক লাইনে! এক ঝটকায় ভিআইপি থেকে একেবারে আমজনতা! লাইন ধরে গেলাম হেলথ ডেস্কে। সেখান থেকে আবার ইমিগ্রেশনে লম্বা লাইন। এর পর আবার লাগেজ চেক করার লাইন। লাইন পার হতে হতে প্রায় দেড় ঘণ্টা!

তখনই অনুভব করলাম, মানুষ কেন ভিআইপি হওয়ার জন্য এত পাগল। ক্ষমতার জন্য, ক্ষমতা ফিরে পেতে মানুষের প্রয়োজনে হিংস্র হয়ে যাওয়ার কারণটাও বেশ স্পষ্ট টের পেলাম আজ!

লেখক : যুগ্ম পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডেশন।