ঢাকা, বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১

ক্যাম্পের আধিপত্য নিয়ে রোহিঙ্গা শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহ খুন !

প্রকাশ: ২০২১-০৯-৩০ ১৬:০৪:২৪ || আপডেট: ২০২১-০৯-৩০ ১৬:০৭:০১

# রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি থমথমে, নিরাপত্তা জোরদার।

# শংকিত সাধারণ রোহিঙ্গারা।

পলাশ বড়ুয়া ॥
রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা ও আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউমেন রাইটস (এআরএসপিএইচ) সংগঠনের চেয়ারম্যান মাস্টার মুহিবুল্লাহকে হত্যা করেছে ওই সংগঠনের ভাইস-চেয়ারম্যান মাস্টার আব্দুর রহিম ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এমনটি দাবী নিহতের স্বজনদের।

এ ঘটনার পর থেকে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা তাদের বাসা থেকে তেমনটি বাইরে বের হয়নি। আজ বৃহস্পতিবার ক্যাম্পে বন্ধ ছিল এনজিও কার্যক্রম।

এদিকে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার তদন্তের দাবী করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ও এইচআরডাব্লিউ। অ্যামনেস্টি’র এক বিবৃতিতে বলেছে, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার ঘটনায় রোহিঙ্গা জনগোষ্টির মাঝে আতংক ছড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে দোষীদের ন্যায় বিচারের মুখোমুখি করা এখন বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এক টুইট বার্তায় বলেছেন, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য মুহিবুল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর ছিলেন।

দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, তাদের নেতাকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। যে মানুষটি রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের চেষ্টা করেছিল, সেই মানুষটিকে হত্যা করা হয়েছে আজ। এতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, বাস্তুচ্যুত হয়ে পালিয়ে আসা আশ্রিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিনিয়ত খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র কেনা-বেচাসহ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এআরএসপিএইচ কয়েকটি সংগঠন নানা অপরাধ করছে। তৎমধ্যে ভয়েস অব রোহিঙ্গা (ভুয়া), ফ্রি রোহিঙ্গা কলিশন (এফআরসি)। এই সংগঠন গুলোর আওতায় প্রতিটি ক্যাম্প ২/৩শ জনের অধিক সদস্যের শাখা রয়েছে। রোহিঙ্গা মাঝিদের সমন্বয়ে এসব শাখা-প্রশাখা গঠিত হয়েছে।

নিহত মাষ্টার মুহিবুল্লাহ (৫০), মিয়ানমারের রাখাইন মংডু এলাকার লংডাছড়া গ্রামের মৃত ফজল আহমদের ছেলে। তার ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ বলেন, ঘটনার দিন রাতে আমরা দুই ভাই এশার নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে এক সাথে বের হই। তখন আমার ভাই তাদের সংগঠন আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউমেন রাইটস (এআরএইচপিএইচ) অফিসে গিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলার সময় আরসা মাস্টার আবদুর রহমানের নেতৃত্বে ২০/২৫ জনের সশস্ত্র আরসা সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। এখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।

তিনি বলেন, আমার ভাই মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে কাজ করত, তাই সাধারণ রোহিঙ্গারা তাকে নেতা মানত। তার জনপ্রিয়তায় ইর্শান্বিত হয়ে ক্যাম্প কেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার করার জন্য আরসার নেতা মাস্টার আবদুর রহিম, লালু, মুর্শিদসহ সংঘবদ্ধ চক্র তাকে গুলি পালিয়ে যায়। অন্যদের নাম জানিনা তবে মুখ দেখলে চিনতে পারবো।

রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, আমরা আমাদের সম্পদকে হারিয়ে পেলেছি। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে।

রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ নুর বলেন, এ ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ কমে গেছে। সবার মাঝে অজানা শংকা কাজ করছে।

কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন স্থানীয় ইউপি সদস্য মো: হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ নিহতের পর থেকে ক্যাম্পে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। তবে ক্যাম্পের মোড়ে মোড়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আহাম্মদ সঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, নিহত মুহিবুল্লাহ’র মরদেহ ময়না তদন্ত শেষে স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো মামলা হয়নি। কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২৯ সেপ্টেম্বর বুধবার রাতে উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১ ইষ্ট সংলগ্ন নিজ অফিসেই সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছে এই রোহিঙ্গা নেতা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়না তদন্তের জন্য মরদেহ ওই রাতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত নিহতের নামাজে জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়নি।

এর আগে, ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে আলোচনায় এসেছিলেন মুহিবুল্লাহ। সে সময় তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, আমরা (রোহিঙ্গারা) দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই। এজন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাই।

এছাড়াও, তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের ফুটবল মাঠে কয়েক লাখ রোহিঙ্গার গণহত্যাবিরোধী যে মহাসমাবেশ হয়েছিল, তা সংগঠিত করেছিলেন মুহিবুল্লাহ।