ঢাকা, সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১

সীমান্তের ২০পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে মাদক, জনপ্রতিনিধিসহ জড়িত প্রায় ১শ কারবারি

প্রকাশ: ২০২১-০৮-২০ ০১:৪১:৪৭ || আপডেট: ২০২১-০৮-২০ ০১:৪১:৪৭

 

# সীমান্তে বিজিবির ফাঁড়ি ও চৌকি বাড়ানোর দাবী।

# বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরও থামছে না অপরাধ।

# বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, এপিবিএন এর অভিযান অব্যাহত।

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ক্যামেরা স্থাপন করলেও মাদকপাচার, মানবপাচার, চোরাচালান, অবৈধ রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট অপরাধ থামছে না। প্রতিদিন সীমান্তের ২০টি পয়েন্ট দিয়ে বানের স্রোতের মতো রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ সারাদেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা, আইস (নতুন মাদক), স্বর্ণ ও আগ্নেয়াস্ত্র। এ সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বাংলাদেশ পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এর কয়েকটি ইউনিটের হাতে ইয়াবা ও স্বর্ণের বারসহ চুনোপুটিরা আটক হলেও আড়ালে থাকা গডফাদাররা অধরা থেকে যাচ্ছে।

গত বছর মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ হত্যাকান্ডের পর থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছুটা স্থবিরতা দেখা দেয়। এই সুযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভূক্ত মাদককারবারীদের অনেকটা প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের অনেকে আবার রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক ঠিকাদারির নামে কালো টাকা বৈধ করার মিশনে নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে ‘স্মার্ট ডিজিটাল সার্ভিল্যান্স এন্ড ট্যাকটিক্যাল বর্ডার রেসপন্স সিস্টেম’ নামের মাধ্যমে নজরদারীর আওতায় এনেছে বিজিবি।

কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল আলী হায়দার আল আজাদ বলেন, সীমান্ত সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে বিজিবি। সার্ভার রুম থেকে ভালো ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন লোকজনকে শনাক্ত এবং অপরাধীদের আটক করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে।

এদিকে উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ২০টি পয়েন্ট দিয়ে অর্ধশতাধিক চোরাকারবারী প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ইয়াবা, স্বর্ণের বার ও অস্ত্রের চালান নিয়ে আসছে দেশে। এ সব পয়েন্ট গুলোর মধ্যে পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়া, ধামনখালী, রহমতের বিল, বালুখালী। রাজাপালং ইউনিয়নের রেজু আমতলী, জলিলের ঢেবা, গোল ঢেবা, কড়ইবনিয়া, ডেইলপাড়া, চাকবৈঠা, হাতিমুরা। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের বেতবুনিয়া, জলপাইতলী, তুমব্রু কোণারপাড়া, ভাজাবনিয়া, বাইশপাড়ি, গর্জনবুনিয়া, ফাত্রাঝিরি, বরইতলী, মঞ্জয়পাড়া।

 

এসব পয়েন্ট গুলোর মাঝামাঝি আরো কয়েকটি বিজিবি’র ফাঁড়ি ও চৌকি স্থাপন করা জরুরী বলে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীমান্তে বসবাসরত কয়েকজন জানিয়েছেন, রতœাপালং ইউনিয়নের কড়ইবনিয়া এলাকার আলী আহমদের ছেলে চিহ্নিত মাদককারবারী মো: ইকবাল ও তার ভাই ভুট্টো, রাজাপালং ইউনিয়নের কড়ইবনিয়া এলাকার রোহিঙ্গা নুর হোসেন প্রকাশ চেয়ারম্যান, রোহিঙ্গা হাকিম আলী’র নেতৃত্বে মিয়ানমার থেকে এসব ইয়াবা, স্বর্ণের বার ও অস্ত্রের চালান গুলো আসছে।

 

এসব চালান বহন করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে ডেইলপাড়া এলাকার ছব্বির আহমদের ছেলে জসিম উদ্দিন, ওমরের ছেলে শাহজাহান, ছুরত আলমের ছেলে মোহাম্মদ হানিফ, মৃত কালুর ছেলে জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ সানা উল্লাহর ছেলে একরাম, হোছন আলীর ছেলে মোহাম্মদ আনোয়ার, মোর্শেদ আলমের ছেলে ইব্রাহীম, মৃত বাঁচা মিয়ার ছেলে রফিক উদ্দিন (রউফ), আলী আহমদের ছেলে মোহাম্মদ কাছিম আলী, ছৈয়দুর রহমানের ছেলে নুর আলম, আজিজুর রহমানের ছেলে শামশুল আলম, বাঁচা মিয়ার ছেলে শাহজাহান (সম্প্রতি র‌্যাবের হাতে আটক)।

 

আবার এসব মাদককারবারীদের রাজাপালং ইউনিয়নের পূর্বাঞ্চলের এক মেম্বার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে মদদ দিচ্ছে বলে এমনটি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 

রাজাপালং পূর্বডিগলিয়া এলাকার মৃত আবু ছিদ্দিকের ছেলে ছৈয়দ আকবর, মৃত সুলতান আহমদের ছেলে শাহ আলম প্রকাশ মকবুল পুতিয়া, মৃত উলা মিয়ার ছেলে ছৈয়দ আহমদ, কাছিম আলীর ছেলে শাহ আলম, মোহাম্মদ আলমের ছেলে আবদুর রহমান, সুলতান আহমদের ছেলে ছৈয়দ আলম, জুহুর আলমের ছেলে শাহজাহান, আবুল হাশেমের ছেলে ভুলু, শামশুল আলমের ছেলে ছৈয়দ আকবর প্রকাশ লোডা আকবর, রশিদ আহমদের ছেলে আবু বক্কর। ডিগলিয়াপালং গ্রামের মৃত আবু ছিদ্দিকের ছেলে সদ্য জেল ফেরত হানিফ সিদ্দিকী আবারো দাপর্টের সাথে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

 

খালকাছাপাড়ার কবির আহমদ (বর্তমানে আটক), হিজলিয়া গ্রামের মৃত আবু বক্কর ছিদ্দিকির ছেলে জয়নাল আবেদীন, বাবুল। অপরদিকে লম্বাঘোনার মৃত ফকির আহমদের ছেলে মাহমুদুল করিম খোকা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও তার ইয়াবা সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে তার এক ভাই। এছাড়া একই এলাকার ফরিদ মিস্ত্রির ছেলে মো: রুমু প্রকাশ পুতিয়া (বর্তমান আটক), মৃত জাগির হোছনের ছেলে আবদু রকিম।

 

কুতুপালং এলাকার মৃত মীর কাশেমের ছেলে রশিদ আহমদ, রশিদ আহমদের ছেলে আলমগীর, শামশুল আলমের ছেলে বুজুরুছ মিয়া, মৃত কাদির হোছনের ছেলে রহমত উল্লাহ প্রকাশ কালু, রশিদ আহমদের ছেলে আলী আকবর। হাজির পাড়ার এলাকার বারবার গ্রেপ্তারকৃত আলী আহমদের ছেলে আতাউল্লাহ, ওই এলাকার মীর আহমদ।

 

রতœাপালং ইউনিয়নের কড়ইবনিয়া এলাকার মোহাম্মদ সোহেল, মোহাম্মদ ফারুক, খন্দকারপাড়া এলাকার জাফর আলম কালু ড্রাইভারের ছেলে শাহজাহান, তারেক আজিজ, খন্দকারপাড়ার জালাল আহমদের ছেলে সরওয়ার কামাল সিকি, আবছার কামাল, আলী হোছনের ছেলে শাহ আলম ও আলমগীর। টেকপাড়ার গিয়াস উদ্দিনের ছেলে মোর্শেদ চৌধুরী, মফিজ ড্রাইভারের ছেলে মানিক, দক্ষিণ রতœাপালং তেলীপাড়া এলাকার জবর মুল্লুকের ছেলে নাজু মিয়া, বেলাল উদ্দিনের ছেলে ফোরকান, নজরুল ইসলামের ছেলে এহেছান, বাঁচা মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর, ছগির আহমদের ছেলে ভুলু, আবুলু’র ছেলে আবুল মনজুর, আলী মিস্ত্রীর ছেলে গিয়াস উদ্দিন, বশরত আলীর ছেলে মো: কামাল।

 

হলদিয়াপালং ইউয়িনের রুমঁখা চৌধুরীপাড়া এলাকার মো: ইউনুছ ড্রাইভার, পাগলিরবিল এলাকা নুর আলমের ছেলে ওবাইদুল হক, দক্ষিণ ক্লাশপাড়ার সুবধন বড়ুয়ার ছেলে বিধু বড়ুয়া ও খোকন বড়ুয়ার ছেলে রুবেল বড়ুয়া, পাতাবাড়ি এলাকার হাজী সাহাব মিয়ার ছেলে আলী আহমদ।

 

ইতোমধ্যে পালংখালী ইউনিয়নের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি ইয়াবাসহ আটক হয়ে কারাভোগ করেছে। এদের মধ্যে ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল আবছার চৌধুরী, ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমদ, ৪নং ওয়ার্ডের জয়নাল আবেদীন, ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল হক, ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুলতান আহমদ। তবে ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল আমিন, ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তোফাইল আহমদ ও ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতা অভিযোগ থাকলেও অদৃশ্য কারণে তারা এখনো অধরা।

 

উপকূলীয় জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ মুছা ও তার দুই সহযোগী চৌকিদার আবুল বশর ও চৌকদার মঞ্জুর ইয়াবাসহ আটক হলেও জামিনে থেকে আরো বেপরোয়া হয়ে গেছে বলে এলাকাবাসী জানায়।

 

এছাড়াও পালংখালী স্টেশন সংলগ্ন ৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শীর্ষ ইয়াবা কারবারি রাশেল পুলিশের জালে আটক হলেও তার বড় ভাই সাহাব উদ্দিন এখনো মাদক পাচার করে যাচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। অপরদিকে একই ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়ার সিকান্দর আলীর ছেলে আবদুল গণি, আবদুল মুহিদের ছেলে এয়াকুব মার্শাল, আবদুল মান্নানের ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহানের নাম উঠে আসে। রহমতেরবিল এলাকার খলু বলির ছেলে কামাল উদ্দিন ও তার ভাই জামাল উদ্দিন জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও পুরোদমে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েছে এমনটি দাবী স্থানীয়দের।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে উল্লেখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদক, স্বর্ণচোরাচালনসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

 

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও আটক হচ্ছে না পুরাতন ও নব্য ইয়াবা গডফাদাররা। তবে প্রতিদিন বহনকারী চুনোপুটিরা বিভিন্ন বাহিনীর হাতে আটক হচ্ছে।

 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে মাদকের তালিকায় ঘুরে ফিরে যাদের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে ৯০ ভাগ এখনো এলাকায় থেকে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। অপরদিকে নব্য মাদককারবারীরা রাজনৈতিক নেতাদের ছত্র-ছায়ায় প্রশাসনের সাথেও সুসম্পর্ক রেখে দেদারছে মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু মাদক কারবারি দিনে প্রকাশ্যে বাজারে ঘুরাফেরা না করলেও রাতে তাদের অবাধ বিচরণ লক্ষণীয়।

 

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি মাসের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত করেছে ৩০ লক্ষ ১১ হাজার ৫৬৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। জড়িত থাকার অপরাধে ১৫২জনকে আটক করেছে।

 

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আহাম্মদ সঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, চলতি আগস্ট মাসে ৬৯ হাজার পিস ইয়াবাসহ ৪জনকে আটক করে। তৎমধ্যে ৩জন পুরুষ, ১ জন নারী। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

একই কথা বলেছেন, টেকনাফ থানা অফিসার ইনচার্জ হাফিজুর রহমান। তিনি চলতি আগস্ট মাসে ৩৬ হাজার পিস ইয়াবাসহ ৩ জনকে আটক করেছে বলে জানায়।

 

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ মো: আলমগীর হোসেন জানায় চলতি মাসে ৫১ হাজার ২২০পিস ইয়াবাসহ ৮জনকে আটক করে। তৎমধ্যে ২জন রোহিঙ্গা।

 

র‌্যাব-১৫ এর মিডিয়া কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী জানিয়েছেন, আগস্ট মাসে ৬ লক্ষ ১৫ হাজার ৫৪৫পিস ইয়াবাসহ ৫৬জনকে আটক করেছে।

 

রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক দায়িত্বরত এপিবিএন-৮ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন জানায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ লক্ষ ২৮ হাজার ৩৩৬ ইয়াবা উদ্ধার করেছে। অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে ১০৯জনকে আটক করা হয়।