ঢাকা, সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১

বর্তমান সমাজ ও আমাদের নেতৃত্ব এবং নিজেকে জাহির করার প্রবণতা নিয়ে ভাবনা

প্রকাশ: ২০২১-০৮-১৪ ০১:১০:২৪ || আপডেট: ২০২১-০৮-১৪ ০১:২১:১৫

মেধু কুমার বড়ুয়া:

পরের ক্ষতি করার নেশায় যদি একবার পেয়ে বসে, তাহলে নিজের অস্তিত্ব ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তার হুশ ফিরেনা। পরিশেষে নিজে, পরিবার ও সমাজ ধবংস করে যখন সবকিছু শেষ, তখন আমরা ক্ষান্ত হই। নেতৃত্ব! নেতৃত্ব! আমাদের সব শেষ করে দিচ্ছে। নেতৃত্ব দেওয়া ভাল তবে তা যেন সঠিক নেতৃত্ব হয়, সমাজ ও দেশের জন্য মঙ্গলজনক হয়, মানুষের উপকারের জন্য হয়।

কাউকে ঠকিয়ে নিজেকে বড় ভাববেন না! সময়ের ব্যবধানে আপনি ও একদিন ঠকে যাবেন। খুব করে ঠকে যাবেন। নিজেকে জেতার জন্য আমরা উঠে পড়ে লেগেছি, যা যা করার সব করছি, কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা তা গুরুত্ব না দিয়ে জেতার জন্য সত্যকে জোর করে মিথ্যা বানানো আর মিথ্যাকে সত্য বানানোর চেষ্টা করছি যদিও তা সীমিত। বিশেষ করে আমরা যারা সমাজে নেতৃত্ব দিচ্ছি, তাদের এ বিষয়ে উপলব্ধি করা উচিত বলে আমি মনে করি। না হলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম আরো ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে।

গ্রাম, সমাজ ও সভা-সমাবেশে যারা নেতৃত্ব দেন, অন্যকে উপদেশ দেন, ধর্ম কথা, নীতি কথা বলেন, তাদেরকে এ সমস্ত বিষয় বিবেচনায় রেখে কথা বলা ও আচরণ করতে হবে। আপনি নিজেই যদি অধর্মের সহযোগী হয়ে পক্ষপাতে দুষ্ট হন, তাহলে আপনার সে নেতৃত্ব বা উপদেশের কোন মূল্যই থাকেনা। কথায় বলে নিজে আচরি ধর্ম, অপরে শিখাও।

“বুদ্ধ” বলেছেন যে, আপনার মনকে, আপনার অন্তরকে, আপনার হৃদয়কে দয়া, মৈত্রী, করুণা, সততা ও ন্যায়ের দ্বারা ভর্তি করা উচিত। কিন্তু সমাজে দেখা যায় অধিকাংশ লোক বিহারে যায়, সভা-সমাবেশে যায়, ধার্মিক অনুষ্ঠানে যায়, নেতৃত্ব দেয়, সুন্দর সুন্দর উপদেশ-প্রবচন করে, কিন্তু তাদের ব্যক্তি চরিত্রে ধর্মের অনুশীলন দেখা যায়না। অনেকাংশের জীবনে গৃহস্থ ধর্মের বিপরীত আচরণই পরিলক্ষিত হয়। তারা নিজে আচরণের দ্বারা শিক্ষা দেন না যে, তারা নিজেরাও সত্যবাদী, ন্যায়বাদী, সুবিচারী, অন্যায়ের প্রতিবাদী, নিরপেক্ষ ও যথাধর্মানুশীলনকারী। তারা নিজেরাই রাগাগ্নিতে, দ্বেষাগ্নিতে ও মোহাগ্নিতে অহরহ জ্বলছেন, আর অন্যকে উপদেশ দিচ্ছেন সেগুলি হতে দূরে থাকার জন্য।

নিজেরা পাঁচটি গৃহস্থ ধর্ম সঠিক ভাবে প্রতিপালন করেননা, তারাই আবার ভিক্ষুদের দু’শত সাতাশ শীলের দিকে আঙ্গুল তুলে নীতি বাগীশের ভাণ করে ভিক্ষুদেরকে শাঁসাতে থাকেন, কটু কথা বলতে থাকেন, অসম্মান করতে থাকেন, অশ্রদ্ধা করতে থাকেন এবং এগুলির মাধ্যমে বিবাদ সৃষ্টি করে পরিবার, গ্রাম-সমাজকে ছিন্ন-ভিন্ন করার নোংরা খেলায় মত্ত হচ্ছেন। নিজের নেতৃত্ব জাহির করার জন্য সমাজ ভেঙে টুকরা টুকরা করছে। সমাজে মারামারি, হানাহানি সৃষ্টি করছে।

তারা যতটুকু লোককে বোকা মনে করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করতে চায়, লোক কিন্তু তত বোকা নয়। সেজন্য অনেকে তাদের সে সমস্ত পাঁতানো ফাঁদে পা দেননা। অবশেষে তাদের ছলনা, প্রতারণা ও দুশ্চরিত্রতা লোকের মধ্যে প্রকাশই হয়ে যায়। অসত্য-অধর্ম সাময়িক প্রভাবী হলেও সেগুলির শক্তি কিন্তু বেশী দিন স্থায়ী হয়না। একদিন সাধারণ লোকজন তাদের পাতানো ফাঁদ বুঝে যায়, তখন তাদের দিকে থুথু ছিটে।

আমি অন্যের যে দোষের কথা বলছি, কায়, বাক্য ও মনে সে দোষ আমার কাছে রয়েছে কিনা তা প্রথমেই দেখতে হয়। প্রথমে নিজেকে সংশোধন করে অন্যকে বলতে হয়। কিভাবে আমি অন্যকে নীতি-নৈতিকতার কথা বলব, লোক আমাকে কেনই বা মান্য করবে, আমার কথা কেনই বা গ্রহণ করবে? তা তো ভাববার বিষয়।

আরেকটা কথা নেতৃত্ব দিতে চাইবেন নিজেকে জাহির করার জন্য, পরিচিত বাড়ানোর জন্য! নেতা হিসেবে ক্ষমতা দেখিয়ে অন্যের ক্ষতি করার জন্য, অন্যকে বিপদে পেলে নিজের নেতৃত্ব জাহির করার জন্য, ধিক! সে নেতৃত্ব। অসহায়, শোষিত, নির্যাতিত, পীড়িত, বঞ্চিতদের পক্ষে কথা বলতে না পারলে এবং তাদেরকে ন্যায় দিতে না পারলে সে নেতৃত্বের দরকার কি?

অন্তরকে সবসময় পক্ষপাত বিহীন সত্য, ন্যায়, সদাচার ও মৈত্রী, করুণায় ভর্তি করুন। ব্যক্তিকে ক্ষমাশীল হতে হবে, ক্ষমাশীল ব্যক্তিরাই প্রগতিবাদী হয়ে থাকে। প্রত্যেককে নিজের জীবনকে, অন্যের জীবনকে তথা গ্রাম , সমাজ, দেশ এবং পৃথিবীকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করার জন্য সঠিক নেতৃত্বের অনুশীলন করার প্রচেষ্টা করা উচিত।

মনে রাখবেন পরের ক্ষতি করার নেশা যদি একবার পেয়ে বসে,তাহলে আপনার ধবংস অনিবার্য। কেউ আপনাকে ঠেকাতে পারবে না। পরের ক্ষতি করে নেতৃত্ব দেওয়া যায় না।

যোগ্যতা বাড়ান, পরিচিতি নিজে নিজেই বাড়বে, ক্ষমতাও নাগালের ভিতরে চলে আসবে। ক্ষমতার পেছনে আপনাকে ছুটতে হবেনা। কারো দ্বারা প্রভাবিত হবেন না, যা করবেন, নিজে ভেবে চিন্তে করবেন। যা আপনার জন্য মঙ্গল , সমাজের জন্য মঙ্গল, জাতির জন্য মঙ্গল, তাই করুন। মনে রাখবেন সঙ্ঘভেদ মহাপাপ। সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হউক।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি, উখিয়া, কক্সবাজার।