ঢাকা, রোববার, ২৪ অক্টোবর ২০২১

জনগণের জন্য নাটক, নাকি নাটকের জন্য জনগণঃ অভিজিৎ সেনগুপ্ত

প্রকাশ: ২০২১-০৮-০৮ ১৯:৪১:৩০ || আপডেট: ২০২১-০৮-০৮ ১৯:৪৬:১৪

শিল্প মাত্রই গড়ে ওঠে জনগণের জন্য, তাই শিল্প এবং শিল্পী কোনভাবেই জনগণ বর্হিভূত নয়। যত রকম কলা আছে (সংস্কৃত সাহিত্যে চৌষট্টি কলার উল্লেখ আছে) সব কলার বিষয়বস্তু নির্বাচনের মূল উৎস জনগণ; সাহিত্য, নাটক, সংগীত, চিত্রকলা যাই হোক না কেন। ভালবাসা, বিরহ-ব্যাথা, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, অন্যদিকে আদিমকাল হতে সুদীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি হল শিল্পের উপজীব্য।

নাটকের ইতিহাসও অনেক সুপ্রাচীন। আনুমানিক দুই হাজার বছর। Aristole এর Poetics এবং সংস্কৃত সাহিত্যে ‘ভরত মুনির’ নাট্যশাস্ত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সুমহান গ্রীক সভ্যতার সংগে নাটকের এক অবিচ্ছেদ্য যোগ ছিল, গ্রীক নাটকের বিষয়বস্তুতে তা পাওয়া যায়- বীর গাঁথা এবং রাজকীয় জয়যাত্রার কাহিনি, অবশ্য তা তৎকালীন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই। রাজতন্ত্র ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাজা যেখানে Suprme power ( King is God). যে কোন রাজাই নিজেকে তাই মনে করতেন) সেখানে রাজার শৌর্য্য-বীর্য্য এবং যুদ্ধজয়ের কাহিনিই মুখ্য ঘটনা। তাই গ্রীক নাটকে প্রধানত বীর রসের আধিক্য। তবে কোথাও কোথাও রাজার মানসিক এবং অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের করুণরসের নাটকও সৃষ্টি হয়েছে। যা তৎকালীন ঘটনা প্রবাহ এবং বিষয়বস্তু নির্ভর হয়ে উঠেছে।

কালের বা যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নাটকের বিষয়বস্তুতে এসেছে পরিবর্তন। সভ্যতার গোড়ার দিকে মানুষের সাথে নিয়তির দ্বন্দ্ব হয়ে উঠে নাটকের প্রধান উপজীব্য। তারপর আস্তে আস্তে স্বরূপ গেল পাল্টে। সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে নাটকের বিষয়বস্তুতে এল পরিবর্তন, দ্বন্দ্ব গেল পালটে। শুরু হল এমনভাবে-মানুষের সাথে প্রকৃতির দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীর সাথে গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীর প্রধানের সাথে অন্যদের দ্বন্দ্ব, রাজার সাথে জনগণের দ্বন্দ্ব, যান্ত্রিক সভ্যতার সাথে মানুষের দ্বন্দ্ব,, অসত্যের সাথে সত্যের দ্বন্দ্ব, সুন্দরের সাথে অসুন্দরের দ্বন্দ্ব, মানবিক মূল্যবোধের সাথে অবক্ষয়ের দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব, সর্বোপরি সর্বহারার সাথে শোষকের দ্বন্দ্ব। এমনি ক্রমবির্বতনের মধ্যদিয়ে নাটকের বিষয়বস্তুতে এসেছে পরির্বতন। বিষয়ের সাথে সাথে আঙ্গিকগত পরিবর্তনও এসেছে অনিবার্যভাবে। কেননা প্রত্যেক নাট্যকারই সমকালীনতাকে ভিত্তি করেই সৃষ্টির নেশায় হয়েছেন মাতোয়ারা। তবে এই সমকালীন পরিবেশের ভিত্তিতে বিষয়ীগত, আঙ্গিকগত, সংলাপ, চরিত্রসৃষ্টি এবং মহান মানবিক আবেদন সৃষ্ট নাটকই ক্লাসিক্যাল এবং চিরন্তন নাটক তৈরি হয়। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে শেক্সপিয়র এবং রবীন্দ্রনাথের নাম উল্লেখ করা যায়।

আবার অন্যদিকে এমন কিছু নাট্যকারের সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁদের নাটক নিয়ে নতুনভাবে ভাবনা চিন্তা হলেও আজকের সময় অনুযায়ী সেসব নাটকের তেমন কোন প্রয়োজনীয়তা বা আছে কী ? কারণ নাট্যকার নাটককে ক্লাসিক্যাল রূপ দিতে গিয়ে দূরূহভাবে Abstraction এর দিকে ঝুকেছেন, স্বাভাবিকভাবে নাটক হয়েছে দুর্বোধ্য। নাটকের Dialectics তৈরি হয়নি।

আমাদের এই অঞ্চলেও নাটক প্রাচীন শিল্প মাধ্যম। সংস্কৃত সাহিত্যে বহু নাটক এবং ধারা-উপধারা নিয়ে পর্যালোচনা রয়েছে। সামাজিক বির্বতনের মধ্যদিয়ে যেমন সমাজের ক্রম বিকাশ হয়েছে, তেমনি যুগে যুগে নাটকের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন লক্ষণীয়। এই বির্বতনের পথ ধরেই আজকের অবস্থা। যে মানুষ একদিন চাঁদকে দেবতা জ্ঞানে দূর থেকে পূজা করত বর্তমানে মানুষ সেখানে তার স্বাক্ষর, তার পরিচয় রেখেছে। তাই বামুন হয়ে চাঁদ ধরার প্রবাদ আর মোটেই আকাশ কুসুম কল্পনা নয়, বিজ্ঞানকে নিজের কাজে লাগিয়ে মানুষ একদিকে যেমন ধাপে ধাপে সাফল্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ততই শূণ্যতা বোধ এবং বিধ্বংসী পরিবেশ তৈরি করছে। ঠিক তেমনি নাটকের ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক রূপান্তর এসেছে বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিকগত গঠন প্রণালীতে।
বাংলা নাটকও ইতিহাসের বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে। কালের বহমান ধারায় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আজ একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রতিনিয়তভাবে থিয়েটারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটা চলছে এবং চলবে। যেহেতু থিয়েটার স্থবির কোন বিষয় নয়।

সংস্কৃত নাটককে বলা হত দৃশ্যকাব্য, সূত্রধর এসে যে কোন দৃশ্যের শুরুর ঘটনা গান গেয়ে কিংবা অঙ্গভঙ্গির সহকারে মুখে বলে দৃশ্যের কাহিনি বুঝিয়ে দিত যা ছিল নান্দীমুখ। আজকের দিনে এসে নাটকে সূত্রধর জাতীয কোন চরিত্র নাট্যকার সুষ্টি করে থাকলেও তার বহু রূপান্তরিত রূপ দেখতে পাওয়া যায়। একজন নাট্যকার নাটক রচনা করতে গিয়ে নাটক ও তার বিষয়বস্তু নির্বাচন, সমকালীন ঘটনা প্রবাহতা, গতি উৎকর্ষতা, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, ঘাত-প্রতিঘাত, সংলাপ, চরিত্র সৃষ্টি, নাটকীয়তা, ধাপে ধাপে চুড়ান্ত উৎকর্ষতায় উত্তরণ এবং পরিণতির দিকে সুতিক্ষণ নজর রেখে তাঁর সৃষ্টিকর্মকে বিকশিত করেন।

বর্তমানে নাটক তথা থিয়েটার এক অতি প্রিয় এবং প্রচলিত শিল্প মাধ্যম। শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য নয় জীবনের প্রতিবিম্ব আরশির মত, শৈল্পিক আবেগসমৃদ্ধ অনুভূতি এবং মনন প্রক্রিয়ায় প্রকাশ এক থেকে বহুর মধ্যে সঞ্চারের মাধ্যম হিসেবেও এর প্রয়োজনীয়তা অনশ্যস্বীকার্য। তাই Theatre is the best medium of mass connection. সেই কারণেই থিয়েটার কখনই কোন শিল্পীর একক মানসিকতা বা আনন্দমভূত হয় না। নাটক এবং তার প্রয়োগ সম্পর্কে বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ভাখতানগেেভর মতামত এ প্রসঙ্গে প্রনিধানযোগ্য-” The subjects of plays are taken from life and give a vivid protrayal of human character. A task which is full of joy and satisfaction, though sometimes full of torfare to ….. “
জনগণের মানস চেতনাকে শাসক শ্রেণি সবসময় সামন্ততান্ত্রিক চেতনা এবং বুর্জোয়া ধ্যান ধারণার মধ্যে আটকে রাখতে চায়। ধর্মীয় সংস্কার, সামন্তবাদী সামাজিক আচার অনুশাসন, ধনবাদী ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা ও বুর্জোয়া উচ্চাভিলাসের আকাশ কুসুম কল্পনা এবং সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছিষ্ট হিসেবে পশ্চিমা বিকৃতি এবং বেলেল্লাপনা, সর্বোপরি এই সবকটির গোঁজামিলের মধ্যে আধা ফ্যাসীবাদী উন্মত্ততার মধ্যে জনগণের মানস চৈতন্য ও চেতনার জগৎকে শাসক শ্রেণি আটক রাখতে চেয়েছে যুগে যুগে।

এইসব অশুভ চেতনার সংস্কৃতিকে পরাস্ত করার জন্য মহান মাক্সবাদীরা সমাজতান্ত্রিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছেন।

শিল্প ও সাহিত্যের সমস্যা সম্পর্কে বিখ্যাত ইয়েনান বক্তৃতায় মাও সে তুং বলেছিলেন- “সৈন্যবাহিনী ছাড়াও আমাদের অবশ্যই চাই এক বিশেষ সাংস্কৃতিক বাহিনী, যে বাহিনী শত্রুকে পরাস্ত করা এবং আমাদের নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে অপরিহার্য”, আর “ আমাদের হাতে এমনকি অত্যন্ত সাধারণ ধরণের শিল্প সাহিত্যও যদি না থাকত বিপ্লব হত না। আমরা কোন জয়লাভই করতে পারতাম না। মানুষের জীবন সংগ্রামের যুগ সন্ধিক্ষণে উপসৌধগত সংগ্রাম এক উচ্চগ্রামে না পৌঁছান পর্যন্ত যুগান্তরের পদক্ষেপ সূচিত হয় না। Cultural revolution proceeds social revolution. “

নাট্যশিল্প শুধু যৌথ শিল্পই নয়, তা ত্রিমাত্রিক। রক্তমাংসের মানুষকে নিয়ে এবং শিল্পকর্মের প্রায় সবকটি ধারার সমন্বয়ে পুষ্ট হয়ে তা উপস্থাপিত হয়। তাই শিল্প হিসেবে নাটক অত্যন্ত প্রাণস্পর্শী ও প্রত্যক্ষ শিল্প, যা মানুষের বুদ্ধি এবং আবেদনকে সরাসরি নাড়া দিতে পারে।

প্রাচীনকাল থেকেই দেখা গেছে যে, কোন দেশের সমাজ জীবন যখন বিপ্লবী বিস্ফোরণের সম্ভাবনায় অগ্নিগর্ভময় হয়ে উঠেছে তার পূর্বাভাস জানিয়েছে মঞ্চ। তার আহবান করেছে মঞ্চ। বিপ্লবের পথে মানুষকে এগিয়ে যেতে ইংগিত করেছে মঞ্চ।

সুতরাং, দেখা যায় সমাজ বিপ্লবের কর্মসূচির মধ্যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ অংশই নয়, এক অর্থে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সমাজ বিপ্লবের পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে।

শ্রেণি বিভক্ত এই উপমহাদেশে গণনাট্যই প্রথম নাটককে শোষিত শ্রেণির বাঁচার সংগ্রাম লড়াইয়ের কথা মুখ্য বিষয় করে নাটকের রূপান্তর আনলো। আজকের ভাবনায় বাংলাদেশের নাটক মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত, এক. বাণিজ্যিক থিয়েটার (যা এখন মৃত প্রায় বলা যায়), দুই. নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা মূলক গ্রুপ থিয়েটার (আবার এই গ্রুপ থিয়েটারের মধ্যে বিভিন্ন ধারা বিদ্যমান), তিন. উন্নয়নধর্মী থিয়েটার (এটি মূলত এনজিও প্রভুদের অমৃত বচন)।

বাংলাদেশের মৃতপ্রায় পেশাদারী বা বাণিজ্যিক থিয়েটার হচ্ছে আপত্তিকর এবং নাটক বহির্ভূত বিষয, নারীদেহের উন্মুক্ত উত্তেজক অংশের প্রদর্শন, যা আবার ভ্যারাইটি শো নামে পরিচিত। অর্থাৎ শিল্প যখন ব্যবসায়ে পরিণত হয়, তখন তার মধ্যে আর যাই থাক নিশ্চয়ই তা শিল্প হয়ে উঠে না। যা জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না তাকে কোনক্রমেই শিল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।

অপরদিকে বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারর নাট্যদলগুলো নানাবিধ বাধাবিপত্তির সন্মুখীন হয়েও তাদের নাট্যচর্চা করে যাচ্ছে। অবশ্য শুরুর দিকে তারা নাট্যান্দোলনের কথা বললেও বর্তমানে নাট্যচর্চা বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে । আন্দোলন বললে এক প্রকার রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকতে হয়, নাট্যচর্চা বললে সেই নামাবলীটা গায়ের থেকে ফেলে দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে নাট্যচর্চা করা যায়।

নাট্যান্দোলন না বলে চর্চা বলার কারণে থিয়েটারের দলগুলোর আন্দোলন মুখি ধারাটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রকারান্তে আপোষপন্থী ধারাটি বিকাশ লাভ করেছে। বাংলাদেশে নাট্যচর্চারত প্রথম সারির দলগুলো কিছুটা আপোষপন্থী, আবার অন্যদিকে কিছু কিছু সংগঠন চরম আঘাত হানায় বিশ্বাসী। অর্থাৎ, লড়াকু দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিয়মান হয়। এখানে Contant এবং Form এর মধ্যে চরম ফারাক দেখা যায়। তবুও গ্রুপ থিয়েটারের নাট্যদলগুলো নানান পরীক্ষার মধ্যদিয়ে নাটকের বিষয়গত এবং আঙ্গিকগত সাযুজ্য বজায় রেখে সর্বশ্রেণির মানুষের কাছে নাটককে জনপ্রিয় হাতিয়ার করে তোলার চেষ্টা করছে।

যদিও তাদের এই চেষ্টা শহর কেন্দ্রিক। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে এখনও সম্পৃক্ত করতে পারেনি নাটকের সাথে। মূলত মধ্যবিত্তের গণ্ডির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের নাটক। প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে শিল্পের এই মাধ্যমটির বিকাশমান ধারাটি রহিত হবে। নাটক অবশ্যই মানুষের জন্য। মানুষকে বাদ দিয়ে নাট্যচর্চা হতে পারে না।

লেখক পরিচিতিঃ অভিজিৎ সেনগুপ্ত, নান্দীমুখ (চট্টগ্রাম) এর আটিস্টিক ডিরেক্টর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায় এর চারুকলা বিভাগের নাট্যকলা শাখা হতে নাট্যকলায় এম. এ। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ নাট মোর্চা বাংলাদেশ গ্রপ থিয়েটার ফেডারেশান এর বর্তমান প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাছাড়া অঙ্গীকারাবদ্ধ নাট্য পত্রিকা ফ্রন্টলাইন থিয়েটার এর সম্পাদক। বাংলাদেশ আইটিআই কেন্দ্রের সম্মানিত সদস্য।