ঢাকা, সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১

একজন সংগ্রামী মানুষের নাম ‘ভুলু মাস্টার’

প্রকাশ: ২০২১-০৬-২১ ০৬:০৯:২১ || আপডেট: ২০২১-০৬-২১ ০৬:০৯:২১

 

নিবারণ বড়ুয়া:

বাবা ভুলু মাস্টার। আসল নাম সত্যবোধী বড়ুয়া। আমার জন্মের পর বাবাকে মানুষ সে ভাবেই চিনতো। কারন আমার বড় আরো তিন ভাই, দুই বোন। আমি সবার ছোট । নিজের উপজেলার বাইরেও বাবার পরিচয় তিনি একজন সম্মানিত ও গুনি শিক্ষক। আর আমরা তার নম্র ভদ্র সন্তান।

বাবা কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রত্না পালং এর জমিদার (কোটবাজার) অখিল শিকদারের বড়ছেলের ঘরের নাতি। পিতার নাম নিকুঞ্জ বিহারী বড়ুয়া। মায়ের নাম প্রেমদা বড়ুয়া। সহায় সম্পত্তি অডেল। দাদা ছিলেন কক্সবাজার জেলায় বন বিভাগের কর্মকর্তা। বাবা সহ বাকী এক ভাই ও বোনের জন্মের পর এক দুর্ঘটনায় দাদু মারা যান। মারা যাবার আগে দাদু নিজে জায়গা দান করে প্রতিস্টা করেন পালং হাইস্কুল।

সংসারের নানা প্রতিকুলতায় আমার দাদি তিন সন্তানকে নিয়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন বাপের বাড়ি লামার পাশবর্তী এলাকা বিলছড়ি গ্রামে। দাদির বাপের বাড়িও ছিল জমিদার পরিবার। বিশাল লম্বা বাড়ি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষের ক্যাম্প ভেবে বাড়িটিতে বোমা ফেলা হয়েছিল। সে হামলায় নিহত হয় দাদির দুই ভাই। সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায়।

তারা আশ্রয় নেয় অন্যের বাড়িতে। বাবা ২৩ বছর বয়সে ক্লাশ সেভেনে ভর্তি হন পালং হাইস্কুলে। পরের দোকানে চাকরি নেন এক টাকা বেতনে। দিনে চাকরি রাতে সময় বের করে পড়তেন। নিজের আত্নীয়দের ঘরে ঘরে গিয়ে সাহায্য চাইতেন। সে টাকায় চালাতেন পড়াশুনার খরচ। অনেক কস্টের পরে কক্সবাজারে মেট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেন। পাশ করেন। বাবার ক্লাস মেট দের মধ্যে ভাল্লুকিয়ার কিরন মাস্টার, উখিয়ার মরহুম ভুইয়া মেম্বার, ইদ্রিস মিয়া অন্যতম। এ ছাড়া বর্তমান অতিরিক্ত সচিব মীর আহম্মদ সাহেবের বাবাও ছিলেন বাল্যবন্ধু।

বাবা চলে আসলেন লামায়। পরিবারের হাল ধরতে নেমে পড়েন কাজে। চলে যান মুরুং পাড়া। মুহুরীর কাজ করতে। টুকটাক ব্যবসা করতেন। ধানের উপর টাকা দিতেন। এভাবেই চলছে। বাবার এক মামা আলীকদমের সিদ্দিক কেরানী বাবাকে ডাকলেন। বললেন, কিছু শিক্ষক নিবে। তুমি ইংলিশে একটা দরখাস্ত দাও। আমি চাকরির ব্যবস্থা করছি। বাবা তাই করলেন। অবশেষে শিক্ষক হয়ে যোগদান করলেন আলীকদমের ব্যাঙ ছড়ি।

দিনে চাকরি করতেন। রাতে মা কে নিয়ে রাজবাড়ির জংগলে মাটি কেটে আবাদ করতেন জমি। সেই জমিতে ফলাতেন ফসল। নিজেদের চলার মত কিছু জমি আবাদ করে শুরু করেন চাষাবাদ।

এর মধ্যে শুরু হল ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নিয়মিত গোপন বৈঠক করতেন। যার মধ্যে উখিয়ার মুক্তিযোদ্ধা পরিমল বড়ুয়া, লামা প্রেসক্লাবের সভাপতি আমার মামা প্রিয়দর্শী বড়ুয়া, ফনিন্দ্র, মহানন্দ, শহীদ আব্দুল হামিদ অন্যতম। একদিন হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প থেকে বাবার কাছে চিঠি আসে। জরুরী যেন দেখা করেন। পরে একটি লাল গরু বিক্রি করে সেই টাকা নিয়ে বাবা এলাকা থেকে অন্যত্র চলে যান।( মায়ের মুখে শোনা)

বাবা খুব ভোরে উঠতেন। সাথে মা। গরু নিয়ে মাঠে হাল দিতেন। হাল দাড় করিয়ে আসতেন বাড়িতে। ছালার বস্তা বিছিয়ে পড়তাম আমরা ছয় ভাই বোন। আশপাশের আরো কয়েকজন আসতেন পড়তে।গরুর হাল চালানো বেত নিয়ে লুঙ্গী খোচা দেওয়া অবস্থায় আমাদের কাছ থেকে পড়া নিতেন। না পারলে মাইর।

সকাল আটটায় চলে যেতেন স্কুলে। শুরু করতেন ব্যাচ পড়ানো। দশটায় শাক বা শুটকির তরকারি দিয়ে ভাত নিয়ে যেতাম স্কুলে। বাবা ভাত খেয়ে ঝিমাতেন। আমরা বিকাল ৩ টায় বাড়ি ফিরতাম। বাবা আবার ব্যাচ পড়াতেন। ফিরতেন সন্ধ্যায়। বর্ষাকালে মাতামুহুরি নদী সাতার দিয়ে আসতে হত বাড়ি। মেরাখোলার কুদ্দুস মেম্বারের একমাত্র নৌকাই ছিল আমাদের স্কুলে যেতে নদী পারাপারের ভরসা।

দীর্ঘ ৩৭ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি মানুষের কল্যান করেছেন। কোন দিন কারো ক্ষতি করতে আমি দেখিনি। কোন ছাত্র দেখলেই দাঁড়িয়ে যেতেন। বলতেন ” অভাই পুত তোর মা বিন্নি ভাত রাইন্দে না? কুরা জওরাইয়ে না? পন্না পরর না? ন পইল্লে পিড়র চাম ফেলি দিয়ম”। (অর্থাৎ তোমার মা বিন্নি ভাত রান্না করেছে? মুরগি জবাই করেছে? লেখা পড়া করতেছো? যদি না করো পিঠের চামড়া তুলে ফেলবো।) ছেলে, ছেলের বাবা, এমন কি নাতিদের শিক্ষক ছিলেন তিনি। তিন প্রজন্মকে শিক্ষার আলো দিয়ে ১৯৯৮ সালে তিনি অবসর নেন। এই মহান পেশা থেকে। মাঝে মাঝে নিজের আনমনে সকাল ৯ টায় স্কুলে চলে যেতেন। মা বকা দিতেন।

আমরা প্রাইমারির গন্ডি পেরুলাম। হাইস্কুল এ আসলাম। চার কিলোমিটার হেটে স্কুলে যেতাম। টিফিন খাওয়ার টাকা দিতে না পারলেও বাবা ইংরেজি আর অংকের প্রাইভেট শিক্ষক দিতেন। বাবা স্কুল থেকে এসে নেমে যেতেন মাঠে। সাথে মা। সিজনাল শাক সবজি চাষ করতেন। সে গুলো নিয়ে বাজারে বিক্রি করতেন। দিতেন প্রাইভেট খরচ। পরীক্ষার ফি। আরো কত কি। পরীক্ষার আগে ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ দিতেন। এটা পড়। ওটা পড়। না পারলে বুঝিয়ে দিতেন। উনার ছাত্রের মধ্যে মিন্টু চেয়ারম্যান, আক্তার কামাল ( মাইজ্জ্যা মিয়া), জেলা পরিষদ সদস্য আলীকদমের থোয়াইস্লা মারমা অন্যতম।

বাবা এখানেই দমে যান নি। লামা উপজেলায় পিছিয়ে পড়া বড়ুয়া সমাজের উন্নয়নে গড়ে তোলেন বৌদ্ধ সমিতি। রাত জেগে সভা করতেন। আমার মামা প্রয়াত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বিভুতি মাস্টার, আরেক মামা শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক প্রিয়দর্শী মামা সহ নাম না জানা অনেকেই ছিলেন এই সংগঠনের অন্যতম পৃষ্টপোষক ও কর্মী।

১৯৯৪ সালে জমি দান করে প্রতিস্টা করেন রাজবাড়ি নালন্দা বৌদ্ধ বিহার। স্কুল থেকে ফিরে মাঝে মাঝে বিভিন্ন মারমা পাড়ায়, বড়ুয়া পাড়ায় যেতেন। সাথে নিয়ে যেতেন বিহারের নামে ছাপানো রশিদ বই। দান হিসেবে টাকা তুলে আনতেন মানুষের কাছে থেকে।সেই টাকা দিয়ে বিহারের উন্নয়নে কাজ করতেন। বাবার সংগ্রাম মুখর জীবনে প্রতিটি মুহুর্তে বাবাকে সাহস ও সহযোগীতা করেছেন মা।

একানব্বই সালের দিকে আমি হাইস্কুলে। সিক্সে পড়ি। বাবা লুঙ্গি পড়ে খালি পায়ে বাজারে যেতেন। আমার লজ্জা হত। বাবাকে পথে পথে মানুষ পায়ে ধরে সালাম করতেন। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বাবা অবসরে। বাবা তিন রাস্তার মাথায় চেয়ার নিয়ে বসে থাকতেন। প্রতিটি মানুষ বাবাকে সালাম দিতেন শ্রদ্ধার সাথে। অনেকে পায়ে ধরে প্রনাম করতেন। কেউ কেউ ভয়ে অন্য পথ ব্যবহার করতেন।

যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম বাবা আমার মেচ এর টাকা জোগাড় করে একটা হাত ব্যাগ বোগল দাবা করে চলে আসতেন। আমার বন্ধু ও পরিচিত দের কাছে খবর নিতেন আমি পড়াশুনা করি কি না। তখন ফোনের এত বাড়া বাড়ি ছিল না। নিতান্ত বিলাসিতা। বাবা আমাকে চিঠি দিতেন। চিঠির ভাষা সংক্ষিপ্ত। হাতের লেখা মুক্তার মত সুন্দর। সন্ধ্যার আগে পৌছাতেন। খরছের টাকা হাতে দিয়ে রাতে থেকে ভোরে চলে যেতেন বাড়ি। বাবার ফিরে যেতে খুব কস্ট হত। উপদেশ দিতেন।সে উপদেশ এ স্পস্ট হতো সন্তান দের নিয়ে মা বাবার স্বপ্ন।

আজ উনার সন্তান রা সবাই শিক্ষিত। সু প্রতিষ্টিত ও পরিচিত। সবাই সরকারি চাকুরে। আমরাও বাবা হয়েছি। বাবা হওয়ার অনুভুতি ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধ আমাকে বারবার আমার বাবার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বাবার যা কিছুতে বিরক্ত হতাম সেটাই ছিল আমাদের মংগল বারতা। আজ বাবাকে খুজছি, উনার সেই শাসনের ধমকের কথা বড়ই মধুর মনে হচ্ছে।

আমার কাছে বাবা মানেই আমার জীবন প্রতিস্টা করে দেওয়া এক ভগবানের নাম। তিনি আমাকে জন্মদিয়েছেন আবার উচ্চাশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। দিয়ে গেছেন একটি মার্জিত পরিচিতি। আজ বাবা দিবস। বাবা গত হয়েছেন ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসের ৬ তারিখ।

আমার গায়ের চামড়া দিয়ে বাবার পায়ের জুতা সেলাই করে দিলেও এ ঋন শোধ করতে পারবো না। আমার কাছে সব সময় মা – বাবা দিবস। আজকের দিনেও মা এবং বাবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। উনাদের আদর্শ নিয়ে যেন চলতে পারি আমৃত্যু। ধরে রাখতে পারি আমার মা ও বাবা ভুলু মাস্টারের সুনাম। তাই আমি গর্ব করে বলি আমি ভুলু মাস্টারের সন্তান। ভুলু মাস্টার আমার ভগবান তুল্য পিতা।

।।পৃথিবীর সকল মা ও বাবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।।

লেখক: কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সাবেক গণমাধ্যম কর্মী।