ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১

একজন অসুস্থ বালকের জন্য জাতির জনকের প্রার্থনা-ভিগো অলসেন

প্রকাশ: ২০২১-০৬-১৭ ০০:৩৯:৪৭ || আপডেট: ২০২১-০৬-১৭ ০০:৪২:৫২

ভাবানুবাদ : আদিল চৌধুরী

তিল পরিমাণ সময় অপচয় করার সুযোগ নেই। ১৯৭২ সালের এপ্রিল-মে মাস। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুন;গঠনে আমার স্বেচ্ছাসেবীরা দারুন ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এদের সংখ্যা অন্যূন পঞ্চাশ হাজার। এ পঞ্চাশ হাজার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ২৪ জন মার্কিন ডাক্তার। চট্টগ্রামের দোহাজারি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত এদের কর্মক্ষেত্র।

ঠিক এমনি সময়ে একটি নাটক যেন মঞ্চস্থ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। মঞ্চের পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল। পর্দা যতই সরে যাচ্ছিল, ততই নাটকের কুশীলবগণ দৃশ্যমান হচ্ছিলেন। এ নাটকের প্রধান চরিত্র হিসাবে দৃশ্যমান হলেন বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক সমর দাস। আমি তাকে আগে কখনো দেখিনি। তবে ‘মিষ্টার মিউজিক’ হিসাবে তাঁর সুখ্যাতি আমার অজানা ছিল না। তিনি সম্ভবত সে বিখ্যাত সুরকার যিনি গানের সুরে বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনে উদ্ধীপ্ত করেছিলেন। তার অসংখ্য দেশাত্ববোধক গান এখনো বাঙ্গালীর মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। জাতীয় সংগীতের সুর অর্কেষ্ট্রায় তোলার দায়িত্বও তিনি পেয়েছিলেন। সমর দাস ভাগ্যবান বাঙ্গালী সন্তান। তিনি ভাল গায়ক এবং হারমোনিয়াম বাদক হিসাবে নন্দিত। বাঙ্গালী খৃষ্টানদের মধ্যে তাঁর স্থান আকাশচুম্বি। সমর দাস ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে আজকের কাহিনী।

১৯৭২ সালের ৩রা এপ্রিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অফিস কক্ষ- আজকের নাট্যমঞ্চ। মন্ত্রী পরিষদের বৈঠক চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বৈঠকে পৌরহিত্য করছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছিল বৈঠক চলাকালে অপ্রয়োজনীয় কাউকেই কক্ষে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। ঠিক এমনি পরিবেশ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অফিস কক্ষের দরজা ধমকা বেগে খুলে গেল। মন্ত্রী সভার উপস্থিত সদস্যবৃন্দ হতবাক। প্রধানমন্ত্রীর সহকর্মীবৃন্দ উষ্মা মিশ্রিত দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ধমকা ঝড়ের বেগে প্রধানমন্ত্রীর অফিস কক্ষে প্রবেশকারী ব্যক্তি সমর দাস। চলনে বলনে তিনি রাজসিক ব্যক্তি। চল্লিশ উর্ধ্ব বয়স। তাঁর চেহারায় রয়েছে আভিজাত্য। কক্ষে প্রবেশ করেই তিনি অস্বস্থিতে আক্রান্ত হলেন। কোন দিকে যাবেন কিংবা কি বললেন এ মুহুর্তে স্থির করতে পারছিলেনা তিনি। তাঁর চেহারায় বেদনার ছাপ। তাঁর অভিজাত চেহারায় ছিল বিষন্নতা।

 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সমর দাসের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন এবং তাঁকে ঝঁড়ো কাকের মত দেখাচ্ছে কেন জানতে চাইলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের সামনে ক্ষুদ্র সমর দাস কুকঁড়ে গেলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অফিস কক্ষে। বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করার জন্য তারঁ ভিতরে ভীতি-কম্পন তৈরী করল। তিনি নির্বাক পাথর মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলেন। অথচ নির্বাক এ পাথর মূর্তির সারা দেহে বিষাদ এবং করুনা সাত রং নিয়ে আবরণ তৈরী করে চললো।

শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের মনের গভীরে ডুব দেয়ার ভাল ডুবুরী- তিনি সমর দাসের মনের গভীরে ডুব দিলেন এবং তাঁর মনের খবর খুব সহজেই বুঝে গেলেন। অত:পর প্রধানমন্ত্রী সমর দাসকে কাছে ডাকলেন ও সবিস্তারে তাঁর বিষয় বর্ণনার জন্য বিনয় জানালেন।

সমর দাস মহান নেতার অভয় বাণীতে আশ্বস্থ হলেন। শেখ মুজিবুর রহমান সমর দাসকে জড়িয়ে ধরলেন। ভয় ধীরে ধীরে সাহসের পথ দেখাল। সমর দাস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর পুত্রের দুরারোগ্য ব্যাধির বিষয় জানালেন। ঢাকায় তাঁর পুত্রের চিকিৎসা অসাধ্য। পুত্রকে যেখানে চিকিৎসার জন্য এই মুহুর্তে নিয়ে যাওয়া দরকার সেখানে রাস্তা যুদ্ধ বিধ্বস্ত। গাড়ীতে গেল ছেলেটি মরেই যাবে।

সমর দাস পরে আমাকে বলেছিলেন মনের সম্স্ত শক্তিকে একত্রিত করে অবসাদ ঝেড়ে প্রধান মন্ত্রীর কাছে তারঁ হেলিক্পটার চেয়ে বসলেন। এ মহান নেতা সমর দাসের বেদনার অংশীদার হলেন। তাঁর ব্যক্তিগত হেলিকপটার ব্যবহারের অনুমতি দিলেন।

সমর দাসের এই টুকু পথ আসতে অনেক সময় পার হয়েছে। তার আগে অনেক ঘটনা অনেক নাটক। তাঁকে সময়ের ঢেউ মাথায় তুলে নাচাতে নাচাতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অফিস কক্ষ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আমরা আস্তে আস্তে তার বর্ণনা দেব।

এ নাটকটিতে আমার ভূমিকা কিভাবে তৈরী হল তার ইতিহাস ভিন্ন। অবশ্য এ বর্ণনাটি দিতে সমর দাস বড়ই লজ্জবোধ করেন। যেহেতু পরিবেশের কারণে তিনি শিশুর মতন ছিলেন। পৃথিবীতে কিছু কিছু ঘটনা আছে। তার ঘাত-প্রতিঘাত মানুষকে শিশু বানিয়ে ফেলে। সমর দাস সে ঘাত-প্রতিঘাতের শিকার। সমর দাসের সাথে সাক্ষাতের পূর্বে আমার সহকর্মী ও মিশনারী ক্যালভিন অলসনের সাথে সমর দাসের পরিচয় ও ঘনিষ্টতা ছিল। এই ক্যালভিন অলসনের মাধ্যমে সমর দাস আমার সাথে পরিচিত হলেন। ক্যালভিন আমাকে সমর দাসের মৃত্যু পথযাত্রী পুত্রকে দেখাতে নিয়ে যান। ঢাকার একটি হাসপাতাল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের হাসপাতাল যেরকম হওয়া দরকার ঠিক সে রকম। হাসপাতালের অন্ধকারাচ্ছন্ন দীর্ঘ ওয়ার্ড । দীর্ঘ এই ওয়ার্ডের সীটে সমর দাশের পুত্র এলভার্ট গভীর আচ্ছন্নতার মধ্যে আজ ১৩ দিন অতিবাহিত করছে। ছেলেটির বয়স ১১ বছরের বেশী হবে না। আমি ছেলেটিকে গভীর অন্ত:দৃষ্টিতে:দেখছিলাম। সে ধুকঁছে। সে এক পা এক পা করে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে। তার হাতে ইনট্রাভেনাস ফ্লুইডের ড্রপি মেয়েদের অলংকারের মত শোভিত এবং নাকে ছিল খাবারের নল। আমার ইচ্ছে হল মোমের তৈরী শিশুর সাথে তাকে তুলনা করি। শিশুটির জন্য আমার মমতা উদ্বেল হল। গভীর আচ্ছন্নতার মাঝেও তারঁ শ্বাস প্রশ্বাসের ছন্দময় উত্তানপতন আমাকে আশার ক্ষ্মীণ আলো দেখালো। সমর দাসের পরিবারের মহিলারা ছিলেন- ছেলেটির যাতনাবিদ্ধ পাহারাদার। সমর দাস তখনো হাসপাতালে এসে পৌঁছাননি। আমি তাঁর জন্য অপেক্ষা না করে এলভার্টের মা’য়ের সাথে আলাপ শুরু করলাম। এলভার্টের রোগ সম্পর্কিত যাবতীয় ইতিহাস তিনি আমাকে জ্ঞাত করলেন। তাঁর বর্ণনা সময়কে দীর্ঘ করে দিল। ভদ্র মহিলার বর্ণনা পরিকল্পিত এবং রাজসিক। তিনি বিশুদ্ধ বাংলায় আমার সাথে আলাপ করে চললেন। তার বর্ণনা ছিল চমৎকার। চিকিৎসকের বোঝ ব্যবস্থার জন্য সহায়ক সহযোগিতাও বটে। এলভার্টের মা’য়ের বাংলা বুঝতে আমার কোন সমস্যাই হল না। কারণ এদেশে আমি দীর্ঘ দিন অতিবাহিত করেছি। ধর্ম প্রচার ছাড়াও এদেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় আমি যে সময় ব্যয় করেছি– তা ভাষা শিক্ষায় আমাকে প্রভূত সাহায্য করেছে বলেই আমার বিশ্বাস। এত দীর্ঘ সময় একটি ভাষা উপযুক্ত ভাবে আয়ত্ব করার মাঝে আমি আনন্দ পেলাম। এলভার্টের মা’য়ের রোগ বর্ণনা আমার কাছে অর্থপূর্ণ মনে হল। এলভার্টের মায়ের দেয়া বর্ণনা হতে আমি রোগ চিকিৎসার প্রয়োজনীয় নিদান মনে মনে গুছিয়ে নিলাম।

পরিকল্পিত ভাবে তার দৈহিক প্যাথলজির পরীক্ষাগুলো করা হল। এলভার্টের বাম পাশের হাত এবং পা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাত গ্রস্থ ছিল। অথচ শিশুটি ছিল সংজ্ঞাহীন। পৃথিবীর সমস্ত আপদ যেন তাকে ঘিরে রেখেছে। প্যাচাঁনো এই জাল ছিড়ে শিশুটির বের হয়ে আসা কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়তির উপর নির্ভরশীল। তার মাথার খুলির ভিতরে স্ফীতির বিষয়ে আমি নি:সন্দেহ হলাম। INTRACRANIAL SPACE  OCCUPYING LESION এর কারণে মাথার ভিতরে চাপ ক্রমশ: বাড়ছে বলে আমার মনে হল। এটি মস্তিস্ক টিউমারের পূর্ব লক্ষণ। আমি নিশ্চিত হলাম। আমার চিন্তর জাল ছিন্ন করলেন সমর দাস। তিনি উপস্থিত হয়ে আমাকে সম্ভাষণ জানালেন।

সমর দাস তার পুত্রের শয্যার পাশে আমাকে দেখে আপ্লুত হয়েছেন। তিনি নিজের মানসিক অবস্থার কথা বর্ণনা দিলেন। আমাকে কাছে পাওয়ার জন্য তার প্রাণান্তকর প্রার্থনার বিষয়টি তিনি বার বার উল্লেখ করলেন। আমাকে নাগালে পাওয়ার বিষয়টিকে তিনি ঐশ্বরিক সাহায্য হিসাবে বিবেচনায় নিলেন।

সমর দাস পুত্রের চিকিৎসায় ত্রুটি রাখেননি। তেরদিন চলে গেছে। পুত্রের চিকিৎসায় কোন ফলোদয় হয়নি। পরিস্থিতি বরং অবনতিশীল। এমন অবস্থায় তিনি সর্বোচ্চ মূল্যে- পুত্রের চিকিৎসার জন্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ধারস্থ হয়েছেন। পুত্রকে বহি:রাষ্ট্রে চিকিৎসার জন্য অনুরোধ করেছেন। সবই বিফল। ঠিক এমনি অবস্থায় আমাকে পেয়ে সমর দাস মনের দরজা খুলে দিলেন। আমাকে পাওয়ার বিষয়টি সমর দাস অলৌকিক সাহায্য ভাবছেন। সমর দাস আন্তরিক ভাবে ইশ্বরের প্রতি আনত হলেন। সমর দাসের কথা শুনে আমার মনে হল তিনি খুব একটা বেশী ধার্মিক নন। তবে তাঁর প্রাপ্তি তাঁকে ঈশ্বরের প্রতি আস্থাবান করে তুলেছে বলেই মনে হল। তিনি আশার আলো দেখতে পেলেন সম্ভবত।

তিনি পুত্রের চিকিৎসার জন্য উদগ্রীব হচ্ছিলেন। আমার কাছে বার বার জানতে চাচ্ছিলেন ছেলে সুস্থ হবে কি না। কিন্তু আমি চিকিৎসক হিসাবে আমার যে নীতি জ্ঞান তার অনুপাত হল- এলভার্টের বর্তমান চিকিৎসকের সাথে আগে খোলামেলা আলোচনা করে তার পর সিদ্ধান্ত নেয়া। এলভার্টের চিকিৎসক তিনি মেডিসিনের অধ্যাপক। অধ্যাপক সাহেব আমার পূর্ব পরিচিত এবং বন্ধু স্থানীয়। তাঁর সহযোগিতা আমাকে মুগ্ধ করল। এলভার্টের পরিবারকে আমি চিকিৎসার ব্যাপারে আশস্ত করলাম। তবে যে চিকিৎসা আমি প্রয়োজনীয় মনে করলাম তা ছিল বিপদজনক। আমি এলভার্টের মাথার খুলি ছিদ্র করার কথা ভাবছিলাম। বিষয়টি সাধারণ চিকিৎসার দৃষ্টিতে বিপদ জনক হলেও এলভার্টের জন্য মোটেও বিপদজনক ছিল না। কারণ এলভার্টের জীবন প্রদীপ এমনিতেই নিভে যাচ্ছিল। তাঁর হারাবার তেমন কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না। যা করার তা দ্রুত তার সাথে করতে পারলেই বরং বালকটির নি®কৃতি সম্ভব। এলভার্টের বর্তমান চিকিৎসক একজন নিউরো সার্জন এবং প্রয়োজনী যন্ত্রাপাতি তালাশের চেষ্টা শুরু করলেন। অচিরেই তিনি ব্যর্থ হলেন। কারণ যুদ্ধ পরবর্র্তী ঢাকায় ওই ধরনের বিপদজনক পরীক্ষা কিংবা অস্ত্রোপচার তখন সম্ভব ছিল না। সমর দাসকে আমি তার পুত্রের চিকিৎসা বহি:বিশ্বে করারনোর পরামর্শ দিলাম কিংবা সেটি যদি সম্ভব নাও হয় তবে মালুমঘাট খৃষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেয়া যেতে পারে বলে অভিমত দিলাম। আমাদের হাসপাতালে সীমাবদ্ধতা আছে জেনেও আমি সমর দাসকে নিরাশ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হলাম। একজন পিতার বুক ভেঙ্গে যাক- তা আমি চাই না। প্রথমত আমরা জেনারেল সার্জন- তবুও প্রয়োজনে যেখানে অন্যকোন উপায় থাকে না, সেখানে কি আর করা! সমর দাসের স্ত্রী এবং সমর দাস আমার উপর অগাধ আস্থা নিয়ে বসে আছেন। কাজেই সব কিছু ঝেড়ে ফেলে সমর পুত্র এলভার্টকে আমার হাসতপালে নেয়াই সাব্যস্থ হল।

কিন্তু ঢাকা হতে কক্সবাজার। এই এক বিশাল পথ। অসুস্থ এই মৃত্যু পথে যাত্রী শিশুকে কিভাবে নেওয়া যায়- তা ভেবে আমি চঞ্চল হয়ে উঠলাম। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভাঙ্গা চোরা রাস্তা। ২৫০ মাইল পথ। এলভার্ট ততক্ষণ বাঁচাবে কিনা সন্দেহ। আমরা আকাশ পথের চিন্তাকে প্রধান্য দিলাম। কক্সবাজারে বাণিজ্যিক বিমান আসে। তবে হাসপাতাল থেকে তা ৭০ মাইল দূরে হবে। এলভার্টের মত রোগীর জন্য ৭০ মাইল গাড়ীর পথ হবে মারাত্মক ধরনের। অতএব বিশেষ বিমান ছাড়া উপায় নেই।

আমি নিজেও বিমান বাহিনীর প্রধানের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি বিমান বন্দরের সকল বিমানের সংবাদ রাখেন। বিমান বাহিনীর প্রধান আমাকে কোন ধরনের ভরসা দিতে পারলেন না। আমি ভাবছিলাম আমার হাসপাতালের ৬ মাইলের মধ্যে ২য় বিশ্ব যুদ্ধে ব্যবহৃত একটি পরিত্যক্ত বিমান ক্ষেত্র আছে। স্থানটি চকরিয়া। তবে সেটির রানওয়ে অক্ষত না থাকার সম্ভাবনা বেশী। এটি যদি ঠিক থাকতো তাহলে জাতি সংঘের ছোট বিমান ব্যবহার করা যেত। অনেক চিন্তা ভাবনা করে চকরিয়া বিমান ক্ষেত্রের রানওয়েটি যে অক্ষত নেই তা আমি নিশ্চিত হলাম। অতএব বিশেষ বিমানের আশাও রহিত হল। বিমান বাহিনী প্রধান আমার মাথায় একটি অসাধ্য সম্ভাবনাকে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। বিমান বাহিনী প্রধান আমাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হেলিকপটারটি ব্যবহারের অনুমতি প্রাপ্তিতে তদবীর করতে বললেন। তবে তিনি আমাকে সতর্ক করেছিলেন যে, এর আগে একজন গুরুত্ব্পূর্ণ কেবিনেট মন্ত্রীকে হেলিকপটারটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হেলিকপটারটি পাওয়া না পাওয়ার সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে এগোলাম। আমার সহকর্মী কেলভিন অলসনকে বিষয়টি জানালাম। কেলভিনকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সাথে হুক আটকাতে বললাম। কেলভিন সময়মত বিষয়টি সমর দাসকে জানালেন। আমি জানি এটি বিশাল এবং অসাধ্য একটি ফরমায়েশ। তবুও সমর দাসকে বললাম হাল ছাড়া যাবে না। সমর এর মধ্যেই কেলভিন অলসনকে নিয়ে তাঁর আরাধ্য কাজ শুরু করে দিলেন। আসলে মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। অনেক ক্ষুদ্র মানুষ অনেক বিশাল কাজ, অনেক সহজেই করে ফেলতে পারে। সমর দাস সেই কাজটিই মনের জোরে করে ফেললেন।

সমর দাস তাঁর কাজ সারতে সারতে আমি আমার কাজ গুলো সেরে নিতে চাচ্ছিলাম। কারণ যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য আমরা ৩০ লক্ষ ডলারের MEDICAL ASSISTANCE  PROGARMME এবং ASSOCIATION  OF BAPTISTS  FOR WORLD এর প্রকল্পের জন্য ট্রাক সংগ্রহ ও সরকারী অনুমোদন সংগ্রহ করবো। এ প্রকল্প দোহাজারি হতে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত যুদ্ধ বিধবস্ত এলাকায় গৃহ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ চালিয়ে যাবে। অতএব বিষয়টি সহজ নয়। আমার কথা থাক। আবার আমরা নাট্যমঞ্চে ফিরে আসি।

সমর দাস এবং কেলভিন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগ শুরু করলেন। সমর দাসের সাথে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিবের একান্ত পরিচয় থাকার পরও তাকে বসিয়ে রাখা হল। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নিষেধ আছে। সময় বয়ে যাচ্ছে। পিতৃহৃদয় উতলে উঠছে। তিনি সমস্তÍ কিছুকে তোয়াক্কা না করে- পাশ কাটিয়ে, বেপরোয়া ভাবে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করে গেলেন। এই প্রবেশের বর্ণনাটি আমি কাহিনী শুরুর প্রথমে দিয়েছি।

বাংলাদেশের নন্দিত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সমর দাসের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করলেন। হেলিকপটারের ব্যবস্থা নিলেন। টেলিফোনে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন। সম্ভবত বিমান বাহিনী প্রধান প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেয়ে হতবাক হয়েছিলেন। আসলে হতবাক হওয়ার কথাই বটে!

মান্যবর প্রধানমন্ত্রীর যাবতীয় সহযোগিতা পাওয়ার পর সমর দাস ভারমুক্ত হলেন। তিনি কক্ষের বাইরে আসার জন্য উদ্যত হলেন। ঠিক এমনি সময় বাংলাদেশের স্থপতি ও জনক সমর দাসকে ফিরে তাকাতে বললেন। প্রধানমন্ত্রী একজন পিতার মত। ভরাট কন্ঠে এলভার্টের জন্য প্রার্থনা বাক্য উচ্চরণ করলেন।

সেদিন যাওয়া হল না। এদেশে বর্ষার খেলা অন্যরকম। মৌসুমী বায়ুর আশংকায় কোন বিমান আকাশে উড়াল দেয়নি। তার পর দিন সকালে এ্যাম্বুলেন্স থেকে সংজ্ঞাহীন এলভার্টকে হেলিকপটারে তুলে দেয়া হল। হেলিকপটারের মেঝে শুয়ানো হল এলভার্টকে। এলভার্টের আত্মীয় স্বজনরা এলভার্টকে ঘিরে বসল। আমিও তাঁদের সাথে। হেলিকপ্টারের যাত্রা শুরু হল। আমরা আকাশে পাখা খুলে দিলাম। নি:সাড় মেঝে পড়ে আছে শুধু এলভার্ট। চকরিয়ার মালুম ঘাট খৃষ্টান মোমোরিয়াল হাসপাতালের কাছাকাছি হেলিকপটার নেমে আসল। বাকী পথ আমরা এ্যাম্বুলেন্সে করে পার হলাম।

এলভার্টের মাথার খুলি ফুটো করে চিকিৎসার যে চিন্তা ছিল তা আমি মন থেকে আপাতত বিদায় দিলাম। মনের মধ্যে উদয় হল মস্তিস্কের স্ফীতির জন্য যক্ষ্মা জীবানু দায়ী নয় তো? সিদ্ধান্ত নিলাম জটিল এবং ঝুকিপূর্ণ এ পরীক্ষাটি আরো পরে করবো। প্রচন্ড ইচ্ছা হল যক্ষ্মা প্রতিরোধক ওষুধ প্রয়োগ করি। আমার সহকর্মী ডাক্তার ডন কেসামের সহযোগিতা চাইলাম। ডাক্তার কেসাম আমার পরিকল্পনার সাথে শেয়ার করলেন। ইশ্বরকে ধন্যবাদ। ঔষুধ দেয়ার ৩৬ ঘন্টা পর এলভার্টের দেহে খুব সামান্য উন্নতি পরিলক্ষিত হল।

কুয়াশা ভেদ করে বেরিয়ে আসার জন্য এলভাটের যে সংগ্রাম-সে সংগ্রামে মালুমঘাট খৃষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে সকল কর্মীরা যেন অভিন্ন হয়ে পড়ে। নিজের আপন জনের মত তারা এলভার্টের জন্য এখন প্রার্থনায় নিমগ্ন। গির্জায় তাঁর জন্য প্রার্থনা চলছে। প্রার্থনা এবং চিকিৎসা পরস্পর যেন হাত ধরে দাঁিড়য়ে আছে। এ চিকিৎসা আরো ৩৬ ঘন্টা বিরতিহীন ভাবে চালিয়ে গেলাম। উন্নতি নি:সন্দেহ প্রতীয়মান হল। ঈশ্বরের কাছে আমার হৃদয় আনত হল।

মস্তিস্কের কোন বিপদজনক পরীক্ষার দিকে যেতে হল না। অতি ধীরে এলভার্ট অন্ধকার জগত হতে আলোরদিকে মুখ ফিরাল। সে আস্তে আস্তে কথা বলল। আমার বুক থেকে পাথর নেমে গেল। আমি ষ্পষ্ট দেখলাম এভার্টের পিতা মাতা ভারমুক্ত হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। সমর দাস এবং তাঁর স্ত্রী যদি আমাকে বিপদ জনক অস্ত্রোপচারের অনুমতি না দিতেন, তবে এলভার্টকে আমি আমার হাসপাতালে আনতাম না। আমার ইচ্ছায় নয়। ইশ্বর তাঁর নিজের ইচ্ছাকে পরিপূর্ণ করার জন্য এলভার্টকে আমার হাসপাতালে নিয়ে এলেন। আমার ইচ্ছা ছিল বিপদ জনক অস্ত্রোপচার। ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। সমর দাসের ভাষায় অনুমতি দেয়ার ইচ্ছার পেছনে ঈশ্বরের অলৌকিক কান্ড ছিল।

আমি অনুভব করলাম মহান প্রভু বিশ্বাসীদের আপদ মুক্ত করতে পারেন। হৃদয় দরজায় ঈশ্বরের আলোকিত প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতে পারেন। হৃদয়ের আয়নায় আলোর ঝিলিমিলি দিয়ে জীবনী শক্তিকে নিস্কৃতির পথ দেখাতে পারেন। এলভার্টের জীবন লাভ মানুষের আলোকিত জীবনী শক্তির মাঝে ইশ্বরের পবিত্র অধিষ্ঠানকে দৃঢ় করে দিল। জীবন- বিশ্বাসীদেরকে অমর করে। সমর দাস বিশ্বাসের মাঝে অমরত্ব নেবেন। পৃথিবীর তাবত বিশ্বাসীদের হৃদয়ের কাছে সমর দাস নিজের হৃদয় দরজা খুলে দিলেন। আমার মনে হয় মানুষ নিজের ভিতরে পবিত্র আত্মাকে যখন দেখেন তখন দিশেহারা হন। অন্ধকারে তীব্র বৈদ্যুতিক আলো মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। আত্মার আলো হয়তো সে রকম। মানুষ সে পবিত্র আলো দর্শনে আনন্দের কান্নায় আপ¬ুত হয়। সমর দাস আমার সামনে এসে পরিস্নাত আনন্দে আপ্লুত হলেন। তিনি কাঁদলেন।

এলভার্ট কষ্ট করে উঠে বসেছে। পক্ষাঘাত গ্রস্থ পায়ে অনুভূতি ফিরে আসছে। বাম হাতের অনুভূতি ফিরে এল আরো পরে। পর পর হাটঁছে সে। একটু একটু পায়ে দেয়াল ধরে হাঁটছে এলভার্ট। তাঁর হাঁিস পুরো হাসপাতালকে সংক্রামিত করে ফেলেছে এর মধ্যে। আমি আর ডাক্তার কেসম প্রতিদিন তার কেবিনে যাই। তাকে দেখি। তার উন্নতিকে পরিমাপ করি। কখন ছাড়া যাবে ভাবি। জীবনের স্পন্দন তাঁর মাঝে বিশালকে এনে দিয়েছে। তার প্রিয় খাবার চকলেট। সে আমাদের জন্য রেখে দেয়। তার একটিই কথা- চকলেট ভাগ করে নিতে হবে। তার ভাল লাগা আমাদের স্পর্শ করে যায়। তার পছন্দের জিনিস আস্তে আস্তে আমাদের কাছেও পছন্দনীয় হয়ে উঠে। এলভার্ট আমার দেব শিশু।

পুত্রের আরোগ্য লাভের ভিতর দিয়ে সমর দাসের ধর্ম বিশ্বাস গূঢ় রূপ নিয়েছে। সমর দাস আমার কাছে আগ্রহ করছে- হাসপাতালে তিনি ঈশ্বর বন্দনার জন্য সংগীত পরিবেশন করবেন। মালুমঘাট খৃষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে আমরা সকলেই তাঁর প্রথম সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করলাম। অনুষ্ঠানে তাঁর সংগীত সম্মোহন ছড়িয়ে দিল। রাজা ডেভিডের কন্ঠ- তাঁর কন্ঠে যেন বেজে উঠল। স্রষ্টা বন্দনার গীতরাজ্যে আমরা গভীর ভাবে নিমজ্জিত হলাম।

এক সময় এলভার্ট সুস্থ মানুষে পরিণত হল। সে হাসপাতাল ত্যাগ করতে চায়। আমরা তাকে এবং তার পরিবারকে ঘরে ফিরে যেতে অনুমতি দিলাম। সমর দাসের পরিবার ঢাকার পথে রওয়ানা হল। মালুমঘাট হাসপাতাল সমর দাসের পরিবারকে ঐশ্বরিক প্রশান্তি নিয়ে বিদায় জানাল।

পরে সমর দাস আমাকে বলেছিল তিনি ঢাকা পৌঁছেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করেন। সমর দাস বাংলাদেশের মহান স্থপতির কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে চান। সমর দাসকে সাক্ষাতের অনুমতি দেয়া হল। প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর এ সাক্ষাত ছিল আবেগঘন এবং মার্জিত। জাতির জনকের সামনে তাঁর অশ্রু ছিল আনন্দ এবং প্রাপ্তির। আজকে তাঁর মাঝে কোন জড়তা নেই। উদ্বেগ নেই। সমর দাস প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের প্রথমে জীবন সঞ্জীবনী হেলিকাপটার যাত্রার বিষয়টি সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। হাসপাতালে এলভার্টের চিকিৎসা কিভাবে হয়েছে সেটি বর্ণনা দিলেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সমর দাস মালুমঘাট হাসপাতালের ব্যতিক্রমধর্মী চিকিৎসার কথা বলে গেলেন। বলে গেলেন প্রার্থনা এবং চিকিৎসা এক সাথে কি ভাবে হয়! ধর্ম বিশ্বাস মানুষকে কিভাবে জয়ী করে। বঙ্গবন্ধুর দেয়া হেলিকপটারটি তাঁর পুত্রের জীবন রক্ষায় যে বিশাল ভূমিকা রেখেছে তার জন্য তিনি আন্তরিক কতৃজ্ঞতা জানালেন।

এলভার্টের আরোগ্য সংবাদে বাংলাদেশের জনক ও স্থপতি আনন্দিত চিত্তে গ্রহণ করলেন। তিনি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। খুব নরম সুরে। তিনি সমর দাসকে প্রথম সাক্ষাতের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলেন। প্রধানমন্ত্রী সমর দাসের পুত্রের জন্য কায়মনোবাক্যে যে প্রার্থনারত হয়েছিলেন, তা আবারো জানালেন। প্রধানমন্ত্রীর এ অনুভূতি আমার কাছে ছিল হৃদয় স্পর্শি। আমার মনে হল এই মহান নেতার যে আচরণ তা কোন ভাবেই প্রধানমন্ত্রীর মত নয়। বরং মনে হল তিনি অতি সাধারণ মনুষ্যত্ব সম্পন্ন আমাদের মত একজন। পৃথিবীর অষ্টম জনবহুল যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি নন। অতি ক্ষমতাধরও নন। বরং আমার মনে হল বজ্রাঘাতে জ্বলেপুড়ে যাওয়া একটি বটবৃক্ষ- যে বটবৃক্ষ সবুজকে ধারন করে বর্ষাস্নাত হচ্ছে। আবার জেগে উঠার জন্য। তিনি বর্ষায় ভিজে চলেছেন শুধু সবুজ হওয়ার জন্য। আমি শেখ মুজিবের অবয়বের মধ্যে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে দেখলাম। আমার মনে হল বাংলাদেশ নামক ভূ-খন্ডটি যদি কখনো সমুদ্র গর্ভে ডুবেও যায়- তবুও হাজার বছর পরেও শেখ মুজিবের নামটি বহাল থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল দায়িত্বের মধ্যেও তিনি ব্যক্তির হাসি কান্নার আবেদন শুনার জন্য তার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে রেখে ছিলেন। তিনি একজন- বজ্রাঘাত প্রাপ্ত সবুজ বটবৃক্ষ।

* ভিগো অলসেন- লেখক, ‘‘ডাক্তার ডিপ্লোমেট ইন বাংলাদেশ’’ (১৯৭৩)।

‘‘ সত্যের সন্ধানে সে অজ্ঞেয়বাদী’’

লেখক- যুক্তরাষ্ট্রের লেকটরেষ্ট এলাকায় বসবাসরত।

ভাবানুবাদ তারিখ- ২৬ মার্চ ২০১১ ইং, রত্নাপালং, উখিয়া, কক্সবাজার।