ঢাকা, শুক্রবার, ২০ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথাঃ পর্ব-১৭ (শেষ পর্ব)

প্রকাশ: ২০২০-১২-১৬ ২৩:০৩:৩৯ || আপডেট: ২০২০-১২-১৬ ২৩:০৩:৩৯

এম.ফজলুল করিম:

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের বরেণ্য ছাত্র বর্তমান উখিয়া কলেজ তথা কক্সবাজার জেলার ইতিহাসবিদ অধ্যাপক তহিদুল আলম তহিদের কথা বলছিলাম। যিনি বর্তমানে উখিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তিনিই ১৯৮৫ইংরেজী সনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন উখিয়া উপজেলাতে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করার সর্বপ্রথম দাবী উত্থাপন করেছিলেন। কলেজ করার দাবী উত্থাপনের প্রেক্ষাপট হচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ২য় বর্ষে পড়ার সময় ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধব এর সাথে আলাপ করার সময় কথা প্রসঙ্গে উখিয়ার কথা চলে আসলে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের পক্ষ থেকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, উখিয়া উপজেলায় কয়টি কলেজ আছে? তহিদ নীচু স্বরে বললেন, দুভার্গ্য উখিয়াতে এখনও পর্যন্ত কোন কলেজ নেই। এতেই তাঁর বন্ধুরা মন্তব্য করলো ‘৯০ এর দশক শেষ হতে চলেছে, এখন্ও কলেজ বিহীন উখিয়া উপজেলা। সহজেই আন্দাজ করা যাচ্ছে, উখিয়াতে উচ্চ শিক্ষার সূচক কতটুকু সহজেই বুঝা যাচ্ছে। কথাটি তহিদ সাহেব শুনার পর তাঁর মনে খুব রাগ ধরেছিল। উখিয়ায় অতীতে যারা শিক্ষিত হয়েছিল, তাঁদের উপর খুব রাগ উঠেছিল। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে বাড়ীতে আসলে, বন্ধুদের নিকট থেকে শুনা মন্তব্যের ব্যাপারে বন্ধু বান্ধবদের নিকট শেয়ার করত। হঠাৎ একদিন উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত বিজয় দিবসের সকালে ছাত্র জামায়েতে উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কম পক্ষে ৬/৭ জনের একটি দল ‘উখিয়াতে কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবীতে শ্লোগান দিতে দিতে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন’, বিকেলে আলোচনা সভাতেও কলেজের দাবীটি আবারো প্রতিধ্বনিত হলো। এরপর যেখানে সম্ভব সেখানেই কলেজ করার দাবীটির কথা হচ্ছিল। দাবীটির ব্যাপারে পুর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করতেছিল আর এক বিপ্লবী ও প্রতিবাদী তরুণ নুর মোহাম্মদ সিকদার। তারা দু’জনেই কলেজ প্রতিষ্ঠার জনমত গঠন করতে লাগল। এর মধ্যে কলেজ বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি গঠন করল। তহিদ, নুর মোহাম্মদ সিকদার, মোজাম্মেল হক, সাইফুল মাষ্টারের ছোট ভাই নজরুল ইসলাম (বাদল) আরো কয়েকজন ছিল। এরপর পর কাজী সাহাব উদ্দিন, আব্বাস উদ্দিন (বর্তমানে চট্টগ্রামে বড় ব্যবসায়ী), কোট বাজারের রফিক উদ্দিন, আব্দুল্লাহ আল মামুন (শাহীন) এদেরকে ও কলেজ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদে দেখা গেছে।

ইতিমধ্যে ১৯৮৭ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব মাহমুদুল হক চৌধুরী (তারিখ মনে নেই) উপজেলা চেয়ারম্যান মিলনায়তনে উখিয়াতে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য এলাকার গণ্যমান্য ও শিক্ষক জনগোষ্ঠীর সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় যারা ইতিমধ্যে স্মাতকোত্তর পরীক্ষা সমাপ্ত হয়েছে। তাঁদেরকে প্রস্তাবিত কলেজ ও অধ্যাপনা করার জন্য নাম তালিখাভুক্ত করলেন, সে দিন আমিও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে প্রভাষক হিসেবে নাম অন্তর্ভূক্ত করেছিলাম। সেদিন সভায় মিয়া মোহাম্মদ হোছনকে (পাগলির বিল, মরিচ্যা) প্রস্তাবিত কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের জন্য নির্ধারণ করে কলেজের প্রাথমিক কার্য সম্পাদনের জন্য দায়িত্ব দিয়েছিল।

উখিয়া উপজেলার চারদিকে হাটে, ঘাটে, বিভিন্ন লোক সমাগমে কলেজের দাবীটি ধীরে ধীরে প্রকট আকার ধারণ করাতে ইতিমধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছিল সার্বিক বিচারে উপজেলা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক চৌধুরীর বিচক্ষণতা বা কলেজ করার মর্ম অনুধাবন করে কলেজ বাস্তবায়নের জন্য অধ্যক্ষ নিয়োগ, প্রভাষকগণের তালিকাভুক্তি ইত্যাদি করে উখিয়া উপজেলার মানুষের দাবী বাস্তবায়নের বাস্তবরূপ দিতে চেয়েছিল কিংবা কলেজ করার দাবীটি শীতল করার জন্য হয়ত বা পদক্ষেপ নিয়েছিল।

বিষয়টি চেয়ারম্যান সাহেব ভালো জানতেন, কলেজের সেদিনের মিটিং এর পর আর কোন মিটিং হয়নি। ৫/৬ মাস পরে কলেজের দাবীটা চাপা পড়ে গেল। শুনছিলাম বেশ কিছু চাঁদা হিসাবে উত্তোলন করেছিল। কত টাকা উঠেছিল, সে ব্যাপারে মিয়া মোহাম্মদ হোছন ও উপজেলা চেয়ারম্যান ভাল জানবে।

অত:পর ৮৯/৯০ সনের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম ইউনাইটেড হোটেলের মালিক বদিউর রহমান সাহেব এসে কলেজ করার বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘রড ও সিমেন্ট’ প্রায় ২ লক্ষ টাকার মালামাল এনেছিলো। কিন্তু বদিউর রহমান সাহেব উখিয়াস্থ কোন একজনের নাতনীর প্রেমে পড়ে যায়। ইত্যবসরে গরুর বাজারস্থ কলেজের জায়গা ব্যাপারে বন বিভাগ মামলা করলে, স্থগিত থাকতে থাকতে কলেজ করার সিদ্ধান্ত অনেকটা প্রোফাইল হয়ে যায়। এরপর উখিয়ার উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব নুরুল ইসলাম চৌধুরী, তিনিও উখিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য আটঘাট বেঁধে কোমর বেঁধে নেমেছিল। কিন্তু কলেজ প্রতিষ্ঠার চরম মুহর্তে উনার (চেয়ারম্যান সাহেবের) শারীরিক অসুস্থতার কারণে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যম আবারো থেমে যায়। উনি টাকা পয়সা যা উঠাইছিল সেগুলো কি করেছেন উনিই ভালো জানেন।

অত:পর ১৯৯১ সনের নির্বাচনে সাবেক এমপি শাহাজাহান চৌধুরী উখিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় ঘোষণা করলেন, আমি উখিয়া উপজেলায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। মাত্র তিনজন ছাত্র পেলেই কলেজ শুরু করে দিব। ইনশাল্লাহ। সে দিনের জনসভায় কর্ণেল অলি আহাম্মদ (বীর বিক্রম) উপস্থিত ছিলেন। জনাব শাহজাহান চৌধুরীর সাথে কন্ঠ মিলিয়ে কর্ণেল অলিও কলেজ করার ঘোষণাটি দ্বিরোক্তি করলেন। শাহাজাহন চৌধুরীর ঘোষিত কলেজটিই আমি বর্তমান উখিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হল। ৭টি বিষয়ে (অনার্স), ৪টি বিষয়ে (মাষ্টার্স) শ্রেণি করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জনাব তহিদুল আলম তহিদ আজ উখিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।

বিভাগীয় প্রধান সাহেবের প্রতি আমার দুটো অছিয়ত রেখে যাব- আমি অধ্যক্ষ ফজলুল করিম যদি হঠাৎ না ফেরার জগতে চলে যাই, জানিনা আমার উল্লেখিত অছিয়ত দুটো বাস্তবায়ন করলে হয়ত আমার আত্মা শান্তি পাবে।

অছিয়ত নাম্বার ১: আমার শ্রদ্ধেয় দাদা প্রয়াত বিধু ভুষণ বড়ুয়া, উখিয়া কলেজের বরাবরে ৩.২০ শতক জমি দান পত্র করে দিয়েছেন। কারণ ১৯৯১ সনে মফস্বলে কলেজ করতে চাইলে ৩.০০ (তিন) একর জমি প্রয়োজন হতো। সে কারণে দানবীর বিধু ভূষণ ৩.২০ শতক জমি উখিয়া কলেজের নামে দানপত্র করে দিয়েছিলেন। আমার সাসপেন্ডকালীন সময়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ আবদুল হক সাহেব ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার জন্য বড়ুয়া সমাজের লোকজন কে ধর্মীয় সভা করার অনুমতি চাইলে, অনুমতি দিয়েছিল। সভা অনুষ্ঠানের কারণে আমি (অধ্যক্ষ ফজলুল করিম) জমি ভাগ করে ৪/৫টি সিমেন্টের পিলার পুতে দিয়েছিলাম। সভার বাহানা দিয়ে পিলার সমূহ উপড়ে ফেলে দিয়েছে। সভার পর বাবু বিধু ভূষণ বড়ুয়া’র বড় ছেলে বাবু সতিন্দ্র বড়ুয়া বিনা অনুমতিতে জবর দখল করে টিনের ঘেরা দিয়ে দিছে। বিষয়টি কলেজ সভাপতি এমপি বদিকে অবহিত করেছিলাম। উনি দখল মুক্ত করার অনুমতি দেননি। উনি সভাপতির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার মুহুর্তে কলেজের জমির খোজ-খবর নিয়েছিলেন (বিষয়টি আই ওয়াস মনে হয়েছে আমার)। প্রায় ১.০০ একর পরিমাণ জমি জোর দখল করে সতিন্দ্র বড়ুয়া ঐ জমির উপর বিল্ডিং বাড়ী নির্মাণ করেছেন। এই বিষয়টি দেখবেন।

অছিয়ত নাম্বার ২: ১৯৯১ ইংরেজী থেকে উখিয়া কলেজের জন্য চিন্তা করে রেখে দেয়া বনভূমি ০.৯০ শতক পরিমাণ আওয়ামী লীগের উপজেলা নেতা অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরীর, একান্ত সহযোগিতায় উপজেলা যুবলীগ সভাপতি মুজিবুল হক আজাদ এর নেতৃত্বে প্রায় ০.৯০ শতক বনভূমি জোর দখল করে জায়গাটি বর্তমানে টিন দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। বিক্রি করার জন্য বার বার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছে। আসলে ঐ জায়গাটিতে কোন স্থাপনা নির্মাণ করলে সুন্দর উখিয়া কলেজের সৌন্দর্য্য ম্লান হয়ে যাবে। আমার ইচ্ছে ছিল সেখানে একটি লং টেনিস মাঠ করব। সেখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত খেলা প্রত্যক্ষ করবে। এই ভূমিটির সাথে লাগানো কলেজ ক্যাম্পাস জামে মসজিদ ও ‘মারকাযুল হিদায়াহ’ নূরানী মাদ্রাসা ও হেফজখানা, ঈদের দিন ঈদগাহ হিসাবেও ব্যবহার করার যাবে। সেই জায়গাটি ২/৩ বার কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে জায়গার একটি ইতিহাস আছে, জায়গাটি পশ্চিম পার্শ্বে (সামাজিক বনায়ন এর জন্য ১২কানি/ ৫ একর করে প্লট বরাদ্দ দিয়েছে। কলেজের সাথে লাগানো প্লটটির মালিক আওয়ামীলীগ নেতা আলী চান্দ মেম্বার। প্লট বরাদ্দ দেয়ার সময় ফরেষ্ট ডিপার্টমেন্টকে অভিযোগ করলে, উখিয়া ফরেস্ট অফিসের রেঞ্জার বাবু ডি.এন অধিকারী অর্থাৎ বাবু ধীরেন্দ্র নাথ অধিকারী, বিট অফিসার আবদুর রব, এসে সুন্দর একটি সমাধান দিয়েছিল, ফরেস্ট অফিসের অর্থায়নে। প্লট মালিক ও মসজিদ মাদ্রাসার মধ্যে যাতে কোন দিন বিরোধ না হয়। কারণ সীমানাতে বর্তমানে ড্রেন খনন করে দিয়েছিল। সেই ড্রেন এখনও আছে। তবে বর্তমানে মসজিদের পক্ষ থেকে দেওয়াল নির্মাণ করে দিয়েছে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ (অব:), উখিয়া কলেজ