ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথাঃ পর্ব-১৬

প্রকাশ: ২০২০-১২-১৪ ১০:১৮:২০ || আপডেট: ২০২০-১২-১৪ ১০:১৮:২০

এম.ফজলুল করিম
২০০১ সালের নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরে হবে। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর শ্রদ্ধেয় দাদা শমসের আলম চৌধুরী ও শ্রদ্ধেয় বড়ভাই নুরুল ইসলাম চৌধুরী দু’জনই আমার বাসায় এসেছিল। কিন্তু আমি বাসায় ছিলাম না। সে দিন মাগরিবের নামাজ শেষে শৈলের ঢেবা ক্যাম্প ইনচার্জ, শৈলেরঢেবা ক্যাম্প এর পি.আই.ও সহ মোহাম্মদ হোছন ডিলারের বাড়ীতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম। আমি রাত ৮টায় বাসায় ফিরলে, উনারা দু’জনের কথা বলেছেন। বাসায় এসে আমি তৎক্ষণাত জনাব শমসের আলম চৌধুরী সাহেবকে ফোন করলাম। আপনারা এসেছিলেন বাসায়, দুভার্গ্য আমি বাসায় ছিলাম না, কি প্রয়োজনে এসেছিলেন জিজ্ঞেস করাতে শমসের আলম চৌধুরী বলে, গভর্ণিং বডির মিটিং এর রিজুলেশন বইটি আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। দাদা রিজুলেশন বইতো পাঠানো যাবে না। রিজুলেশন বই এর কোন সভার কার্যক্রম আপনার দরকার সেটা ফটোকপি করে পাঠাতে পারি। উনি বললেন পুরো রেজুলেশন খাতাটি পাঠিয়ে দাও। এরকম রিজুলেশন খাতা পাঠানোর কোন নিয়ম নেই। আপনি একটি দরখাস্তের মাধ্যমে কোন সভার কার্যক্রম আপনার দরকার উল্লেখ করে দরখাস্তটি আমার নিকট পাঠিয়ে দিন। এই কথা বলাতে উনি খুব রাগতস্বরে আমাকে কথা বললেন, ফাঁকে বেয়াদব শব্দটিও উচ্চারণ করলেন। আমি উত্তরে বললাম বেয়াদব আমি নই, আপনি আমার নিকট থেকে যেভাবে রিজুলেশনে বই চেয়েছেন সেটা অনেকটা বেয়াদবি হয়েছে, হুট করে টেলিফোন রেখে দি। পরে শুনেছি, আমি রিজুলেশন খাতা দেয়নি।

এই অভিযোগ নিয়ে জনাব নুরুল ইসলাম চৌধুরীসহ রাত ২ টার সময় হ্নীলা মোহাম্মদ আলী এম.পি মহোদয়ের বাড়ীতে গেছেন, আমার বেয়াদবির শাস্তির আবেদন নিয়ে, জনাব এম.পি. মহোদয় উনাদেরকে বলেছেন আপনারা কেন? অধ্যক্ষের নিকট থেকে রেজুলেশনের বই খুজেছেন। আমি বললে তো বাড়ীতে এসে দিয়ে যেত। অধ্যক্ষ তো ঠিকই বলেছেন। প্রিন্সিপালের মতো কথা বলেছেন। তাছাড়া আপনারা রিজুলেশন বই নিয়ে কি করবেন। যা করতে হয়, মিটিং বসে করবেন।

এ ঘটনার কিছুদিন পর উখিয়া থেকে মোট ১৯ সদস্যের একটি দল মাননীয় এম.পি. মহোদয়ের বাড়ীতে যান। উনাকে দাবী দিয়ে বললেন, উখিয়া কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ ফজলুল করিম সাহেব কে সরিয়ে দিন। এম.পি. মহোদয় তাদের উত্তর দিলেন, কিভাবে সরিয়ে দেব। আমি সভাপতি হলাম প্রায় এক বছর হয়ে যাচ্ছে। এতদিনে কলেজের কোন শিক্ষক, কোন ছাত্র-ছাত্রী কোন অভিভাবক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে শুনিনাই। আপনারা তো কলেজের কোন ছাত্র, অভিভাবক বা শিক্ষক নন। আপনারা কলেজের জন্য লাওয়ারিশ তার বিরুদ্ধে “হয়ত নারী কেলেংকারী, নয়ত অর্থ আতœাসাৎকৃত” এই দুইটির মধ্যে যে কোন একটি প্রমাণ করো। পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেব।

আরো বলেছেন- অধ্যক্ষের দুষতো খুজে পাচ্ছি না, অধ্যক্ষের বি.এন.পি. ও জামায়াত ইসলাম এই দুটি বড় বড় দলের পূর্ণ সমর্থন আছে। আমি ককসবাজার যাওয়ার সময় উখিয়াতে আটকালে আপনারা কি সাহায্য করতে পারবেন। কোন সাহায্য যদি করতে না পারেন, তাহলে আমি যে দুটি কাজের কথা বলেছি সেগুলো প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। মোহাম্মদ আলী সাহেব ৬ মাসের জন্য হলেও কলেজে অধ্যাপনা করেছেন, যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে ভেবে চিন্তে নিতেন। আর একদিন উখিয়া কলেজে দুপুর ১২ টায় গভনিং বডির মিটিং বসেছিল। মিটিং শেষ করতে করতে প্রায় বিকেল ৩ টা পার হয়ে গেছে। এম.পি. মোহাম্মদ আলী সাহেব বাড়ী যাওয়ার জন্য গাড়ীতে উঠলেন। প্রফেসর নবী হোসেন ও এম.পি. সাহেবের গাড়ীতে উঠলেন একদম পিছনের সিটে বসেন। গাড়ীতে নুরুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশ ঠান্ডা মিয়া ফ্রন্ট সিটে উঠে বসলেন। গাড়ী যেতে যেতে কুতুপালং পর্যন্ত গেলে জনাব নুরুল ইসলাম চৌধুরী অধ্যক্ষ ফজলুল করিম কে কলেজ থেকে সরানোর ব্যাপারে কথা উঠালেন এবং অনেক কিছু বলেন। পিছনে বসা প্রফেসর নবী হোছেন সব কথা মনোযোগ সহকারে শুনলেন। এম.পি. মহোদয় কথাগুলো শুধু শুনলেন কোনো জবাব দেননি।

বালুখালী স্টেশনে গিয়ে জনাব নুরুল ইসলাম চৌধুরী গাড়ী থেকে নেমে উখিয়ার দিকে চলে আসেন। অধ্যক্ষের ব্যাপারে কথা বলার জন্য গাড়ীতে উঠেছিলেন। উখিয়া কলেজের উত্তর-পশ্চিম কর্ণারে বাবুইয়া বড়য়ার বাড়ী। তিনি জনাব এম.পি. মোহাম্মদ আলীকে রাত ১২ টায় আমি অধ্যক্ষ নাকি তার বাড়ীতে আগুন দিয়েছি এরকম একটি দরখাস্ত এম.পি. মহোদয়কে দাখিল করলেন। এম.পি. সাহেব মন্তব্য করে বললেন, আমি জানি অধ্যক্ষের কাজ হল ঠিক মত পরিচালনা করা, মানুষের বাড়ীতে রাত ১২ টায় আগুন দেয়া নয়। উনি দরখাস্ত ফরওর্য়াড করে আমাকে (অধ্যক্ষ) পাঠিয়ে দেন।

আমি পরবর্তী মিটিং এ ঘর পুড়ার দরখাস্ত খানা উপস্থাপন করলে এম.পি. মহোদয় বলেন, উখিয়ার মানুষ কি রকম জঘন্য দেখেন একজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে রাত ১২ টায় ঘরে আগুন দেয়ার অভিযোগ। আমার ভাবতেও ঘৃণা লাগে উখিয়াতে এমন খারাপ মানুষও আছে। আর একদিন বিকেলে মিটিং চলাকালীন সময়ে মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছিল, কে নাকি বলছে যে লাল বুইজ্জার গাড়ীতে মেয়ে দাও। ড্রাইভার কথাটি শুনেছে এবং চুপেচুপে এসে শমসের আলম চৌধুরীকে বলেছে। তারা দুজনই শমসের আলম চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম চৌধুরী সমন্ধে এম.পি. সাহেবকে বললেন, এম.পি. সাহেবকে বললেন, আমরা নিরাপত্তার অভাব অনুভব করছি। এম.পি.সাহেব উত্তরে বললেন, আপনাদের ওখানে নিরাপত্তার অভাব হলে আমরা কি জন্য আছি। আমি কি করব। তাহলে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাই। আপনারাও তাই করেন- হাসতে হাসতে মিটিং শেষ করে এম.পি. সাহেব গাড়ীতে উঠলেন। চলবে………

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ (অব:), উখিয়া কলেজ।