ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২

ইউপি সচিব শিহাব ও সমাজসেবা’র মোর্শেদের প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য

প্রকাশ: ২০২০-০৯-০৬ ২১:৪১:১৫ || আপডেট: ২০২০-০৯-০৬ ২১:৪৬:০৫

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
কক্সবাজার সদর সমাজসেবা অফিসের এক ফিল্ড অফিসার ও পিএমখালীর ইউপি সচিবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভাতার সুবিধাভোগী অসহায় মানুষের নিকট থেকে ইতিমধ্যে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রে জানা গেছে, পিএমখালীর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শিহাব উদ্দিন ও সদর সমাজসেবা অফিসের মাঠকর্মী মোরশেদ আলম এলাকার নিরীহ সাধারণ মানুষকে সময় অসময়ে নানাভাবে হয়রানি করে আসছে। এমনকি সরকারি কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছে না তারা। অথচ তারা বেতনভুক্ত কর্মচারী হলেও সরকারি যে কোন বিনামূল্যে সেবা প্রদান করতে নানান অযুহাতে দরিদ্র নিঃস্ব মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সমাজসেবা অফিসের মাঠকর্মী মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির ঝুড়িভর্তি অভিযোগ। তন্মধ্যে তার বিরুদ্ধে লঘু অভিযোগটি হলো স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যেকোনো মানুষের ভাতার বই করার জন্য তার কাছে আবেদন নিয়ে গেলে আবেদন সংখ্যা অনুযায়ী (জনপ্রতি) সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে কাগজপত্র গ্রহণ করেন। এরপর সে ভাতার বই করে দেন। সেই সুযোগে একটি বই করতে উপজেলা অফিসে ঘুষ নেওয়ার কথা বলে কার্ডধারীদের কাছ থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত উপরি নিচ্ছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ৮ নং পিএমখালী ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শিহাব উদ্দিন ও সমাজ সেবা অফিসের মাঠকর্মী মোর্শেদ টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। বিভিন্ন প্রকল্প ভিত্তিক তাকে আলাদা আলাদা টাকা দিতে হয়। কখনো টাকা দিলেও জুটে না কাঙ্খিত সেবা।

এছাড়াও উক্ত সচিব বিভিন্ন সময়ে অর্থের বিনিময়ে ওয়ারেশ কায়েম সনদপত্র, মৃত্যুকালীন সনদপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, চৌকিদারি ট্যাক্স, বিচার সালিশির নোটিশ ও রায়ের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে আসছে বলে জানান এলাকার মানুষ।

বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদে সরকার কর্তৃক উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা অনলাইনের মাধ্যমে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও সচিবদের একনায়কতন্ত্রের কারণে সব সেবা অর্থের বিনিময়ে নিতে হচ্ছে।

ইতিমধ্যে সদর উপজেলার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা সমাজসেবা অফিসের মাঠকর্মী মো: মোর্শেদ আলমের যোগসাজশে ইউপি সচিব শিহাব উদ্দিন তার কর্মরত এলাকা পিএমখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন ভাতাভোগী প্রায় ১ হাজার ৫ শত সদস্যকে সিম ও ভাতার বই অনলাইন এন্ট্রি করতে খরচের নামে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ টাকা।

ইউপি পরিষদ সূত্রে খবর পেয়ে সরকারি বিভিন্ন ভাতার আওতাভুক্ত সদস্যরা তাদের ভাতার বই অনলাইন এন্ট্রি করতে পরিষদে গেলে কার্ডধারী প্রতিজনের কাছ থেকে ৩০০ টাকা (সিম বাবদ ২০০, অনলাইন এন্ট্রি ফি ১০০ টাকা) করে সচিব নিয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক মানুষ। কারো নিকট থেকে নিয়েছে চারশো টাকা। আবার কারো মোবাইল নাম্বার থাকার কারণে সীম ক্রয় না করলে তাদের বই অনলাইন এন্ট্রি করতে খরচের কথা বলে ১০০ টাকা নিয়েছেন।

সচিব শিহাব উদ্দিন প্রত্যেক ভাতাভোগী সদস্যদেরকে তাদের কাছ থেকে মোবাইল সিম কিনতে বাধ্য করেছে বলে জানান অনেকে।

এভাবে সমাজসেবা অফিসার মোরশেদ আলম ও ইউপি সচিব শিহাব উদ্দিন নানাবিধ অনিয়ম দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ভাতাধারী প্রায় দেড? হাজার সদস্যের কাছ থেকে এই বিপুল পরিমাণ টাকা কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে ভাগ বাটোয়ারা করেছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পেয়ে সরেজমিন পিএমখালী ইউনিয়ন পরিষদ গিয়ে দেখা যায় অফিসের সামনে গিজগিজ করছে সেবাপ্রার্থীরা। গোমড়া মুখ নিয়ে অফিসের সামনে দাঁড়ানো পাতলীকুল থেকে আসা স্বপন চন্দ্র দাস (৬৮)। বলছিলেন নিজের বয়স্ক ভাতার বই অনলাইন এন্ট্রি করতে এসেছে। এখানে এসে সচিবের সঙ্গে দেখা করলে সে ৩০০ টাকা ( সীম ২০০ ও অনলাইন বই এন্ট্রি ১০০ টাকা) দিতে বলেন।তার কাছে খরচের ২০/৩০ টাকা ছাড়া আর কোন টাকা নেই। সকাল থেকে এভাবে অপেক্ষায় আছি। কয়েকজনকে হাত-পা ধরে বুঝিয়েছি। সবাই টাকার কথা বলেন। টাকা ছাড়া কোন কাজ হচ্ছে না। স্বপনের কথায় ‘ঠিক ঠিক’ আওয়াজ তুলে সায় দিচ্ছিলেন অন্যান্য সেবা প্রত্যাশীরাও। এখানে অবাধে চলা ঘুষ-বাণিজ্যের রমরমা অবস্থার চিত্র তুলে ধরতে তারাও হয়ে উঠেন সরব।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাখঢাক না করেই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শিহাব উদ্দিন ও ফিল্ড অফিসার মোরশেদ আলম ঘুষ-দুর্নীতির ‘রসের হাঁড়িতে’ মজে অনিয়মকে রূপ দিয়েছেন নিয়মে! আর এতে করে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে এলাকার গরিব অসহায় দুস্থ সাধারণ মানুষকে। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী লোকজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলেও কোন ফল হয় না। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনও দুর্নীতির দুষ্টচক্রের পক্ষেই উল্টো সাফাই গেয়ে থাকেন। এমন নেতিবাচক নজিরও তাদের ফেলে দিয়েছে প্রশ্নের মুখে।

এ ব্যাপারে পরিষদের এক ইউপি সদস্যের কাছে জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনা সত্যি। এ পরিষদে সচিব ও সমাজসেবা অফিসের কর্মচারী বিভিন্ন অনিয়ম করে চলছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সচিব শিহাব উদ্দিন বলেন, ঘুষ দুর্নীতির সাথে জড়িত নন। কেউ হইত আমাকে বেকায়দায় ফেলার জন্য মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সমাজসেবা অফিসের মাঠকর্মী মোর্শেদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে স্বীকার করে বলেন, সে জড়িত নয় বরং টাকা নিচ্ছে সচিব শিহাব উদ্দিন। আমি তাকে কয়েকবার নিষেধ করেছি, তারপরও সচিব কথা না মেনে টাকা নিচ্ছে বলে জানান।

চেয়ারম্যান মাষ্টার আব্দুর রহিমের জানান, বিষয়টি নিয়ে এ পর্যন্ত আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি, তারপরও আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। কক্সবাজার জেলা সমাজসেবা অফিসের উপ-পরিচালক ফরিদুল আলম বলেন, এ ব্যাপারে তিনি খোঁজ খবর নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন।