ঢাকা, বুধবার, ১৮ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথা : পব-১০

প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৮ ১৬:৪৩:৫৪ || আপডেট: ২০২০-০৪-০৮ ১৬:৪৩:৫৪

এম. ফজলুল করিম, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, উখিয়া কলেজ ॥

উখিয়া কলেজের আওতাধীন/দখলীয় ভূমি সমূহের ব্যাপারে বলে দেয়া বা বলা অধ্যক্ষ হিসেবে আমার নৈতিক দায়িত্ব উখিয়া কলেজ গেইট সংলগ্ন গেইটের পশ্চিম পাশর্^ থেকে বর্তমান কলেজের খেলার মাঠ পর্যন্ত ৪/৫ কানি বনভূমি আছে। উখিয়া কলেজের দখলে দীর্ঘ ১৯৯১ ইংরেজী থেকে ২০১৪ ইংরেজী সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ শাহজাহান চৌধুরী সাহেব যতদিন এম.পি ছিলেন, তখন থেকে অর্থাৎ ১৯৯১ ইংরেজী থেকে ২০১৪ ইংরেজী সন পর্যন্ত বিষয়টি উখিয়া কলেজের সংশ্লিষ্ট ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও কর্মচারী সবাই জানেন।

সর্ব প্রথম ভূমিটি দখল করেছিলেন বখতিয়ার আহমদ সওদাগর ১৯৯০ সালে। তিনি যখন দখল করেন তখন শৈলেরঢেবা এলাকায় কলেজ করার চিন্তা ভাবনা হয়নি। বাবু বিধু ভূষন বড়–য়া ভূমির উপর কলেজ করার চিন্তা ভাবনা চলছিল। তখন থেকে বনভূমি গুলি বর্তমান অধ্যক্ষ ফজলুল করিম দেখভাল করতেন। কলেজ করার জন্য এই বনভূমি সমূহ প্রয়োজন হবে মনে করে সব সময় ফজলুল করিম সাহেবের নজরে রাখতেন।

১৯৯২ইংরেজী সনে বাবু বিধু ভূষণ বড়–য়া যখন কলেজকে ৩.২০ (তিন একর বিশ শতক) ভূমি রেজিষ্ট্রী করে দানপত্র করে দিলেন, কলেজ গেইটের বনভূমি সমূহ কলেজ এর জন্য ব্যবহারের বিষয়টি আরো পাকাপোক্ত হল।

১৯৯৮ ইংরেজী সনের শেষের দিকে উক্ত বনভূমিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করার জন্য উখিয়া বন অফিসে একটি আবেদন করেছিলাম, তখন রেঞ্জ অফিসে রেঞ্জার ছিলেন ধীরেন্দ্র নাথ অধিকারী প্রকাশ (ডি.এন অধিকারী), বিট কর্মকর্তা ছিলেন আবদুর রব সাহেব। ডি.এন অধিকারী কোন এক সময় কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানের প্রভাষক ছিলেন, রেইঞ্জারের চাকুরী হয়ে যাওয়াতে কলেজের চাকুরী আর করেনি। সেই সুবাদে আমিও বেশি আন্তরিক হয়ে কথা বলার সুযোগ পেলাম। উনি আমাকে প্রশ্ন করলেন মসজিদ করার জন্য তো ওয়াকফ সম্পত্তি প্রয়োজন। আমি তাঁকে বুঝাতে চেয়েছিলাম টিএন্ডটি এলাকার পাশের্^ ২ মাইলের মধ্যে কোন জোত সম্পত্তি আছে কিনা আপনি দেখেন এবং খবর নেন। এক পর্যায়ে রেঞ্জ অফিসার সাহেব বললেন আমি কেন, স্বয়ং বনমন্ত্রী ও মসজিদ করার অনুমতি দিতে পারবে না। তবে একটি কাজ করা যেতে পারে। আপনারা কখন মসজিদ করে ফেলছেন, আমরা বন বিভাগ দেখি নাই। আমাদের অজান্তে আপনারা করে ফেলেছেন আর কি?

১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে একটানা ৭২ ঘন্টার হরতাল আহবান করেছিল। হরতাল আহবানের ৫ দিন পূর্বে এলাকাবাসীকে নিয়ে মসজিদ নির্মাণ সংক্রান্ত ২ বার মিটিং করেছি। ৬০/৭০ জন এলাকাবাসী মসজিদের মিটিং এ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সবার থেকে স্বাক্ষর নিয়ে রেখেছি এবং কোন প্রভাবশালী মহল কিংবা বন বিভাগ কিছু করতে চাইলে আমাকে ফেলে সবাই গা ডাকা দিতে পারবেন না। মসজিদ করার জন্য আমাকে গ্রেপ্তারও যদি করে আমি জেলে যেতে প্রস্তুত আছি। তবে আপনারা কেহ পিছু হটতে পারবে না। মসজিদ করার জন্য আসামী হতে অসুবিধা নেই।

এলাকাবাসীরা বললেন ফজলুল করিম ভাই আপনি শিক্ষিত লোক মৌলভী আবদুর রহমানের অত্যাচার সহ্য করা যাচ্ছে না। শৈলেরঢেবা মসজিদ নাকি তাঁর মসজিদ। যাদের ইচ্ছে তারা আসবে, ইচ্ছে না হলে আসবে না। যে মসজিদকে নিজের মসজিদ হিসেবে দাবী করতে পারে তার পিছনে নামায পড়াও জায়েজ হবে কিনা জানি না। যেভাবে পারেন সেভাবে একটি মসজিদ করে দাও। তা না হলে আমরা নামাজ পড়তেও পারব না। আমরা সব সময় উখিয়া, দরগাহবিল যেতে পারব না। জামাতের সাথে নামাজ পড়াও হবে না। শেষ মিটিং এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে দিন ৭২ ঘন্টার হরতাল আরম্ভ হবে সে দিন মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু করতে হবে। সবাই দা, কোদাল, খন্তা নিয়ে আগামী রবিবার সকাল ৭টায় কলেজ গেইট স্থানে আসবেন। সেদিন প্রায় ৪০/৫০ জন লোক উপস্থিত হয়েছিল। খুব আন্তরিকতার দিয়ে সবাই কাজ করতে লাগল। দুপুর ১২টার সময় হঠাৎ একজন ভিলেজারসহ ডি.এন অধিকারী বাইক যোগে মসজিদ স্থলে পৌছালেন। আমি এগিয়ে গিয়ে রেঞ্জ অফিসার কে বললাম কথাতো এমন ছিল না। আমরা কাজ করবো আপনি জানবেন না। আমার কথা শেষ না হতেই বাইক টান দিয়ে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর হেডম্যান আনু মিয়া এসে নুরুল ইসলাম সওদাগরের দোকানে বসে কিছুক্ষণ দেখল, তারপর আমার সামনে এসে বললেন এতগুলি গাছ কেটে ফেলেছেন? বহু ক্ষতি করে ফেলেছেন। আমরা মসজিদ করার জন্য মসজিদের তলা তৈরি করতেছি। ৪০/৫০ জন লোক কাজ করতেছে, কিছু টাকা দাও, তাঁদেরকে নাস্তা করাতে হবে। আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলাম টাকা আছে ২শ টাকা উনি বললেন, ঐ গুলি নাও।

আমার আজ আর টাকা নেই বলে তাড়াতাড়ি মসজিদ স্থান ত্যাগ করলেন। তিন দিনের মধ্যে মসজিদ তৈরি হয়ে গেলো। টিনের বেড়া, টিনের ছাউনি, ফ্লোর পাকা। এর পরের শুক্রবারে প্রায় ৭০ জন লোক পবিত্র জুমার নামাজ আদায় করলাম। নতুন মসজিদের জন্য দোয়া হল, পরের বুধবারে ২০ জনের একটি তবলীগ জামাতের একদল (একটি) জামাত আসল। তারা বুধবার জুহুরের নামাজ শেষ করে উপস্থিত মুসল্লিদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল। আমরা কিভাবে মানুষকে নামাজের জন্য দাওয়াত দেব, কোন পাড়ায় লোকজন বেশী। তারা শুনছে উখিয়া কলেজের পাশের্^ নাকি সবাই বড়–য়া। আমি বললাম, বড়–য়া আছে ঠিক কথা, কিন্তু তারা প্রায় ১ কিলোমিটার উত্তরে। তাঁদের একটি কিয়াংও রয়েছে।

আমরা মসজিদ করার সময় কিছু কিছু লোক সমালোচনা করেছিল। উখিয়া কলেজের অধ্যক্ষ সাহেব নাকি একটি কিয়াং করতেছে। শ্রদ্ধেয় আলী চান মেম্বার মসজিদের জায়গার জন্য দরগাহবিল থেকে লোক ডেকে এনে মারামারি করেছিল, সাইকেলের চেইন, লোহার রড, লাটি নিয়ে এসেছিল। ঐ চেইন, রড, লাটি দিয়ে তাদেরকে উল্টা পিটিয়ে দিল যাদেরকে মারতে এসেছিল। এ ঘটনায় ১৩ জনকে আসামী করে থাকায় একটি মামলা করেছিল। ১নং আসামীর নাম নিত্য আনন্দ বড়–য়া, পিতা- দেবন্দ্র বড়–য়া বাকী সবাই আমার লোক। মসজিদের নাম দিয়েছিলাম কলেজ ক্যাম্পাস জামে মসজিদ।

উক্ত মামলাটি ৬ বছর চালাতে হয়েছে। বিচারক কিছু আসামী বাদ দিয়েছিল এডভোকেট বদিউর রহমান তোতাইয়া আবার তাদেরকে হাজির হওয়ার ব্যবস্থা করেন। ছয় বছর পর আস্তে আস্তে মামলা নিস্তেজ হয়ে গেল। কলেজের বয়স বেড়ে চলল ২০০৩ সাল পর্যন্ত মামলা চলছিল। তারপর আপনা আপনি ক্লান্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ মামলা চলাতে অনিহা এসে গেছে বাদী পক্ষের। পরে মসজিদ প্রাঙ্গণে ‘মার্কাযুল হিদায়াহ’ নামে ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত নূরানী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ২০/২৫ জন নিয়ে একটি হেফজখানা হয়েছে। শত শত লোক নিয়মিত নামাজ পড়ছে।

চলবে……