ঢাকা, বুধবার, ২৫ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথা : পর্ব-৮

প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৪ ১২:৫২:০৭ || আপডেট: ২০২০-০৩-২৪ ১২:৫২:০৭

এম. ফজলুল করিম, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, উখিয়া কলেজ ॥
উখিয়া কলেজের বিরোধীকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ ১৯৮৭ ইংরেজী সনে উখিয়া কলেজ করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন আমার বন্ধু সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব মাহমুদুল হক চৌধুরী। উনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়েছিলেন পাগলিরবিল নিবাসী এডভোকেট মোহাম্মদ হোছনকে। উনি ২ মাস পর্যন্ত কার্যক্রম চালানোর পর আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়েছিল। উনি কলেজ করার প্রস্তুতিমূলক সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। আমরা কলেজের শিক্ষকতা করার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছিলাম। সভার পর থেকে আর কোন খবর পায়নি। শুনেছিলাম বেশ কিছু টাকা পয়সা চাঁদা হিসেবে সংগ্রহ করেছিল।

জনাব মাহমুদুল হক চৌধুরীর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর কলেজ করার জন্য আসলেন চট্টগ্রাম ইউনাইটেড হোটেলের মালিক বদিউর রহমান। উনি চেয়েছিলেন “বদিউর রহমান কলেজ” করার জন্য তাও আবার উখিয়া গরু বাজারস্থ বনভুমির উপর। তিনি শুভাকাঙ্খীর কথা ধরে বনভুমির উপর কলেজ করার জন্য ভিত্তি প্রস্তর দিলেন। এতে বন বিভাগ জবরদখলকারী হিসেবে বন মামলা করেদিল। একদল লোক বন মামলা চালানোর দায়িত্ব নিলেন। দায়িত্বশীল নাকি উনার নানা হয়। উনার নানা প্রতি মিছিলে মিছিলে চট্টগ্রাম গিয়ে টাকা নিয়ে আসতেন। ঐ টাকাতে মামলার খরচপাতি চালাতে লাগলেন।

‘বদিউর রহমান কলেজ’ নির্মানের জন্য ২ লক্ষ টাকার রড সিমেন্ট আনা হয়েছিল। ঐ রড সিমেন্ট উনার নানাকে হস্তাস্তর করে দিয়েছিল। ঐ সময় বদিউর রহমানের ব্রীফকেইসে স্বর্ণের বালা পাওয়া গিয়েছিল। কেন এবং কার জন্য স্বর্ণের বালা এনেছিল আমি সঠিক রহস্য জানিনা। উখিয়ার অনেকেই স্বর্ণের বালা রহস্যের খবর জানেন। স্বর্ণের চেইন কেনার জন্য নাকি কোন একজনকে (রতœাপালংয়ের) ৭ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। শুনছিলাম যাকে স্বর্ণের চেইন ও বালা দিয়েছিল তিনি রূপসী তরুণী ইউনাইটেড হোটেলে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে বদিউর রহমান সহ সিঙ্গাপুর গিয়েছিল প্রমোদ বিহারে। কথা গুলো আমার জন্য শোনা কথা হলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত। আমার সাথে ব্যক্তিগত ভাবে বদিউর রহমানের সাথে বন্ধুত্ব ছিল। বেশ কয়েকবার বদিউর রহমানের বাসায় ভাত খেয়েছিলাম। কিন্তু লজ্জার কারণে শুনা কথাগুলির সত্যতা যাচাই করতে পারিনি। তারপর আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম-উখিয়াতে আপনার নানা কে ? উত্তরে সঠিক ভাবে না বলে- ‘উখিয়া থানার পার্শ্বে উনার বাড়ী’। কি সূত্রে উনাকে নানা ডাকেন ? উনি তো আপনার বন্ধুর মতন বয়সী তাহলে কেমনে, পরে আমি আর গভীরে যাইনি।

বদিউর রহমানও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর কলেজ করার দায়িত্ব নিলেন আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই নুরুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশ ঠা-া মিয়া। উনিও কলেজের জন্য বেশ টাকা পয়সা সংগ্রহ করেছিলেন। ভাগ্য খারাপ ঐ মুহুর্তে উনি শারীরিক অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং চিকিৎসার জন্য ঢাকা-চট্টগ্রামে ডাক্তার দেখাতে লাগলেন- অসুস্থতাজনিত কারণে উনার কলেজ করার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে গেলো।

১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনটি গ্রুপ উখিয়া কলেজ করার চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হওয়ায় ১৯৯১ইংরেজী সালে শাহজাহান চৌধুরী এমপি সাহেব উখিয়া কলেজ করার কাজে হাতে দিলেন। অতীতে তিনটি দল উখিয়া কলেজ করার ব্যর্থ দল ছিল। ঐ তিনটি ব্যর্থ দলই আমি কিংবা শাহজাহান চৌধুরী’র কলেজ করার প্রচেষ্টাতে অন্তরায় হয়ে পড়েছিল।

কক্সবাজার-৪ আসন থেকে বার বার এম.পি নির্বাচিত হলেও শাহজাহান চৌধুরী প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে তিনি কলেজ করার চেষ্টা শুরু করেছিল। তবে তাঁর কাজের ধরণ পূর্বের ব্যর্থ তিন দলের চেয়ে ভিন্ন ছিল। ব্যর্থ দল গুলো প্রথম কলেজ গৃহ নির্মাণ করে সেখানে কলেজ শুরু করতে চেয়েছিল, কিন্তু শাহজাহান চৌধুরী এম.পি কলেজ গৃহ নির্মাণ না করে শহীদ মাষ্টার ইলিয়াছ মিয়া গণপাঠাগারকে কলেজের অস্থায়ী কার্যালয় এবং উখিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে থেকে দুটি কক্ষ ধার নিয়ে উখিয়া কলেজের শ্রেণি কক্ষ বানিয়েছিল। সেখানে কাজ চালাতে চালাতে শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগ, কলেজ করার আবেদন, ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রত্যয়নপত্র, কলেজের কিছু ফান্ড সংগ্রহ এ সমস্ত কাজ গুলি করতে করতে উখিয়া কলেজের ভুমি যোগাড় হয়ে গেল।

এভাবে কলেজের সাংগঠনিক কমিটি হল। শিক্ষক দল গঠিত হল। শিক্ষার্থী ভর্তি হল। তারা ফরম ফিলাপ করে এইচএসসি পরীক্ষা দিল। উখিয়া কলেজে নিজস্ব কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হল। প্রথমবার ৫৭জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩১জন কৃতকার্য হয়েছিল।

উখিয়া কলেজ থেকে সার্টিফিকেট অর্জনের প্রক্রিয়া শুরু হলো অর্থাৎ ১৯৯৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ২৯ বৎসরে এইচএসসি ও সমমানের ১৬/১৭ টি ব্যাচ পরীক্ষা শেষ করেছে। ডিগ্রী (পাস) পর্যায়ে ১১/১২ ব্যাচ। স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ১ ব্যাচ পরীক্ষা সম্পন্ন করে । এভাবেই প্রায় ২০ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ শেষে দেশ-বিদেশে চাকুরি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

২০১৭ সাল থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে ১০লাখের অধিক রোহিঙ্গা নাগরিককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক আশ্রয় দেন। উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত বিশাল এই জনগোষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ ও ত্রাণসামগ্রী সরবরাহের কাজে পুরো উখিয়া কলেজের ভবন, মাঠ ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত ৩০% চাকরিজীবি উখিয়া কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী। এমনকি দেশি-বিদেশী এনজিও’র উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবেও উখিয়া কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সুনামের সাথে চাকুরিরত আছে।

ইতোপূর্বে কলেজ করার প্রচেষ্টাতে তিনটি গ্রুপ হওয়াতে শাহজাহান চৌধুরীর এম.পির প্রচেষ্টায় বিরোধীতা একটু বেশি হয়েছে বৈকি।

উখিয়া কলেজ ব্যানবেইস ভুক্ত হওয়ার একমাস পূর্বে অর্থাৎ ডিসেম্বর/১৯৯৩ এর দিকে ব্যানবেইসভুক্ত হওয়ার শর্ত ছিল প্রভাবশালী মন্ত্রীর ডিও লেটার দিতে হবে। তখন শাহজাহান চৌধুরী এম.পি সাহেব সংসদ সদস্যের অভিজ্ঞতা অর্জনের একদল এম.পি ৪০জনের একটি দল আমেরিকা গেছেন। আমি কোন উপায় অন্ত না দেখে মন্ত্রী মহোদয়ের ডিও লেটার তৈরি করে মন্ত্রীপাড়ায় কর্ণেল অলি সাহেবের বাসায় গেলাম। দারোয়ান পুলিশ থেকে জিজ্ঞেস করলাম আমি কর্ণেল অলি মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে দেখা করব। পুলিশ বললেন সোজা চলে যান। সেখানে পুলিশ নেই। যে বাসাতে কর্ণেল অলি থাকেন।

আমি ভীত ভীত মনে বাসায় পৌঁছলাম। দেখি যে, ৫/৬জন লোকের সাথে মন্ত্রী মহোদয় আলাপ করছেন। একজন গিয়ে মন্ত্রী মহোদয়কে বলল, উখিয়া থেকে ‘উখিয়া কলেজ’ এর অধ্যক্ষ আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। রাত তখন সাড়ে ৯টা। ১৫ মিনিটের আলাপ শেষে দর্শনার্থীরা চলে গেলে উখিয়া কলেজের অধ্যক্ষকে ডাকলেন- আমি প্রবেশ করে সালাম দিলাম। বসতে বললেন- শাহজাহান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর সম্পর্কে খোঁজ খবর নিলেন। উত্তরে আমি বললাম এম.পি সাহেব আমেরিকা। ভাবী এম.পি হোষ্টেলে আছেন। তারপর বললেন কি কাজ ? আমি বললাম- স্যার ব্যানবেইস অফিস থেকে বলেছেন ‘একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী’র সুপারিশ এবং ডিও লেটার লাগবে। আমি দরখাস্তখানা মন্ত্রী মহোদয়কে দিলাম। উনি বললেন আমি ডিও লেটার দিইনা আমি সরাসরি লিখে দিই।

মন্ত্রী মহোদয় ডিও লেটার ছিড়ে ফেলে দিয়ে মূল দরখাস্তের উপর লিখে দিলেন ‘এটি আমার রাজনৈতিক ওয়াদা ছিল। উনারদের কলেজটি ব্যানবেইচ করে দিন। একদম সহজ সরল ও সাদামাটা একজন মানুষ। তিনি চা খেতে বললেন- আমি না করলাম। এরপর উনার শ্বাশুরী আসার কথা বলে উঠে চলে গেলেন।
চলবে…