ঢাকা, রোববার, ২২ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথা : পর্ব-৭

প্রকাশ: ২০২০-০৩-১৬ ১৯:০৩:০৫ || আপডেট: ২০২০-০৩-১৬ ১৯:০৩:০৫

এম. ফজলুল করিম, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, উখিয়া কলেজ।

ছেলেটি বরাবরই প্রতিবাদী স্বভাবের। কক্সবাজার শহরের অধিবাসী, আওয়ামী ঘরানার সন্তান। রাজনীতিতে লিপ্ত। সবাই তাকে মিড়া ফরিদ বলে ডাকে। আমি বলি লাল ফরিদ। বর্তমানে কক্সবাজার জর্জকোর্টের আইনজীবি ও কক্সবাজার বহুমূখী সিটি কলেজের গভর্ণিং বডির সম্মানীত সদস্য। তিনি আমাকে বহু বুদ্ধি, পরামর্শ, সাহস দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

উখিয়া কলেজ কমিটিতে উনাকে রাখার অনুরোধ করেছিল কিন্তু কোন অজুহাত না পেয়ে তা করতে পারিনি। তিনি মাষ্টার শুক্কুর সাহেবের জামাতা, তাঁকে একবার ঢাকা হাইকোর্টে তীব্র প্রতিবাদ করতে দেখেছিলাম। আমি তখন কলেজের কাজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। আমি নিজেও ৩০ বৎসরের বিজ্ঞ একজন এডভোকেট অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের এনরোলমেন্ট। উপজেলা ও কক্সবাজার মিলে দু’বৎসর আইন পেশায় নিজেকে নিয়োগ করেছিলাম। তখন আমি এবং এক্স পিপি স্বপ্না টেকনাফের এডভোকেট নুর আহমদের জুনিয়র। ঐ সময়ে বিএনপির আমল অর্থাৎ বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ট হন।

উখিয়া-টেকনাফে এম.পি নির্বাচিত হলেন শাহজাহান চৌধুরী সাহেব। তিনি বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক জনসভায় কমিটমেন্ট করেছিলেন। আমি এম.পি নির্বাচিত হলে উখিয়াতে একটি কলেজ করব। কর্ণেল অলি সাহেব নির্বাচনের পূর্বে উখিয়া আসলে উখিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় ঘোষণা দিলেন- আমি এম.পি নির্বাচিত হলে, উখিয়াতে একটি কলেজ করব। পরবর্তী প্রধান অতিথি কর্ণেল অলি সাহেবও শাহজাহান চৌধুরী’র ঘোষণাকে দ্বিরোক্তি করলেন। অত:পর যখন শাহজাহান চৌধুরী এম.পি নির্বাচিত হলেন, তখন আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন ‘ল’ এর বইপত্র গুলোকে দাও। উকালতি ছেড়ে প্রথমত: আমার কলেজটি করে দাও। কলেজ হলে ইচ্ছে মতো উকালতি করিও। কলেজ করার কাজে হাত দিয়ে কলেজ এর মায়া-মমতা ত্যাগ করতে না পেরে আজ পর্যন্ত উখিয়া কলেজে কর্মরত আছি।

উখিয়া কলেজ থেকে ক’দিন পরে অবসরে চলে যাবো। আল্লাহ হয়ত: আমার রিজিকটা উখিয়া কলেজে চাকুরী করতে লিখে রেখেছিল। ১০ মে ২০২০ আমার চাকুরি জীবন ৩০ বৎসর পূর্ণ হবে। আমি চাকুরী শুরু করার ২ বৎসর ১০দিন পর ব্যানবেইজ ভুক্ত হয়েছে।

১৯৯৪ সালে অবৈতনিক অধ্যক্ষ ছিলাম। ১৯৯৪-১৯৯৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় উখিয়া কলেজ।

২০১২ সাল থেকে ৪টি বিষয় (বাংলা, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা) অনার্স কোর্স চালু হয়।

২০১৪ সালে আরো তিনটি বিষয় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, সমাজ বিজ্ঞান, অর্থনীতি অনার্স চালু হয়। বিষয় সমূহের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বরত আছেন, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, হিসাব বিজ্ঞানে অধ্যাপক সবুজ শাহরিয়ার, ব্যবস্থাপনা বিভাগে অধ্যাপক শাহ আলম, বাংলা বিভাগে অজিত কুমার দাশ, সমাজ বিজ্ঞানে অধ্যাপক মো: আলমগীর মাহমুদ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে অধ্যাপক ফরিদুল আলম, অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপক আহমদ ফারুক।

চলতি মাসে ৪ বিষয়ে মাষ্টার্স খোলার আবেদন দাখিল করেছি এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছি। আমার চিন্তা হলো আমি থাকাকালীন কলেজটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তরিত করা। আমার জীবনে উখিয়া কলেজটি হবে আমার সৃজনশীল স্মৃতি। এ পর্যন্ত ১৫-২০ হাজার শিক্ষার্থী অত্র কলেজ থেকে ইন্টার, ডিগ্রী ও অনার্স ডিগ্রী অর্জন করে দেশে এবং বিদেশে কর্মরত আছেন। তৎমধ্যে কানাডা, আমেরিকা, লন্ডন, ফ্রান্স, সুইডেন, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন উন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে ছিঠিয়ে আছে। আবার জাতীয়ভাবেও অবদান রাখছে অনেকেই। ম্যাজিষ্ট্রেট, পুলিশ, প্রফেসর, সাংবাদিক সহ অনেক বড় বড় চাকুরিতে নিয়োজিত আছেন।

উখিয়া উপজেলাতে এমন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে উখিয়া কলেজ থেকে পাশ করা শিক্ষার্থী নেই। কলেজে বর্তমানে ব্যানবেইসধারী ৩১জন শিক্ষক আছেন। ১৬জনের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারি আছেন। সবার চাকুরির নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর আমি ফজলুল করিমের।
অনার্স এর জন্য প্রতি বিষয়ে ৫জন করে ৭ বিষয়ে ৩৫ জন শিক্ষকের নিয়োগপত্রের স্বাক্ষরও আমার। অর্থাৎ আমার স্বাক্ষরিত যতসব চাকুরীজীবি, মাষ্টার্স এর জন্য নিয়োগকৃত শিক্ষক তথা প্রভাষকগণের নিয়োগপত্রেও স্বাক্ষর আমার।

আমার ছাত্র আমার কলেজে বর্তমানে অনেকেই চাকুরী করেন। প্রধান সহকারি আবদুর রহিম, হিসাবরক্ষক জিয়াউল হক, আইটি কর্মকর্তা পলাশ বড়ুয়া আমার ছাত্র। পলাশ আবার অনলাইন সংবাদ মাধ্যম সিএসবি২৪ ডটকম সম্পাদনার পাশাপাশি জাতীয় দৈনিক আমাদের সময়সহ বিভাগ এবং জেলার শহরের পত্রিকায়ও প্রতিনিধিত্ব করছে। আইসিটি প্রভাষক আমানত উল্লাহ আমার ছাত্র। আমানতও কোটবাজার ডিজিটাল ল্যাবের পরিচালক।

রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী আমার ছাত্র। বর্তমানে কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহীন আকতার চৌধুরী আমার ছাত্রী। তিনি এক্স এমপি’র সহধর্মীনি। হিসেব করলে এ ধরণের অনেককে পাওয়া যাবে।

১৯৯৪-৯৫ শিক্ষাবর্ষে ডিগ্রী শ্রেণির অধিভুক্তি অর্জন করার পূর্বে কলেজ পরিদর্শনে এসেছিল প্রফেসর আবদুল কাদের। উনি ভ্রমণ শেষ ঢাকা পৌঁছে আমার নামে ৪৫০০ টাকার চেক আমার নামে উখিয়া কলেজে পাঠিয়ে দেন। আমি কলেজ পরিদর্শক সাহেবকে চেকটি কেন পাঠিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি উত্তরে বললেন আমি যা ভ্রমণ বিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছি সবই পাঠিয়ে দিয়েছি। এই রকম সৎ ও আন্তরিক মানুষ আর পায়নি। অবসরে ছিলেন জানতাম। এখন বেঁচে আছেন কিনা জানিনা। আল্লাহ তাঁকে বেহেস্তনসীব করুক। উনি যেদিন কলেজে আসছিলেন সেদিন আমার বড় ছেলে এবং মেঝ ছেলে দুজনই খুবই অসুস্থ হয়ে কক্সবাজার সী-সাইড হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তিনি প্রফেসর আবদুল কাদের কলেজ পরিদর্শক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আমার ছেলেদের দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। পরে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করতে করতে বিমান চলে গিয়েছিল। যার কারণে হোটেল সায়মানে নাইটহোল্ড করেছিল।

কলেজ মিটিংয়ে উনি ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘উখিয়া কলেজ’ আরো আগে ডিগ্রী কলেজ হওয়া উচিত ছিল। পরিদর্শন শেষ করে গিয়ে বি,এ/বি,এস,এস/বি,বি,এ তিনটি গ্রুপের সবকটি বিষয় এক সাথে অধিভুক্তি দিয়ে দিলেন। পরবর্তী বছর ডিগ্রী পরীক্ষার সেন্টারও স্থাপন করলেন। খরচে সংকুলান করতে পারিনা বলে ডিগ্রী সেন্টার সারেন্ডার করেছি। বর্তমানে উখিয়া কলেজের ডিগ্রী ও অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার সেন্টার কক্সবাজার সরকারি কলেজে অনুষ্ঠিত হয়। কক্সবাজারে সেন্টার হওয়াতে ভালো হয়েছে।

উখিয়াতে সেন্টার থাকলে ১৩ পত্রিকার ৭১জন সাংবাদিকের গুতাগুতিতে বাঁচা দায় হয়ে যায়। আমরা যেন ডিগ্রী পরীক্ষার সেন্টার নিয়ে পৃথিবী জয় করে ফেলেছি। তাঁদের লিখার শেষ থাকে না। হলুদ সাংবাদিকের সংখ্যা একটু বেশি বৈকি। অথচ যারা সাংবাদিক হয়ে সাংবাদিকতার আই.ডি কার্ড নিয়েছেন তাদের সিংহভাগ উখিয়া কলেজ থেকে ইন্টার ও ডিগ্রী পাশ করা শিক্ষার্থী। তারা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে শুধু উখিয়া কলেজের দোষ গুলো কোথায় তা বের করতেন। এমনকি অধ্যক্ষের রুমে একটি টেলিভিশন ছিল, সেটার খবরও পত্রিকায় হেডলাইন করা হয়েছিল। যাঁরা সিনিয়র বা কলেজে পড়েনি তাঁরা অনেকটা বিচার-বিশ্লেষণ করে কলেজের খবর লিখতেন।
চলবে…