ঢাকা, শুক্রবার, ২০ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথা : পর্ব-৬

প্রকাশ: ২০২০-০৩-১৩ ২০:৩৬:১৭ || আপডেট: ২০২০-০৩-১৩ ২০:৩৭:৪৪

এম. ফজলুল করিম, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, উখিয়া কলেজ।

উখিয়া কলেজের জমি সংগ্রহ সংক্রান্ত :

মার্চ ১৯৯২ এর ১ম সপ্তাহের শেষ দিকে প্রস্তাবিত উখিয়া কলেজের (বর্তমানে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ) ফাইল নিয়ে ৩য় বারের মতো আমি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড গেলাম। যথারীতি কলেজ পরিদর্শক বরাবরে দাখিল করলাম। ফাইল দেখে জমির কাগজপত্র দেখে ফাইলটি হাতে এমন ভাবে ছুড়ে মারলেন রুমের কোণায় গিয়ে টেকেছে এবং আমাকে বললেন, উখিয়ার লোকদের এখনও কলেজ করার সময় হয়নি।

আমি বললাম থানা সদরের পার্শ্বে এটা ছাড়া জমি পাচ্ছি না। অধ্যক্ষ সাহেব কথা শুনেন- থানা সদর থেকে ৮ মাইল দূরে হলেও আমাদের কোন অসুবিধা নেই। জায়গাটা নিষ্কণ্টক হতে হবে। থানা সদর থেকে দূরে হলে আমাদের কোন অসুবিধা নেই।

হতাশাগ্রস্থ মনে কক্সবাজার পৌঁছে শাহাজান চৌধুরী, এম.পি মহোদয়কে বলেছিলাম। এম.পি মহোদয় জবাব দিলেন আমি এবং তুমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না তুমি অন্য কাজে লিপ্ত হয়ে যাও। চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলাম আরকি। সেদিন আমার সাথে বাবু অজিত দাশও ছিল, মোহাম্মদ আলী, ফরিদ ৪ জনেরই নিজস্ব জমি আছে। এককানি করে জমি বিক্রি করে ৪ জনে ৪ কানি বিক্রি করে উখিয়া থেকে কিছু জমি ক্রয় করে কলেজ শুরু করব। যেহেতু নিষ্কণ্টক জমি প্রয়োজন।

শাহজাহান চৌধুরী এম.পি পরিবার থেকে জমি চাইলাম, রাস্তার পার্শ্বে কোন জমি নেই। ইউনুছ চৌধুরী থেকে চাইলাম, তিনি বললেন, সে ব্যাপারে আমার মায়ের কথাই যথেষ্ট। নুরুল আলম সওদাগর এর কাছ থেকে চাইলাম তিনি বললেন পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের পার্শ্বে আমার মাত্র এক কানি জমি আছে মাত্র। বদিউর রহমান সিকদার (সোনারবাপ) থেকে জমি চাইলাম উনি উত্তরে বললেন- এক কড়া জমিও দেব না। অন্যখানে চেষ্টা করে দেখ। সরকারি ভাবে আমার অনেক জমি চলে গেছে।

আমরা বললাম জমি কিনে নেব। তিনি বললেন না বিক্রিত করব না, দানও করব না। শেষ পর্যন্ত আমরা চারজনের মধ্যেও পূর্বের মতো তৎপরতা নাই লক্ষ্য করছি।

মার্চ ১৯৯২ শীতকাল ছিল। সেই শীতে একদিন বাবু বিধুভূষণ বড়ুয়ার বাড়িতে গিয়ে জমির কথা বললাম। আমি বললাম দাদা, শৈলেরডেবাতে আপনার যে জমি গুলো আছে, সে গুলো কোন কাজে আসতেছে না, দরগাহ বিল ও টাইপালংবাসীর গরুর চড়ানোর কাড়ামুরা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র। আমরা একটি কলেজ করার চেষ্টা করছি।

শাহজাহান চৌধুরীর এম.পি সাহেবের নেতৃত্বে এক একর জমি দান করার ব্যবস্থা করেন না। উনি উত্তরে বললেন, শাহজাহান চৌধুরীকে দিতে বলো না। আমি বললাম মেইন রোডের পার্শ্বে শাহজাহান চৌধুরী’র কোন জমি নেই। ১ম দিন উক্ত কথা গুলি বললাম। পরের দিন আবার বিধু ভূষণ বড়ুয়ার বাড়িতে গেলাম। কাঠ (কদ্দা) দিয়ে আগুন পোহানোরত। এভাবে একদিন, দুদিন, তিনদিন, চার দিন, পাঁচ দিন প্রায় প্রতিদিন যেতে লাগলাম। তাদের (বিধু বাবুর বাড়ীতে শীতের সকালে যাওয়ার রুটিন হয়ে গেল।

৫ম দিন বাবু বিধু ভূষণ দাদা আমাকে হুংকার দিয়ে বললেন- অশ্লীল ভাষায় কিসের চেটের কলেজ করতেছো ফাঁকিবাজি করার আর জায়গা পাও না। ঠান্ডা মিয়া সাহেবও কলেজ করার কথা বলে অনেক টাকা চাঁদা উঠাইছে কয় এখনও তো কলেজ দেখতেছি না। নিরব হয়ে গেছে। তোমরাও ঐ রকম করবে আর কি। আমি বললাম সব মানুষ তো এরকম নয়, পরের দিন আবার গেলাম, তারপরের দিন আবার গেলাম। তারপরের দিন আবার যখন গেলাম শান্ত, মধুর স্বরে বললেন কলেজ করবে নাকি ? কলেজ যদি আমার জমির উপর কর তাহলে জমি কি পরিমাণ প্রয়োজন হয় ? আমি বললাম- ৩ (তিন) একর প্রয়োজন। তবে এক একর নিয়ে কাজ শুরু করতে চাই আর কি। একদিন হঠাৎ বিধু ভূষণ বড়ুয়া দাদা ১ (এক) একর জমি দেয়ার জন্য রাজি হলেন।

যখনই রাজি হলেন আমি বিধু ভূষণ দাদাকে বললাম আগামী কাজ সকাল ৮টায় কক্সবাজার যাব। দাদা জিজ্ঞেস করলেন কেন কক্সবাজার যাবেন ? বিষয়টি আপনার মুখ থেকে এম.পি শাহজাহান চৌধুরীকে বলতে হবে। আমি টিএন্ডটি অফিসে গিয়ে এম.পি শাহজাহান চৌধুরীকে টেলিফোনে বিধু ভুষণের কথা গুলি বিস্তারিত বললাম। পরের দিন সকাল ৮টায় আমার সিডিআই হোন্ডা করে দুজন কক্সবাজার পৌঁছে জিয়া গেষ্ট হাউসের নীচে হোটেলে সকালে নাস্তা করে কক্সবাজার সদর পোষ্ট অফিসের পিছনে এম.পি শাহজাহান চৌধুরীর বাসায় পৌঁছলাম। পৌঁছে দেখি যে, এডভোকেট সুনিল বড়ুয়াসহ আরও ৫/৬জন লোক নিয়ে এম.পি সাহেব আড্ডা দিচ্ছেন।

দাদা আর আমি পৌঁছার সাথে সাথে এম.পি সাহেব দরজায় এসে বললেন আমার বাবা এসেছেন নাকি ? ছেলের জন্য হয়ত: মন জ্বলেছে ? অভিবাদন শেষে জমির কথা উঠালাম, আমাকে যেভাবে জমি দান করার কথা বলেছিল, ঠিক সেভাবে এম.পি শাহজাহান চৌধুরী সাহেব খুশি হয়ে বললেন শাহজাহান চৌধুরী’র বীর বাবার মতো কাজ করছেন বাপ, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

বৈঠকে জমি কত তারিখ রেজি: করবে ? রেজিষ্ট্রির টাকা কে দিবেন ? ঐদিন মার্চ/১৯৯২ এর ২১ তারিখ রবিবার ছিল মনে হয়। মঙ্গলবার ২৩/০৩/১৯৯২ ইং তারিখ রেজিষ্ট্রি হবে। রেজিষ্ট্রি খরচের টাকা দিবেন এড. শাহজালাল চৌধুরী। শাহজালাল চৌধুরী সাহেব ৫ দিনের মধ্যে রেজি: খরচের টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে ৮ হাজার টাকা আমাকে দিলেন। মঙ্গলবার ১ একর জমি রেজি: হয়ে গেল। তখন মফস্বলের কলেজ জমির প্রয়োজন ছিল ৩ একর। ঘুরতে ঘুরতে দাদা বিধু ভূষণ বড়ুয়া পুরো ৩ একর ২০ শতক জমি রেজিষ্ট্রি করে দিলেন।

এপ্রিলে জমির দলিল নিয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে চলে গেলাম। শিক্ষাবোর্ড জমির দলিল পত্র দেখে সপ্তাহ খানিক সময়ের মধ্যে একাডেমিক স্বীকৃতি দিয়ে দিল। স্বীকৃতির পর আমার হাতে আসার পরের দিন ব্যানবেইস অফিসে দাখিল করার জন্য ফাইল রেডি করতে লাগলাম। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পূর্বে প্রেরিত আবেদনের ফাইল হাজার ফাইল থেকে খোঁজে ৫শ টাকার বিনিময়ে বাহির করলাম। স্বীকৃতির কাগজ সহ দিয়ে সাজিয়ে ফাইল পুনরায় দাখিল করলাম। দাখিলের ৩ মাসের মধ্যে খবর হলো যে নতুন করে ব্যানবেইস কাজ শুরু হবে শীঘ্রই। মনে বিরাট আশা নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ঘনঘন ঢাকা যাচ্ছি এবং মন্ত্রণালয়ে খবর নিচ্ছি।

১৯৯৩ এসএসসি পরীক্ষার পর ব্যানবেইস অফিসে গেলাম। সেখানে বড় অফিসারের সাথে পরিচয় হলাম। অনেক কথা হলো- কথা প্রসঙ্গে অফিসার বললেন, রূপচাঁদা শুটকি পাওয়া যায় কিন ? এই কথা বলাতে আমি বললাম কয় মণ রূপচাঁদা শুটকি প্রয়োজন ? একথা শুনে তিনি খুঁশি হলেন। পরের বার ঢাকা যাওয়ার সময় দুই কেজি রূপচাঁদা শুটকি, দুই কেজি ছুরি শুটকি আর দুই কেজি লইট্যা শুটকি নিয়ে সরাসরি অফিসারের বাসার খবর নিয়ে বাসায় পৌঁছলাম। আমার হাতে শুটকি সমূহ দেখে তাঁর স্ত্রীসহ তিনি নিজে খুব খুশি হয়েছেন। অফিসার বললেন ব্যানবেইসের কাজ দ্রুত হয়ে যাবে। ইনশাল্লাহ।

শুটকি নেওয়ার পরবর্তী বারে যখন ঢাকা গিয়ে খবর নিলাম অফিসার বলল ব্যানবেইস এর জন্য উখিয়ার কলেজের নাম তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। আমাকে অফিসে ডেকে নিয়ে তালিকাভুক্ত কলেজের নামসমুহ দেখালেন এবং খুব খুশি হলাম। তাঁকে সহ নিয়ে এ্যালিপেন্ট রোডে চায়নিজ খেলাম। বেশ অন্তরঙ্গ হয়ে গেলো।
চলবে…