ঢাকা, রোববার, ২২ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথা : পর্ব-৫

প্রকাশ: ২০২০-০৩-০৯ ১৭:৪২:০০ || আপডেট: ২০২০-০৩-০৯ ১৭:৪৪:৩২

এম. ফজলুল করিম, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, উখিয়া কলেজ ॥

ভালুকিয়াপালং নিবাসী এডভোকেট খোরশেদ আলম সিভিল লয়ার, জর্জকোর্ট, কক্সবাজার। তিনি আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। আমি সহ একসাথে বাসে করে কক্সবাজার কলেজে যেতাম। ইন্টারমেডিয়েট পড়ার সময় আমার একজন ভাল বন্ধু। তিনি ১৯৯১ইং সনের ১৬ ডিসেম্বর অথবা এর পরে বর্তমানে উখিয়া কলেজের অধ্যাপক ও রাষ্ট্র বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ আলী সাহেবকে আমার নিকট এনে তুলে দিয়েছিলেন। তবে শর্ত ছিল যে, কাজী শাহাব উদ্দিন যদি কোন কারণে উখিয়া কলেজে কাজ না করলে তখন মোহাম্মদ আলী সাহেবের সুযোগটা প্রশস্থ হবে।

৩১ জানুয়ারি ১৯৯২ইং তারিখ ইউএনও আহুত সভায় কাজী শাহাব উদ্দিন ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যস্ত থাকায় কলেজের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন না। এই কথা শোনার পর থেকে আমার মাথা থেকে টেনশনের বোঝাটি সরে গেল। কারণ উনি না আসলে আমি ও মোহাম্মদ আলী রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয়ে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলো। আল্লাহ হয়ত: মোহাম্মদ আলী সাহেবের আশা পূর্ণ করেছেন। ওই দিন আমাকে পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ, মোহাম্মদ আলী সাহেব প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ হল।

১৯৯১ইংরেজী থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত কলেজের সভাপতি ছিলেন শাহজাহান চৌধুরী, এম.পি। অত:পর এডহক কমিটির সভাপতি মনোনীত হলেন জাবি’র উপাচার্য মনোনীত অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, এম.পি। তিনি এবং আওয়ামী ঘরানার সিংহভাগ লোক আমি ফজলুল করিমকে অধ্যক্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য অনেক অপচেষ্টা করেছেন।

তবে এম.পি মোহাম্মদ আলী অত্যন্ত সৎ লোক ছিলেন বলে ষড়যন্ত্রকারীরা কিছু করতে পারেনি। মোহাম্মদ আলী এম.পি সাহেব আওয়ামী ঘরানার সবাইকে বলতেন বর্তমান অধ্যক্ষ ফজলুল করিম এর তো কোন দোষ খোঁজে পাচ্ছি না। কলেজ ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক কেহ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলতে শুনিনি। তাঁর দোষ হল শাহজাহান চৌধুরী সাহেবের সাথে রাজনীতি করেছিল। এছাড়া তাঁর আর কোন দোষ নেই। জামায়াত ও বিএনপির মতো বড় বড় দুটি তাঁকে সার্পোট করে।

এমপি মোহাম্মদ আলী ষড়যন্ত্রকারীদের বলেছেন, হয়ত: নারী কেলেঙ্কারী, নতুবা অর্থ আত্মসাৎ এই দুটির মধ্যে যে কোন একটির প্রমাণ দাও, পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেবো। কিন্তু দুটির মধ্যে থেকেও একটিরও প্রমাণ খোঁজে পায়নি।

পরে এমপি মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নুরূল ইসলাম চৌধুরী ও আমার আরেক শ্রদ্ধাভাজন লোক শমশের আলম চৌধুরী। “দুজনই আজ প্রয়াত। তাঁদেরকে আল্লাহ বেহস্তবাসী করুন।” তাঁরা তিনজন একযোগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আমাকে অধ্যক্ষ পদ থেকে সরাতে চেয়েছিল কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সৎ কলেজ পরিদর্শক তাঁদের থেকে প্রশ্ন করলেন ফজলুল করিম সাহেব এম.এ পাশ করেছেন কিনা ? উনি যখন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়েছিল তখন শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমে হয়েছিল কিনা ? উনাদের নিকট কলেজ পরিদর্শক প্রশ্ন করলেন- উখিয়া কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা কত ? স্টাফ, শিক্ষক কতজন করে কর্মরত আছেন ? পাকা বিল্ডিং এর পরিমাণ কত ? শুধুমাত্র শমশের আলম চৌধুরী সবুজ শ্রী বড়ুয়া’র নাম বলতে পারছিলেন।

কলেজ পরিদর্শক উনাদেরকে বললেন আপনারা তো গত ১ বৎসর পর্যন্ত কলেজের এডহক কমিটিতে আছেন। কলেজ সম্পর্কে তো কিছুই জানেন না। কিভাবে কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন ? আমি কলেজ পরিদর্শক, গাজীপুরে থাকি। উখিয়া কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষকের সংখ্যা, স্টাফের সংখ্যা, পাকা বিল্ডিং এর পরিমাণ, কার কি রকম যোগ্যতা সব জানি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ পরিদর্শক এম.পি মোহাম্মদ আলী সাহেবকে অনুরোধ করে বললেন, আপনি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী অন্তত: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক নিয়ে রাজনীতি করবেন না। এ বিষয়টি খুবই নোংরামি।

তাঁরা তিনজন কক্সবাজার পৌঁছে ডিসি পুলিন বিহারীর চেম্বারে মারামরি দেওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কারণ শমশের আলম চৌধুরী, এম.পি মোহাম্মদ আলী সাহেবকে বললেন- যেটা করতে পারবেন না, সে কাজে আমাদেরকে নিয়ে গেছেন কেন ? এম.পি জবাবে বললেন আপনারা আমাকে নিয়েছেন নাকি আমি আপনাদেরকে নিয়েছি ? এ বিষয়টি নিয়ে মারামারি দেওয়ার অবস্থা। ডিসি সাহেব না থাকলে হয়ত: তাই হতো।

কলেজ শুরুর দিন থেকে অর্থাৎ ১৯৯২ইং সনের ১ জানুয়ারি থেকে অজিত কুমার দাশ উখিয়া কলেজে গড়ার সহযোদ্ধা। জানুয়ারি ১৯৯২ মাঝামাঝি সময় আমি ফজলুল করিম ও অজিত কুমার দাশ কক্সবাজার শহরে উখিয়া কলেজ শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যানার টাঙ্গিয়েছিলাম। শুধু ব্যানার টাঙ্গানোর জন্য অজিত কুমার দাশের বড় ভাই দাশ ট্রেডিং এর মালিক আর্থিক ভাবে অনেকবার সাহায্য করেছেন। একবার ঢাকা একটি ঠিকানায় ফোন করে দিলে আমি সেখানে প্রয়োজনে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। অজিত দাশের বড় ভাই দাশ ট্রেডিং এর মালিক তিনিও আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।

আমার বন্ধু কপিল উদ্দিন। কোটবাজার আমার প্রিয় মকবুল স্যারের ছেলে। প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষার হল থেকে আমার বন্ধু হয়। এখনও বন্ধুত্ব আছে আমাদের। আমার জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। বিয়ে করার পরামর্শও কপিল দিয়েছিল। তাঁর বন্ধু হলো আব্বাস চেয়ারম্যানের বড় ভাই শাহাব উদ্দিন। কপিল উদ্দিন কলেজের জন্য শাহাব উদ্দিনের কাছ থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছিল। বিনিময়ে কিছু চায়নি। তখন ১০ হাজার টাকা দিলে দাতা সদস্য হওয়া যেত। কিন্তু নিজ থেকে বলেছেন আমি সদস্য হবো না। কারণ চৌধুরীর দল আমার দিকে চোখ তুলবে। সুতরাং দরকার নেই।

উখিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুবর্ণ বড়ুয়া স্যার উখিয়া কলেজে প্রায় ৩ বৎসর চক, ডাস্টার দিয়ে সাহায্য করেছেন। তিনি নিশ্চয় একটি মহৎ কাজে কলেজকে সহযোগিতা করেছেন। আমি তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করছি। বর্তমানে চাকুরি থেকে অবসরে আছেন। সৃজনশীল একজন মানুষ।

দরগাহ বিল নিবাসী বিশিষ্ট মুরুব্বি আলী চাঁন মেম্বার সাহেব উখিয়া কলেজের জন্য কমপক্ষে ৬/৭টি মামলা করেছেন। একটি চুরির মামলা ও করেছেন। আমি আর প্রয়াত: কলেজের ভূমি দাতা বিধু ভূষণ বড়ুয়া মিলে মসজিদ থেকে রড, আর সিমেন্ট এর বস্তা চুরি করেছি বলে ৪/৫টি সিভিল মামলা করেছেন। প্রথম মামলা করেছেন বিধু ভূষণ বড়ুয়া’র কোন ভুমি নেই। দ্বিতীয় মামলায় ভুমি আছে ঠিক কিন্তু বিধু ভুষণ ভাল ভুমি গুলো ব্যবহার করছেন।

১৯৯৪ সনে বিজ্ঞান ভবন ও প্রশাসনিক ভবন করার সময় অবৈধ স্থাপনা তৈরি অনধিকার প্রবেশ এর মামলা করে কাজ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। ভাগ্য ভাল বিজ্ঞ জর্জ সাহেব ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি আচার্য্য হয়ে উকিলদের উদ্দেশ্যে বললেন, উখিয়াতে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। বড় বড় ৭জন উকিল বিরোধীতা করছেন কেন ? আমার (অধ্যক্ষের) উকিল ছিল মাত্র একজন পিপি (সিভিল) ছৈয়দ আলম সাহেব, কক্সবাজার কস্তুরাঘাট উনার বাসা। বিরোধীতাকারী এডভোকেট পিযুষ, এড. বদিউর রহমান সহ আরো ৭ জন। জর্জ সাহেব তাদের বিরোধীতা বুঝতে পেরে হুকুম দিলেন- ভবন নির্মাণ করছে ফ্যাসিলিটিজ বিভাগ। তাদের বিবাদী করে নতুন করে মামলা শুরু করেন।

চলবে….