ঢাকা, বুধবার, ২৫ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথা : পর্ব-৪

প্রকাশ: ২০২০-০৩-০৮ ২১:২০:২৯ || আপডেট: ২০২০-০৩-০৯ ১৭:৪৫:১৪

 

এম. ফজলুল করিম, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, উখিয়া কলেজ ॥

কলেজ শুরুর ১ মাসের মাথায় ইউএনও কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী’র আহবানে শহীদ ইলিয়াছ মিয়া গণপাঠাগারে অস্থায়ী কলেজ এর একটি মিটিং আহবান করেছিলেন। উক্ত মিটিং-এ কাজী শাহাব উদ্দিন ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ততার কারণে কলেজে পাঠদানের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না বলে ঐ দিনের মিটিং ঘোষণা দিলে অর্থাৎ কলেজ শুরুর ১ মাস দায়িত্ব পালন করছিলেন মাত্র।

কলেজ শুরুর পূর্বে পরামর্শ গ্রহণ করার জন্য ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯০ কক্সবাজার কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আনম শামশুল আলম হুদার থানা রোডস্থ বাসায় গিয়েছিলাম। বাসায় প্রবেশের সাথে সাথে কদমবুচি করে দাড়িয়ে থাকলাম পরে উনি আমাকে বসতে বললেন। আমি উনাকে আমার পরিচয় দেয়াতে কান্না করে চোখের জল ফেললেন- বললেন বাবা, কোন কিছু শুরু করে সেটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়াটা খুবই কঠিন একটি কাজ। অনেক মানুষ বিভিন্ন সমালোচনা করবে। অনেক মানুষ টিটকারী মারবেন। অনেক লোক চরম বিরোধীতা করবে। সে গুলো সহ্য করতে পারবে তো ? সে গুলো সহ্য করে এগিয়ে যেতে পারলে ঠিকে থাকার সম্ভাবনা আছে বৈকি। আমি বললাম স্যার, আমি আপনার পুরাতন ছাত্র, আপনার অনেক বক্তব্য আমার জানা আছে।

গাড়ী নিয়ে একবার গন্ডগোল হয়েছিল, তখন আমি ১৯৭৮ইং সনে কক্সবাজার কলেজে ইন্টারে পড়ি। ড্রাইভার-হেলপারের সাথে ভীষণ মারামারি পুলিশ দিয়ে বাসটি রামু পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। কারণ সেদিন ছাত্ররা খুব বেশি মারমুখি ছিলেন, কলেজ গেইটে ছাত্র জমায়েতে আপনি কক্সবাজার কলেজের কোন শিক্ষার্থী মারামারিতে মার খেয়ে আসলে আমি সে ব্যাপারে কিছু করব না। যদি মার দিয়ে আসতে পার আমার যা করা দরকার তাই করব। শিক্ষার্থীর পক্ষে আপনার বক্তব্য শুনে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ সাহেব উনার বাসায় আমাকে বলেছিলেন উখিয়াতে কলেজ করার কাজে হাত দিয়েছ ভাল কথা। বিভিন্ন কারণে একটু পিছনে সরতে চাইলে কলেজ আর হবে না। কারণ বিষয়টি সেন্সিটিভ। যুবক বয়সে মানুষের আজেবাজে কথা শুনলে মন খারাপ করে পিছনে সরলে আর কাজ হবে না। যত বড় বাঁধা আসুক না কেন সব গুলিকে পাত্তা না দিয়ে সামনের দিকে এগুতে হবে। সততা, নিষ্টা, একাগ্রতা নিয়ে সামনের দিকে এগুতে হবে। অলসতা আসলে ব্যর্থ হয়ে পড়বে। যে শিক্ষক দল নিয়ে কলেজের কাজে ব্যস্ত থাকবে তাঁদেরকে সব সময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তাঁদের মধ্যে যদি বিরোধিতাকারীরা স্থান পায় তাহলে কলেজ করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। আমি আন্তরিক ভাবে দোয়া করি, আমার পরামর্শ গুলো মেনে চললে সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজনে আমার সাথে আরো যোগাযোগ করবে। যে কোন সমস্যা নিয়ে আমি সঠিক পরামর্শ দিতে পারব। সে দিনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শামশুল হুদার বক্তব্য ও পরামর্শ আমার জন্য অনেক লাভ হয়েছে।

অত:পর ১ জানুয়ারি ১৯৯২ থেকে পুরোদমে কলেজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। মোহাম্মদ আলী, অজিত দাশ, ফরিদুল আলম, সিরাজুল হক, আবদুল হক, আনোয়ার সাদাৎ। আমরা সবাই খুবই উদ্যমের কাজ চালিয়ে ছিলাম। মোহাম্মদ আলী সব সময় বলতেন উখিয়া ছাড়া অন্য কোথাও চাকুরী করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং উখিয়া কলেজ যদি হয় করতে পারব নতুবা চাকুরী করা সম্ভব নয়। মাষ্টার সাইফুল ইসলামের ছোট ভাই সেলিম ও কলেজের কাজে বিভিন্ন সহযোগিতা করেছেন। আমি তাকে আজকের দিনে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। সেলিম বর্তমানে এসিল্যান্ড অফিসে তহশীলদার।

আমি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে প্রস্তাবিত উখিয়া কলেজের ফাইল নিয়ে ২য় বার কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে গেলাম। কলেজ শাখার সেকশন অফিসার আমার দিকে থাকিয়ে থাকিয়ে শুধু হাসে কিন্তু তখনও আমি রহস্য বুঝতে পারিনি। কারণ আমি গেলে সরাসরি কলেজ পরিদর্শকের সাথে দেখা করি শুধু। কলেজ পরিদর্শক ছিলেন প্রফেসর খোদা রাখা, চেয়ারম্যান ছিলেন প্রফেসর আবদুল আজিজ দুজনই সিলেটের অধিবাসী। তাঁরা দুজনই আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।

যেহেতু ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ এর শেষ সপ্তাহে তাঁরা কক্সবাজারে কলেজ পরিদর্শনে আসলে পর্যটকদের ভীড় থাকায় কোথাও কোন রুম ম্যানেজ করতে পারছিল না। তখন সময়টা ছিল বিএনপির শাসন। পরে আমি এমপি শাহজাহান চৌধুরীর সহযোগিতায় এনডিসি সাহেবকে বলে তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। তখন চেয়ারম্যান যে কি পরিমাণ খুশি হয়েছে আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। চেয়ারম্যান অনেকটা আমার প্রতি ঋণী হয়ে গেছেন।

তাছাড়া বোর্ড চেয়ারম্যান ও কলেজ পরিদর্শন যখন উখিয়া কলেজ পরিদর্শনে আসেন খুবই খুশি হয়েছিলেন। কারণ সবুজের সমারোহে, বিস্তৃত ভুমি। ওই সময় চেয়ারম্যান মসজিদের উঠানে গাছের ছায়ায় আমার সাথে আলাদা হয়ে ৩০ মিনিট কথা বলেছেন- বিষয়টি সবাই দেখে বলতে লাগলেন ফজলুল করিম বোর্ড চেয়ারম্যান এবং কলেজ পরিদর্শকের খুবই প্রিয় মানুষ দেখছি।

যার ফলে সহজে মার্চ ১৯৯২ শেষ সপ্তাহে উখিয়া কলেজকে একাডেমিক স্বীকৃতি দিয়ে দিল। শহীদ ইলিয়াছ মিয়া গণপাঠাগার ও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনটি রুম নিয়ে ১৯৯৩ সনে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়েছিলাম। পরীক্ষার্থী ছিল ৫৭জন। উত্তীর্ণ হয়েছিল ৩১ জন। ২১ জন ২য় বিভাগ, বাকী গুলো ৩য় বিভাগ। ১ম বিভাগ ছিল না। ১ম ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের নিয়ে ১৯৯৩ সালের জুনের দিকে উখিয়া কলেজের নিজস্ব জায়গায় চলে আসি। টিএন্ডটি শৈলেরডেবায় কাঁচা ভবন, টিনের ছাউনি, বাঁশের বেড়া, ফ্লোর বালিতে ভরপুর। শুধুমাত্র অধ্যক্ষের অফিসটির নিচে ফ্লোর করা ছিল।
চলবে….