ঢাকা, বুধবার, ১৮ মে ২০২২

উখিয়া কলেজের ইতিকথা : পর্ব-৩

প্রকাশ: ২০২০-০৩-০৬ ২০:১৬:৩৭ || আপডেট: ২০২০-০৩-০৬ ২০:১৬:৪৮

যে কথা উখিয়ার প্রতিটি মানুষের জানা উচিত। 

এম. ফজলুল করিম, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, উখিয়া কলেজ



উখিয়া কলেজে যাঁরা অবৈতনিক শিক্ষকতা করতেন তাঁরা কেউ ফকিন্নির ছেলে ছিল না। যারা অট্টহাসি করে কথা বলতো সমাজে, দেশে তাদের অবস্থান কি তারাই ভালো জানে । আমাদের পাঠদানকারী শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই উখিয়া কলেজ আদৌ হবে না, এটা নিয়ে সন্দিহান ছিল।

উখিয়া কলেজের ১ম ব্যাচে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে করাতে প্রায় ৮৫জন ভর্তি করিয়েছিলাম কিন্তু ১ম ব্যাচে ফরম পূরণ করেছিল ৫৭ জন। বাকীরা লেখাপড়া থেকে ছিটকে পড়েছে অথবা সংসারী হয়ে যায়। কলেজে পাঠদান শুরু হওয়ার ৪/৫ মাসের মধ্যে জনাব আবদুল হক সাহেব আমাদের সাথে শিক্ষকতায় যুক্ত হলেন। তখন গেষ্ট শিক্ষকরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

ফেব্রুয়ারি/১৯৯২ সালের শেষের দিকে হঠাৎ খবর পেলাম কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং কলেজ পরিদর্শক কক্সবাজার সফরে আসছেন। তখনকার কলেজ পরিদর্শকের নাম ছিল প্রফেসর খোদারাখা, চেয়ারম্যানের নাম ছিল প্রফেসর আবদুল আজিজ। সিলেটের লোক। দুইজনই খুব ভাল ও অমায়িক লোক। তাঁরা যেদিন কক্সবাজার পৌঁছলেন সেদিন পুরো কক্সবাজার ট্যুারিষ্টে ভরপুর।

এনডিসি নাকি উনাদেরকে বলেছেন মন্ত্রী-সচিব নিয়ে বাঁচিনা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান আর কলেজ পরিদর্শক কি ? উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ছিল স্বস্ত্রীক সাথে ভার্সিটিতে পড়ুয়া ছেলে আর মেয়ে। আমি খবর পেয়ে সৌজন্যতা বশত: কক্সবাজার গেছি এবং অতিথিগণের খবর নিয়ে জানতে পারলাম হিলডাউন সার্কিট হাউজে উনারা আছেন। আমি রিক্সা নিয়ে ভীত ভীত মনে হিল ডাউন সার্কিট হাউজে পৌঁছে দেখি বোর্ড চেয়ারম্যান এর সাথে রামু কলেজের মোস্তাক সাহেব, কক্সবাজার মহিলা কলেজের আকতার সাহেব, হোয়ানক কলেজের সুধীর বাবু, তাঁরাও চেয়ারম্যান এবং কলেজ পরিদর্শককে ঘিরে বসে আছেন।

অবস্থাদৃষ্টে দেখলাম থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে সবাই ব্যর্থ হয়ে হতাশা নিয়ে বসে আছেন। আমি পৌঁছে কলেজ পরিদর্শক মহোদয়কে বিনম্র সুরে অনুরোধ করলাম সবার প্রচেষ্টা পর আমি ছোট্ট মানুষ হিসেবে একবার চেষ্টা করে দেখিনা কোন কিনারা পাওয়া যায় কিনা ? আমি টেলিফোনটা উঠিয়ে রিং করলাম শাহজাহান চৌধুরী এম.পি সাহেবকে সৌভাগ্য বশত: উনি ফোন রিসিভ করলেন- আমি চিটাগাং এর আঞ্চলিক ভাষায় বললাম কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কলেজ পরিদর্শক সাহেব এসেছেন এবং হিল ডাউন সার্কিট হাউজের বারান্দায় বসে রয়েছে। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়নি। এম.পি শাহজাহান সাহেব আমাকে বললেন তাড়াতাড়ি আমার বাসায় চলে আসুন।

ইন্টারন্যাশনাল স্কুল পশ্চিম পার্শ্বে আমি তাড়াতাড়ি বাসায় আসলাম- ততক্ষণে এনডিসি সাহেবকে এম.পি সাহেবের বাসায় আসতে বলেছেন- আমি বাসায় পৌঁছার পরপর এনডিসি সাহেব বাসায় প্রবেশ করলেন- এম.পি সাহেব এনডিসিকে সাথে সাথে বললেন হিলটপ সার্কিট হাউসে দুটি ডাবল রুমের ব্যবস্থা কর। এনডিসি সাহেব বললেন স্যার রুম তো নেই। এই কথা বলার সাথে সাথে এমপি সাহেব রেগে এনডিসিকে বললেন- এক ঘন্টার মধ্যে দুটি রুম ব্যবস্থা করে দাও। এনডিসি কিভাবে জানিনা এক ঘন্টার মধ্যে দুটি রুম ঠিকই ব্যবস্থা করে দিলেন। অবশ্য এম.পি সাহেব আরো বলেছিলেন আমার তো একটা রুম বরাদ্ধ আছে- আমার রুমটা কয় ? তাল-বেতাল করার কাহিনী করবে না। দুটি রুম ব্যবস্থা হলে চেয়ারম্যান স্বস্ত্রীক একটি রুম, ছেলে-মেয়ের জন্য আর একটি রুম দিল।

কলেজ পরিদর্শকের জন্য ওয়াপদা রেস্ট হাউজে একটি রুম ব্যবস্থা করলেন। রাত ১০টায় আমি হিলটপ রেষ্ট হাউসে গিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে দেখা করতে গেলে, তিনি কি পরিমাণ খুশি হয়েছেন, আমি ভাষায় বুঝাতে পারব না। চেয়ারম্যান নিজের থেকে আমাকে বললেন কাল সকাল ১০টায় কলেজে পৌঁছাব। ১০টায় কলেজে পৌঁছার কথা আমি এম.পি সাহেবকে বললাম। ঠিক আছে আমি সকাল ১০টার মধ্যে কলেজে আসব। পরের দিন কথা নাই, ঘোষণা নাই, কোটবাজারে ধর্মঘট গাড়ী চলতে দিচ্ছে না। তারপরও এম.পি শাহজাহান সাহেব এনডিসি গাড়ীটি নিয়ে এবং চেয়ারম্যানের নিজের গাড়ী নিয়ে উখিয়া যেতে চাইলে কোটবাজারে ধর্মঘট বাঁধাগ্রস্ত হল। তখন বুদ্ধিমান এমপি শাহজাহান সাহেব কোটবাজার পৌঁছে ধর্মঘট বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যে বললেন কথা নেই, ঘোষণা নেই, ধর্মঘট তো আমরা জানিনা। এখন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড থেকে চেয়ারম্যান, কলেজ পরিদর্শক আমার উখিয়া কলেজ পরিদর্শনে এসেছেন একটু সুযোগ করে দাও।

ধর্মঘটকারীরা সম্মান করে গাড়ী ছেড়ে দিল এবং কলেজে পৌঁছে মিটিং করলাম। মিটিং স্থলে পৌঁছার সাথে সাথে একদল বিপ্লবী একটি স্মারকলিপি নিয়ে চেয়ারম্যানের হাতে দিলেন উনিও সেটা হাতে নিলেন। মিটিং শেষ করে চলে যাওয়ার সময় কলেজে আসল ভুমি দেখার জন্য টিএন্ডটি শৈলেরডেবা আসলেন এবং আলাদা হয়ে চেয়ারম্যান সাহেব আমার (অধ্যক্ষ) সাথে আঁধা ঘন্টা কথা বলেছেন। শত শত লোক আমাদের দিকে থাকিয়ে আছে। অত:পর আমাকেসহ চেয়ারম্যান সাহেবের গাড়ীতে উঠিয়ে উখিয়া শহীদ ইলিয়াছ মিয়া গণপাঠাগার পৌঁছলাম। বিপ্লবীদের দেয়া স্মারক লিপিটি যাওয়ার প্রাক্কালে আমার হাতে দিয়ে ছিলেন এটা একটু এম.পি সাহেবকে দিবেন। ২ দিনের মধ্যে কুমিল্লা চলে যাওয়ার জন্য আমাকে বলে গেলেন দুই দিনের মধ্যে কুমিল্লা বোর্ডে পৌঁছি নাই বলে এম.পি শাহাজাহান চৌধুরীকে টেলিফোন করছে।

এম.পি সাহেব ঢাকা থেকে আমাকে বকা দিয়ে বললেন এতদিনেও কুমিল্লা যাওনি কেন ? মূলত: আমার হাতে টাকা ছিল না বলে যেতে দেরি হয়েছে। কুমিল্লা পৌঁছলে চেয়ারম্যান আমাকে ডেকে বললেন একামেডিক স্বীকৃতির ২০০০/- টাকা ড্রাফট জমা করেন। আর যাওয়ার সময় পাঠদানের অনুমতি পত্রটি নিয়ে যাবেন।


পরেরদিন পাঠদানের অনুমতি পত্র নিয়ে উখিয়া চলে আসলাম। ঐ পত্র দেখে উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক সাহেব বললেন কলেজ ৫০% হয়ে গেছে। বাকীটা একটার পর একটা করে হয়ে যাবে।

অত:পর এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচী ঘোষণা হলো। আমি রামু কলেজে কেন্দ্র করার জন্য বাবু অজিত দাশকে একটি চিঠি নিয়ে পাঠিয়েছিলাম কিন্তু মোস্তাক সাহেব বললেন আমার এখানে কেন্দ্রে করা সম্ভব হবে না। কক্সবাজার সরকারি কলেজের সবাই খুব খুশি অবশ্যই কক্সবাজার কলেজে কেন্দ্র করতে হবে।

রামু থেকে বিমুখ হয়ে বিভিন্ন অসুবিধার কথা জানিয়ে উখিয়া কলেজের কেন্দ্র উখিয়াতে স্থাপন করার একটি আবেদন নিয়ে ঢাকা গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী জমির উদ্দিন সরকারকে দিলাম। উনি চেয়ারম্যান কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডকে নির্দেশ দিলেন উখিয়া কলেজে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা করুন। বোর্ড চেয়ারম্যান সাহেব উখিয়া কলেজে কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য জেলা প্রশাসক ও ইউএনও সাহেবকে নির্দেশ দিলেন। উখিয়া কলেজ ৫৭জন পরীক্ষার্থী নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র হয়ে গেল।
চলবে………..