ঢাকা, রোববার, ২৪ অক্টোবর ২০২১

উখিয়ায় বহাল তবিয়তে নতুন-পুরাতন ইয়াবা গডফাদাররা

প্রকাশ: ২০২০-০৩-০৪ ২৩:৩৭:৪১ || আপডেট: ২০২১-০৮-১৯ ১৫:২৩:৪৩


গফুর মিয়া চৌধুরী:
কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা উখিয়ায় মাদক গডফাদাররা এখনো বহাল তবিয়তে। নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান না হওয়ায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে চিহ্নিত মাদক কারবারিরা। এদিকে প্রশাসনের তালিকায় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অসংখ্য মাদক কারবারিদের নাম থাকলেও কোন গডফাদারকে আটক করা হচ্ছে না। যার ফলে ঘুরে ফিরে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে তালিকাভুক্ত কারবারিরা।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়ায় কয়েক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছে উঠতি বয়সী যুবক। তাদের মধ্যে অনেকে সময়ে-অসময়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে লোক দেখানো আটক হলেও নিয়ন্ত্রণটা ঠিকই তাদের হাতে।


গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকায় রয়েছে পালংখালী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জয়নাল আবেদীন, ইউপি সদস্য নুরুল আমিন, ইউপি সদস্য নুরুল হক। পালংখালী স্টেশন সংলগ্ন ৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শীর্ষ ইয়াবা কারবারি রাশেল পুলিশের জালে আটক হলেও তার বড় ভাই সাহাব উদ্দিন এখনো মাদক পাচার করে যাচ্ছে বলে এলাকাবাসীরা জানান। এছাড়াও পালংখালী আঞ্জুমানপাড়ার সিকান্দর আলীর ছেলে আবদুল গণি, আবদুল মুহিদের ছেলে এয়াকুব মার্শাল, আবদুল মান্নানের ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহানের নাম উঠে এসেছে। বালুখালী পানবাজার স্টেশনের পূর্ব বালুখালী গ্রামের ইউপি সদস্য জামিনে মুক্তি পেয়ে শহরে অবস্থান করে আবারও পুরোদমে ইয়াবা কারবার করছে বলে এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন।


রাজাপালং ইউনিয়নের চিহ্নিত ইয়াবাকারীদের মধ্যে খালকাছাপাড়ার কবির আহমদ, হিজলিয়া গ্রামের মৃত আবু বক্কর ছিদ্দিকির ছেলে জয়নাল আবেদীন, বাবুল। অপরদিকে লম্বাঘোনার মৃত ফকির আহমদের ছেলে মাহমুদুল করিম খোকা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও তার ইয়াবা সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে বড় ভাই সাহাব উদ্দিন। এছাড়াও একই এলাকার ফরিদ মিস্ত্রির ছেলে মো: রুমু, মৃত জাগির হোছনের ছেলে আবদু রকিম, দরগাহ বিল এলাকার আলী হোছনের ছেলে বেলাল আহমদ প্রকাশ কানা বেলাল, তার সহযোগি মৃত মিয়া হোছনের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, পূর্ব দরগাহ বিল গ্রামের আবদুল মাজেদের ছেলে লম্বা মির আহমদ পার্শ্ববর্তী টাইপালং এলাকার মৃত আলী আহমদ মাষ্টারের ছেলে আনোয়ার।


কুতুপালং এলাকার মৃত মীর কাশেমের ছেলে রশিদ আহমদ, রশিদ আহমদের ছেলে আলমগীর, শামশুল আলমের ছেলে বুজুরুছ মিয়া, মৃত কাদির হোছনের ছেলে রহমত উল্লাহ প্রকাশ কালু।


একই ইউনিয়নের হাজির পাড়ার এলাকার বারবার গ্রেপ্তারকৃত আলী আহমদের ছেলে আতাউল্লাহ, ওই এলাকার মীর আহমদ। ৫/৬ মাস পূর্বে টাইপালং গ্রামের শামশুল হক সিকদারের ছেলে নজরুল সিকদার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার কিছুদিন পর্যন্ত চিহ্নিত গডফাদাররা গা ঢাকা দিলেও এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।


ডিগলিয়াপালং গ্রামের মৃত আবু ছিদ্দিকের ছেলে সদ্য গ্রেপ্তারকৃত হানিফ সিদ্দিক ও তার বড় ভাই ছৈয়দ আকবর তার সন্তানদের সহযোগিতায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। একই এলাকার মৃত সুলতান আহমদের ছেলে মকবুল পুতিয়াও দাপর্টের সাথে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।


পূর্ব ডিগলিয়ার নুর আহমদের ছেলে জয়নাল উদ্দিন, মৃত উলা মিয়ার ছেলে মো: ছৈয়দ প্রকাশ মরা ছৈয়দ, শামশুল আলমের ছেলে ছৈয়দ আকবর প্রকাশ লোডা আকবর, রশিদ আহমদের ছেলে আবু বক্কর।


ডেইলপাড়া এলাকার ছব্বির আহমদের ছেলে জসিম উদ্দিন, আজিজুর রহমানের ছেলে শামশুল আলম, মৃত মৌলভী বাঁচা মিয়ার ছেলে রফিক উদ্দিন রফু, মৌলভীর ছানা উল্লাহর ছেলে একরাম, হোছন মেম্বারের ছেলে আনোয়ার ইসলাম, মৃত সুলতানের ছেলে শামশুল আলম।


রত্নাপালং ইউনিয়নের খন্দকারপাড়া এলাকার জাফর আলম কালু ড্রাইভারের ছেলে শাহজাহান, তারেক আজিজ, খন্দকারপাড়ার জালাল আহমদের ছেলে সরওয়ার কামাল সিকি, আবছার কামাল, আলী হোছনের ছেলে শাহ আলম ও আলমগীর। রত্নাপালং টেকপাড়ার গিয়াস উদ্দিনের ছেলে মোর্শেদ চৌধুরী, মফিজ ড্রাইভারের ছেলে মানিক, দক্ষিণ রত্নাপালং তেলীপাড়া এলাকার জবর মুল্লুকের ছেলে নাজু মিয়া, বেলাল উদ্দিনের ছেলে ফোরকান, নজরুল ইসলামের ছেলে এহেছান, বাঁচা মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর, ছগির আহমদের ছেলে ভুলু, আবুলু’র ছেলে আবুল মনজুর, আলী মিস্ত্রীর ছেলে গিয়াস উদ্দিন, বশরত আলীর ছেলে মো: কামাল।


হলদিয়াপালং ইউয়িনের রুমঁখা চৌধুরীপাড়া এলাকার মো: ইউনুছ ড্রাইভার, পাগলিরবিল এলাকা নুর আলমের ছেলে ওবাইদুল হক, দক্ষিণ ক্লাশপাড়ার সুবধন বড়ুয়ার ছেলে বিধু বড়ুয়া ও খোকন বড়ুয়ার ছেলে রুবেল বড়ুয়া।


এদিকে সরকারের মাদক বিরোধী ঘোষিত অভিযান অব্যাহত থাকলেও সংশ্লিষ্ট আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হচ্ছে না পুরাতন ও নব্য ইয়াবা কারবারীরা। তারা বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে মাদক বাণিজ্য নির্বিগ্নে চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৫ বছরে মাদকের তালিকায় ঘুরে ফিরে যাদের নাম রয়েছে তাদের শতকরা ৯০ ভাগ এলাকায় থেকে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। অপরদিকে নব্য মাদককারবারীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং জনপ্রতিনিধিদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে দেদারছে মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু মাদক কারবারি দিনে প্রকাশ্যে বাজারে ঘুরাফেরা না করলেও রাতে তাদের অবাধ বিচরণ দেখা যায়।


প্রতি বছর মাদক কারবারিদের নাম ঠিকানা হালনাগাদ হলেও অদৃশ্য কারণে ঘুরে ফিরে বাদ যাচ্ছে গডফাদারদের নাম। তারা ভদ্রতার মুখোশ পরে ও কিছু কিছু ব্যবসার সাইনবোর্ডকে সামনে দিয়ে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে। এসব নব্য কোটিপতিদের অঢেল সহায় সম্পদের আয়ের উৎস খোঁজে বের করা দুদকের দায়িত্ব বর্তায় বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।


সূত্রেমতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত টেকনাফের শীর্ষ দুয়েকজন ইয়াবা কারবারি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার পূর্বে তাদের অবৈধ কারবারের সমস্ত টাকা জনৈক উখিয়ার এক ব্যবসায়ীর হাতে রক্ষিত আছে। ওই টাকায় বর্তমানে সে উখিয়ার শীর্ষ ব্যবসায়ীর স্থান দখল করে নিয়েছে। তার সাথে রয়েছে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও কতিপয় সরকার দলের প্রভাবশালীদের নিয়মিত যোগাযোগ।


স্যোসাল মিডিয়ায় মাদক বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব মো: ইউনুছ চৌধুরী বলেন “উখিয়ায় যারা আলিসান বাড়ি, গাড়ী করে বিলাসী জীবন যাপন করছে, কিংবা অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক বনে গেছে তাদের হিসাব যাচাই করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।”


এ প্রসঙ্গে উখিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের সীমান্ত পয়েন্ট গুলো দিয়ে প্রতিনিয়ত ইয়াবা চালান আসছে। সীমান্তরক্ষী বিজিবি, কোষ্ট গার্ড, নৌবাহিনী সদস্যরা এসব ইয়াবা আটক করছে। সেখানে বেশির ভাগ রোহিঙ্গারা রয়েছে। এসব সীমান্ত পয়েন্ট ইয়াবা পাচার বন্ধ করতে হলে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে।


এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, উখিয়া থানায় নবাগত অফিসার ইনচার্জ মর্জিনা আক্তার বলেন, সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছি। তিনি বলেন, আইজিপি’র নির্দেশনা দিয়েছেন কোন মাদক কারবারিরা পুলিশের হাতে থেকে রেহাই পাবে না। মাদক নির্মুলে কঠোর ভাবে কাজ করে যাচ্ছি এবং মাদকের সাথে কোন ধরণের আপোষ নয়। আমি নতুন এসেছি মাদক কারবারিদের তালিকা দেখছি। নতুন করে তালিকাও করছি। কারা কারা মাদকের সাথে জড়িত ও মাদকের গডফাদার এলাকাসমূহ চিহ্নিত করে তাদের আইনের আওতায় আনার সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। পরিশেষে গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।