ঢাকা, শুক্রবার, ১ জুলাই ২০২২

কক্সবাজারে এবারই প্রথম চারটি আসনে আ’লীগের জয়

প্রকাশ: ২০১৮-১২-৩১ ১২:১২:৫০ || আপডেট: ২০১৮-১২-৩১ ১২:১২:৫০

সিএসবি ২৪ ডটকম:
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু পরবর্তী ১৯৭৩ সনের নির্বাচনে কক্সবাজারে আওয়ামীলীগের তিন প্রার্থী একসাথে জয় পেয়েছিলেন। সেই সময়ের পর ৪৫ বছরের মাথায় এবারই প্রথম একসাথে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে নৌকা প্রতীক জয় পেয়েছে। এ জয়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ৪৮তম বছরে কক্সবাজারে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে আওয়ামীলীগ।
১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজারে জাফর আলম, আশেক উল্লাহ রফিক, সাইমুম সরোয়ার কমল ও শাহীন আক্তার চৌধুরী নৌকা প্রতিক নিয়ে বেসরকারি ভাবে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন। ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ শেষে গণনার পর বেসরকারি ভাবে তাদের জয়ী হবার এ রায় ঘোষণা দিয়েছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে, কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) সংসদীয় আসনে মহাজোট মনোনীত আওয়ামীলীগের প্রার্থী জাফর আলম ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি ঐক্যফ্রন্ট মনোনীয় বিএনপি প্রার্থী হাসিনা আহমদ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৬০১ ভোট।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে মহাজোটের আশেক উল্লাহ রফিক নৌকা প্রতীকে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯১ ভোট পেয়ে পুন:রায় সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি জামায়াতের হামিদ আযাদ আপেল প্রতীকে পেয়েছেন ১৮ হাজার ৫৮৭ ভোট। কিন্তু তিনি ভোটের দিন দুপুরে ভোট বর্জনের ঘোষণায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সাংসদ ও আশেক উল্লাহ রফিকের চাচা আলমগীর ফরিদ ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১১ হাজার ৭৮৯  ভোট।
কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনে মহাজোটের প্রার্থী সাইমুম সরোয়ার কমল নৌকা প্রতীকে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৮২৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপির সাবেক সাংসদ লুৎফুর রহমান কাজল পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৭১৮ ভোট।
আর কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে মহাজোট প্রার্থী শাহিন আকতার চৌধুরী নৌকা প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭৪ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্ধি বিএনপির সাবেক সাংসদ শাহজাহান চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৩৭ হাজার ১৮ ভোট।
নির্বাচনী ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালে আওয়ামীলীগের পূর্ণ যৌবনের সময়ে চকরিয়া-কুতুবদিয়া, রামু-উখিয়া-টেকনাফ ও মহেশখালী-কক্সবাজারসহ সবকটি আসনে প্রথম জয় পেয়েছিল আওয়ামীলীগ প্রার্থীরা।
এরপর ১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে হত্যার শিকার হবার পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলের প্রথম নির্বাচনে (১৯৭৯) চকরিয়া-কুতুবদিয়ায় মাহমুদুল করিম চৌধুরী, রামু-উখিয়া-টেকনাফ আসনে শাহজাহান চৌধুরী, মহেশখালী-কক্সবাজার আসনে রশিদ মিয়া সাংসদ নির্বাচিত হন।
১৯৮৬ সনে এইচ এম এরশাদ শাসনামলে চকরিয়া-কুতুবদিয়ায় এএইচ সালাহউদ্দিন মাহমুদ, রামু-উখিয়া-টেকনাফ আসনে গফুর মিয়া চৌধুরী, মহেশখালী-কক্সবাজার আসনে দিদার মিয়া জয় পান।
১৯৮৮ সালের ৪র্থ সংসদ নির্বাচনে চকরিয়া-কুতুবদিয়া আসনে আবারো এএইচ সালাহউদ্দিন মাহমুদ, রামু-উখিয়া-টেকনাফ আসনে আবদুল গণি চেয়ারম্যান এবং মহেশখালী-কক্সবাজার আসনে দিদার মিয়া নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে কক্সবাজার জেলায় প্রথম চারটি আসন গঠনের পর ৫ম সংসদ নির্বাচনে চকরিয়া-পেকুয়া আসনে জামায়াতের এনামুল হক মঞ্জু, মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনে আলমগীর ফরিদ, উখিয়া-টেকনাফে শাহজাহান চৌধুরী ও কক্সবাজার সদর-রামু আসনে মোস্তাক আহমদ চৌধুরী জয়ী হন। সরকার গঠন করে বিএনপি।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির বিতর্কিত নির্বাচনে (৬ষ্ঠ সংসদ) চকরিয়া-পেকুয়ায় বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ, মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী, কক্সবাজার-রামু আসনে অ্যাডভোকেট খালেকুজ্জামান, উখিয়া-টেকনাফে শাহজাহান চৌধুরী নির্বাচিত হন। কিন্তু আন্দোলনের মুখে বিএনপি সংসদ ভেঙ্গে বাধ্য হয়।
পুন:রায় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় ৭ম সংসদ নির্বাচন। এতে চকরিয়া-পেকুয়ায় বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ, মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় আলমগীর ফরিদ, কক্সবাজার-সদর আসনে অ্যাডভোকেট খালেকুজ্জামান ও উখিয়া-টেকনাফে আওয়ামীলীগের মোহাম্মদ আলী সাংসদ নির্বাচিত হন এবং সরকার গঠন করে আওয়ামীলীগ।
আর ২০০১ সালের ৮ম নির্বাচনে চকরিয়া-পেকুয়ায় পুন:রায় বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ, মহেশখালী-কুতুবদিয়া আলমগীর ফরিদ, উখিয়া-টেকনাফে শাহজাহান চৌধুরী ও কক্সবাজার সদর-রামু আসনে জয় পান বিএনপির শহিদুজ্জামান এবং সরকার গঠন করে বিএনপি।
২০০৮ সালের নবম নির্বাচনে চকরিয়া-পেকুয়া আসনে বিএনপির হাসিনা আহমদ, মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় জামায়াতের হামিদুর রহমান আযাদ, কক্সবাজার সদর-রামু আসনে লুৎফুর রহমান কাজল এবং উখিয়া-টেকনাফে আবদুর রহমান বদি নির্বাচিত হয় আর সরকার গঠন করে আওয়ামীলীগ।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম নির্বাচনে চকরিয়া-পেকুয়া আসনে হাজি মো. ইলিয়াছ, মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজার সদর-রামু আসনে সাইমুম সরোয়ার কমল ও উখিয়া-টেকনাফ আসনে পুন:রায় নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বদি আর দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট।
বঙ্গবন্ধু পরবর্তী দীর্ঘ এ সময়ের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ পৃথক ভাবে চারবার ক্ষমতায় থাকলেও কক্সবাজারের চারটি আসন কখনো একসাথে পাওয়া হয়নি।
কিন্তু সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে কক্সবাজার-১ আসনে জাফর আলম, কক্সবাজার-২ আসনে আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজার-৩ আসনে সাইমুম সরোয়ার কমল ও কক্সবাজার-৪ আসনে শাহিন আকতার চৌধুরী এমপি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী আওয়ামীলীগে ইতিহাস করেছেন।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম বলেন, বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সময়ে কক্সবাজারের আসনগুলোতে নৌকার প্রার্থীরা একসাথে জয়ী হওয়ার নজির নেই। তেমনি অন্যদলগুলোও সেই কৃতিত্ব ধরে রাখতে পারেনি। তবে ঘুরে ফিরে বিএনপি জামায়াত কিংবা জাতীয় পার্টির প্রার্থীর পাশাপাশি কোন না কোন আসনে আওয়ামীলীগও একটি আসন পেয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সরকারি বা বিরোধী দলের প্রার্থী বিজয়ী হওয়াকে কেন্দ্র করে অনেক আসনে উন্নয়নে চরম বৈষম্য হয়েছে। কিন্তু ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর কক্সবাজারের উন্নয়নে মনোনিবেশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কক্সবাজারের প্রায় প্রতিটি সংসদীয় আসনে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। সদ্য নির্বাচনে চারটি আসনেই আওয়ামীলীগ প্রার্থী নির্বাচিত হওয়া মেগাপ্রকল্পসহ চলমান তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ গুলো দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছর সব আসনে সমান্তরাল উন্নয়ন চলবে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক প্রাদেশিক পরিষদের গভর্ণর, বাংলাদেশের  সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম বলেন, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামীলীগ কখনোই হারে না। স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন আওয়ামীলীগের নেতৃত্ব সফলতা দেখিয়েছে তেমনি দেশের উন্নয়ন তরান্বিত করতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের  আওয়ামীলীগই মূল ভূমিকা রাখবে। বর্তমান সময় সেটাই কামনা করে।