ঢাকা, শনিবার, ২ জুলাই ২০২২

সড়কপথে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল:বন্ধ হবে কবে?

প্রকাশ: ২০১৮-১২-৩০ ১৯:২৮:৩০ || আপডেট: ২০১৮-১২-৩১ ১২:০৫:০১

অনলাইন ডেক্স:

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নয়, চলছে হত্যাকাণ্ড । প্রতিদিন ঝরছে তাজা প্রাণ। পঙ্গু হচ্ছে হাজার হাজার লোক। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে পথে বসছে পরিবার। ক্ষতি হচ্ছে দেশের অর্থনীতির। চরম এ অব্যবস্থায় আমাদের অবস্থা অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
সড়ক ও যান ব্যবস্থাপনার এ অচলাবস্থা দূর না করতে পারলে সময়ের এ দায় কাদের বহন করতে হবে, ইতিহাস তা বলে দেবে। বাংলাদেশের সড়কপথে প্রতিদিনের সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ। কেউ কেউ বেঁচে গেলেও বাকি জীবন কাটায় অসহায় পঙ্গু হয়ে। পরিবারের বা সমাজের বোঝা হয়েই বাঁচতে হয় তাদের। অনেকের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মারা যায়। পরিবারের একজন যখন অচল হয়ে যায়, তখন পুরো পরিবারই সমস্যার সাগরের হাবুডুবু খায়। স্কুলের ব্যাগ রেখে ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিতে হয় শিশু সন্তানদের।

বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকায় সড়কে যানবাহন চালাচ্ছে লাইসেন্সবিহীন চালকেরা। অবৈধ পন্থায় লাখ লাখ চালক সড়কপথে। পুলিশকে মাসিক চাঁদা দিয়ে ঘাতকেরা কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। প্রশাসন কখনো কার্যকর প্রতিকারের জন্য এগিয়ে আসেনি। সমস্যার গভীরে যায়নি। স্বজন হারানোর আর্তনাদে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস ভারী হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সরকারের কোনো পদক্ষেপ নজরে আসছে না। অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনা জনমনে সরকারের প্রতি ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। স্বজন হারা পরিবার দিশেহারা। বাবা ও মা হারাচ্ছে সন্তান। স্ত্রী হারাচ্ছে স্বামী। সন্তান হারাচ্ছে বাবা-মা । এলাকা হারাচ্ছে অভিভাবক। জাতি হারাচ্ছে প্রতিভা। প্রবাসীরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে গভীর উৎসাহে আনন্দে দেশের মাটিতে পৌঁছাতে পারলেও বাড়িতে পৌঁছাতে পারে না। সড়কেই অনেকের প্রাণপাত ঘটছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে গেছে কয়েকজন প্রবাসীর প্রাণ। প্রবাসীরাও উদ্বিগ্ন। দেশে যেতে ভয় পান। চোর ডাকাত নয়, প্রধান ভয় এখন বাংলাদেশের সড়ক পথ ।
প্রবাসীরা গুরুত্ব সহকারে সড়ক ও সড়কের উন্নয়নে সরকারের সুনজর দাবি করে আসছেন। বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ করার না কারণেও ঘটছে অনেক দুর্ঘটনা। প্রশাসন ও পুলিশের সঠিক ভূমিকা না থাকায় নির্মমতার শিকার হচ্ছেন অনেকে।

চালকদের অধিকাংশ বিনা লাইসেন্সে যানবাহন চালাচ্ছে। পুলিশের তহবিলে মাসিকভাবে চাঁদা পরিশোধ করে অযোগ্য, অদক্ষ চালকেরা যানবাহন চালাচ্ছে। মাসিক চাঁদার পরিমাণ চালকের গাড়ির ওপর থেকে আদায় করা হচ্ছে। সিএনজি অটোরিকশা থেকে মিনি বাস, ট্রাক কোনো কিছুই এ চাঁদার বাইরে নয়। মাসিক দু শ’ থেকে পাঁচ শ’ করে প্রতি মাসে আদায় করা হচ্ছে।
দেশের কয়েকজন চালকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এ খাতে পুলিশের নানা অপকর্মের কাহিনি। রাতারাতি রিকশা চালককে সিএনজি চালক বানানো হচ্ছে। সিএনজি চালককে মিনিবাস, মিনিবাস চালককে ট্রাক চালাতে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ এদের সহযোগিতা করে। বিশাল অঙ্কের টাকা অবৈধভাবে আদায় হয় অবৈধ চালকদের কাছ থেকে। এ টাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তহবিলে জমা হয়ে ভাগাভাগি হয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে পুলিশের ভ্রাম্যমাণ দলকে যানবাহন তল্লাশির অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়। এসব লোক দেখানো। তল্লাশির আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়। লাইসেন্সধারী ছাড়া তল্লাশির দিনে কেউ বের হয় না। এ এক সত্যের নির্মমতা। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আলাদা দল নিয়মিত তল্লাশি করলে প্রতি জেলায় হাজার হাজার লাইসেন্সবিহীন অবৈধ চালককে শনাক্ত করা সম্ভব। এটুকু করলেও অনেক যানবাহন দুর্ঘটনার কবল থেকে রেহাই পাবে।

দুর্ঘটনা হতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশে যে হারে ও যেভাবে হচ্ছে তা মেনে নেওয়া যায় না। সন্তানহারা পিতা-মাতা আর স্বামীহারা বিধবাদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হচ্ছে। প্রতিবাদ শোনার যেন কেউ নেই। জবাবদিহির যেন কেউ নেই। প্রশাসন নীরব। প্রতিদিন মানুষ মারা পড়ছে। নাম মাত্র একটি মামলা রুজু করে সমাপ্তি। কোনো প্রতিকার নেই। আইনের অকার্যকারিতায় চালকের বা মালিকের কোনো সাজা বা জরিমানা নেই। উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়েই সাধারণ মানুষের যানবাহনের চলাফেরা। আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই।

চালক, মালিক উভয়কে আইনের আওতায় নিতে হবে। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের আওতায় আনা হলেই তাদের টনক নড়বে। সড়কের নির্মাণ থেকেই জনচলাচলের এ ব্যবস্থার দিকে প্রশাসনের নজর রাখা উচিত। অনেকাংশে দেখা যায়, নির্মাণের অল্পদিনের মধ্যে সড়কের ধসে পরা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম, অসাধু সরকারি প্রকৌশলীদের কারসাজি—এসবই আমাদের জানা। শহরের বাইরে যে সব হাইওয়ে রয়েছে, সেগুলোকে দুই লেনে রূপান্তরিত করা জরুরি। সড়কের পাশে কংক্রিট ওয়াল স্থাপনসহ অন্যান্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে হবে। দেখা গেছে, বাসভর্তি যাত্রী নিয়ে খাদে পড়ে বহুলোকের প্রাণহানি ঘটছে। সড়কের পাশে ছোট্ট দেয়াল বা প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে অন্য বহু দেশের সড়ক পথের মতো। সদিচ্ছা হলে সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে অকালে ঝরে যাওয়া অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। আধুনিক বিশ্ব বাস্তবতায় সড়ক নির্মাণের সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে সড়কগুলো ভেঙে যায়। গাড়ি চালানোর অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। মানুষ বাঁচানোর এ কাজ আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র আর কত দিন অবজ্ঞা করে যাবে?