ঢাকা, রোববার, ৩ জুলাই ২০২২

নির্বাচন হবেই, ঠেকানোর শক্তি কারো নেই : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২০১৮-০৯-০২ ২৩:৩২:৪৫ || আপডেট: ২০১৮-০৯-০২ ২৩:৩২:৪৫

নির্বাচন হবেই, ঠেকানোর শক্তি কারো নেই : প্রধানমন্ত্রী

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকানোর শক্তি কারো নেই মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ রোববার বিকেলে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন তিনি।

নির্বাচনের আগে দুর্নীতির দায়ে দাণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য বিএনপির দাবির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়াকে আমি গ্রেপ্তার করিনি, রাজনৈতিকভাবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সে গ্রেপ্তার হয়েছে এতিমের টাকা চুরি করে। তারা আন্দোলন করুক। ডাক দিচ্ছে, হুঙ্কার দিচ্ছে-খুব ভালো কথা। আবার বলছে, নির্বাচন করবে না। কে নির্বাচন করবে-না করবে, সেটা সেই দলের সিদ্ধান্ত। এখানে আমাদের কী করার আছে?

শেখ হাসিনা বলেন, তাদের দল যদি মনে করে (নির্বাচন) করবে না, করবে না। যদি মনে করে করবে, করবে। এটা বিএনপির সিদ্ধান্ত, তারা কী করবে, না করবে। এখানে তো আমাদের বাধা দেওয়ার কিছু নেই বা দাওয়াত দেওয়ারও কিছু নেই।

২০১৪ সালে খালেদা জিয়ার ছেলের মৃত্যুর পর সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তার সঙ্গে আর কখনো কোনো আলোচনায় বসবেন না বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ছেলে মারা যাওয়ার পর আমি গেলাম, আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে আমাকে ঢুকতে দিল না। সেদিন থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর তো ওদের সঙ্গে আমি অন্তত বসব না। আর কোনো আলোচনা হবে না। প্রশ্নই ওঠে না। আপনারা যে যাই বলেন। ক্ষমতায় থাকি, না থাকি, আমার কিচ্ছু আসে যায় না।

সরকার প্রধান বলেন, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারল, তখনই তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল। তখন তো গ্রেপ্তার করিনি। সহনশীলতা দেখিয়েছি। খালেদা জিয়ার মামলাটি আমরা দিইনি। আমাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তারা যেটা চাচ্ছে; খালেদা জিয়ার মুক্তি। তাদের তো আদালতের মাধ্যমে আনতে হবে। আর যদি দ্রুত চায় তাহলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবে।

দেশে নির্বাচন হবে কী না-গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের এমন সংশয়ের বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন হবে, এটা ঠেকানোর মতো শক্তি কারও নেই। বিগত জাতীয় নির্বাচন ঠেকানোর জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের নামে জ্বালাও-পোড়াও হলেও জনগণ তা প্রতিহত করেছে এবং এবারও তেমন কিছু হলে জনগণ মোকাবিলা করবে। দেশের কিছু মানুষ আছে কিছু হলেই উত্তর পাড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমাকে মারার জন্য তো অনেকবার চেষ্টা করেছে। যে দেশে বঙ্গবন্ধুকে পর্যন্ত খুন করা হয়েছে সে দেশে অনেক কিছুই হতে পারে। আমাকে মারার চেষ্টা হলেও হয়তো হতে পারে।

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ এটা চর্চার ব্যাপার। আমাদের পরীক্ষামূলক করে দেখতে হবে। ইভিএমে ভোট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই হয়। ইভিএমটা নিয়ে আসার জন্য আমিই কিন্তু সবসময় পক্ষে ছিলাম। এখনও পক্ষে আছি। আমরা চাচ্ছি, কিছু কিছু জায়গায় শুরু হোক, সীমিত আকারে এটা দেখুক। প্রযুক্তির যদি কোনো সিস্টেম লস হয় কি না, সেটা দেখা যাক। সেটা হলে সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হবে। এটা এমন না যে এটাই  শেষ কথা। আমরা সীমিত আকারে শুরু করি, প্রযুক্তির ব্যবহার।

কারচুপি করতে পারবে না বলে বিএনপি ইভিএমে আপত্তি জানাচ্ছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির জন্মটাই কারচুপির মাধ্যমে। তারা আবার কারচুপির কথা বলে। ইভিএম হলে সেই কারচুপিটা করতে পারবে না। একের বেশি ভোট দিতে পারবে না, সিল মারতে পারবে না-সেজন্য তারা আপত্তি জানাচ্ছে। এটা স্পষ্ট।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সিটি করপোরেশন ইলেকশনে আপনারা দেখেছেন, বেশ কয়েকটি জায়গায় ইভিএমে ইলেকশনটা হলো। সবচেয়ে সুবিধাটা হলো যে মানুষটা যাচ্ছে একটা টিপ দিয়েই ভোটটা দিয়ে আসছে। আর সাথে সাথে রেজাল্টটা পেয়ে যাচ্ছে।

ভারত, ব্রিটেনসহ পৃথিবীরি অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিমসটেক সম্মেলনেও আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ অনেকের সাথে কথা বলেছি। তাদের দেশেও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হয়। বাংলাদেশেও এটা হবে। আমাদের সংবিধানে আছে প্রতি ৬০ দিন পর পর অধিবেশন বসতে হবে, ব্যতিক্রম শুধু নির্বাচনেও ওই তিন মাস।

শেখ হাসিনা বলেন, সংসদ কখনো শেষ হয়ে যায় না। দেশে যুদ্ধ বাধলে রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাবলে যারা সংসদ সদস্য আছে তাদের দিয়েই অধিবেশন ডাকতে পারেন। এ কারণে এই বিধানটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাখা হয়েছে। যাতে কোনো খাদ না থাকে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ যদি এ দেশের উন্নয়ন চায় তাহলে আগামী নির্বাচনেও নৌকা মার্কায় ভোট দেবে। আমরা যদি আবার ক্ষমতায় যেতে পারি তাহলে এ দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখব। দেশের মানুষ উন্নত জীবন পাবে। আর আমরা যদি ক্ষমতায় না আসতে পারি তাহলে যারা এতিমের টাকা মেরে খেয়েছে তারা আবার ক্ষমতায় আসবে। তারা আবার দেশের সম্পদ লুটপাট করবে, এটাই বোধ হয় ভালো।

আগামী নির্বাচনেও ১৪ দলসহ অন্যদের নিয়ে আওয়ামী লীগ জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন জোটগতভাবে হবে। জোটের সকলের সাথে আলোচনা করে নির্বাচনে অংশ নেবে আওয়ামী লীগ। আমাদের দিন বদলের কাজ চলছে। এটা চলমান প্রক্রিয়া। ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ পর্যন্ত একটা সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। বাংলাদেশ যেহেতু একটা বদ্বীপ। এই বদ্বীপটাকে বাচিয়ে রেখে কিভাবে দেশকে সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেজন্য আমরা কাজ শুরু করেছি ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর। আমি জানি না সামনে যে বা যারাই ক্ষমতায় আসুক, এই পরিকল্পনা আমি করে যেতে চাই। একটা সূদুর প্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া কখনো কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না।

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সহযোগিতা চাইলে বাংলাদেশ অবশ্যই সহযোগিতা করবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, তিনি ক্রিকেটের মাঠে অনেক ছক্কা মেরেছেন। দেখা যাক রাজনীতির মাঠে ছক্কা মারতে পারেন কি না!

এক প্রশ্নের জবাবে যুক্তফ্রণ্টের সঙ্গে জড়িত গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিকল্পধারার বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জেএসডির আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টির কাদের সিদ্দিকীর সমালোচনা করে নানা টিপ্পনী কাটেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তবে তাদের জোট গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা কিছু চাইলে আন্দোলন করুক। মাঠে নামুক।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রকাশিত একটি বইয়ে ভুয়া ছবি প্রকাশ করে যেভাবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে, তাকে ‘জঘন্য কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, মিয়ানমার যা করেছে অত্যন্ত জঘন্য কাজ। নিজেরাই নিজেদের সম্মানটা খারাপ করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে নিজেরাই নিজেদের অবস্থান খারাপ করেছে। ছবি নকলের বিষয়টি বাংলাদেশের বিএনপি-জামায়াতের কাছ থেকে মিয়ানমার শিখেছে কি না তা নিয়েও খোচা মারেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা ছবিটা নিয়ে যেটা করল, এটা আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, আমাদের এখানেও কিন্তু এ রকম হয়েছে। প্রশ্নটা হরো এরা শিখল কার কাছ থেকে?

বিমসটেক সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের সম্মেলনে সাধারণত দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো আনা হয় না। তবে মিয়ানমারের প্রেসিন্টের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন যে, আমাদের সাথে সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। তারা বলেছেন, তারা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে প্রস্তুত। এটুকু বিষয়ে তার সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আমি কথা বলেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কখনো চায়নি প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো সংঘাতপূর্ণ অবস্থা তৈরি হোক। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে আমরা সবসময় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। মিয়ানমার কখনও আপত্তি করে না। বলে নিয়ে যাবে। এটা ঠিক, বাস্তবতা হলো, তারা বলে, কিন্তু করে না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বৈঠকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন বলে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যেকোনো দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য আদর্শ হতে পারে বলে তিনি (নরেন্দ্র মোদি) মন্তব্য করেন। তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। আমি বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানাই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ভবিষ্যতে বিমসটেক একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে।

গত ৩০ ও ৩১ আগস্ট নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিকাল অ্যান্ড ইকোনোমিক কোঅপারেশন (বিমসটেক) সম্মেলনের বিষয়ে আজ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম।- আমাদের সময়