ঢাকা, শুক্রবার, ১ জুলাই ২০২২

মিয়ানমারের শাস্তিসহ নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবীতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিক্ষোভ মিছিল

প্রকাশ: ২০১৮-০৮-২৫ ১৯:২৮:০১ || আপডেট: ২০১৮-০৮-২৫ ১৯:২৮:০১

মিয়ানমারের শাস্তিসহ নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবীতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিক্ষোভ মিছিল
গফুর মিয়া চৌধুরী:
গত বছরের ২৫ আগষ্ট মিয়ানমারের ২৪টি সীমান্ত চৌকিতে স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ ও নৃশংস হামলার এক বছর। গত বছরের এদিনে এই সন্ত্রাসী হামলার সুত্রধরে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী, সীমান্তরক্ষী, নৌ-সদস্য ও উগ্র রাখাইনদের হাতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু ধর্ষণ এবং নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার হয়। তাদের বর্বরতা থেকে বাঁচতে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গা ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডের সুবিচার দাবীতে উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা বস্তির রোহিঙ্গারা।

মিয়ানমারের শাস্তিসহ নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবীতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিক্ষোভ মিছিল। ক্যাম্প গুলোতে রোহিঙ্গারা কালো ব্যাজ ধারণ। ব্লকে ব্লকে কালো পতাকা উত্তোলন। লাল ফিতা মাথায় বেঁেধ রাস্তায় নেমে আসে রোহিঙ্গারা।

শনিবার ২৫ আগষ্ট সকাল সাড়ে ৯টা থেকে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ও মধুরছড়ার এবং টেকনাফের রইক্ষ্যং পুটিবনিয়া, হ্নীলার আলীখালী, লেদা, নয়াপাড়া, শালবন, জাদিমোরা, দমদমিয়ায় ও বাহারছড়ার শামলাপুর বস্তিতে রোহিঙ্গারা মিছিল-সমাবেশ করেছে। ক্যাম্পে নিয়োজিত আইন-শৃংখলা বাহিনীর চাপে তারা কোণঠাসা হয়ে থাকলেও পুটিবনিয়া এবং শালবনে রোহিঙ্গাদের বিরাট বিক্ষোভ মিছিল তাদের ক্যাম্প আভ্যন্তরীণ সড়ক সমুহ প্রদক্ষিণ করেন। এরপর নির্দিষ্ট স্থানে সমাবেশ করে। এতে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সরকারী বাহিনীর হাতে নারী ধর্ষণ, শিশু ও নিরীহ রোহিঙ্গা হত্যাকারীদের আর্ন্তজাতিক আইনের আওতায় এনে সুবিচার দাবী করা হয়। এছাড়া নিরাপত্তা, নাগরিক সুবিধা, ফেলে আসা সম্পত্তি ফেরত ও রাষ্ট্রের অংশ-গ্রহণমূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ দিলে বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে আগ্রহী বলে মত প্রকাশ করেন।
এদিকে একটি মহলের দাবী, ক্যাম্প অভ্যন্তরে আশ্রয় নেওয়া আরসা গ্রুপ সদস্য ও কতিপয় এনজিও’র প্ররোচনা এবং উস্কানিতে এসব প্রতিবাদ ও মিছিল হয়েছে বলে জানা গেছে।

উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ও মধুরছড়া বিক্ষোভে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী মগররা আমাদের ওপর নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ ও বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে। বাধ্য হয়ে আমাদের প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। কিন্তু, এক বছর পার হয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক মহল এখনও পর্যন্ত কোনও ধরনের সুরাহা করতে পারেনি। আমরা আমাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাই। এজন্য আমাদের নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্ব ও একটি রাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
উখিয়ায় বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় একটি অংশের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন,‘রোহিঙ্গা নির্যাতনের এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু, আমাদের ভাগ্যের কোনও উন্নয়ন হয়নি। এজন্য আন্তর্জাতিক মহলকে নাড়া দিতে আজকের এই বিক্ষোভ সমাবেশ।’

নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্ব ও একটি রাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার দাবিতে রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ মিছিল করে।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, সকাল থেকে আমরা আমাদের ব্লকে শান্তিপূর্ণর্ ভাবে বিক্ষোভ করছি। এতে করে অন্তত আমাদের মনে একটু হলেও শান্তি আসবে। আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পেতে চাই। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লালু মাঝি বলেন, আমাদের এই বিক্ষোভ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। আমরা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এই বিক্ষোভ সমাবেশ করছি। আজ এক বছর পার হলেও আমরা সুষ্ঠু বিচার নিয়ে সন্দিহান। আমরা বিচার চাই, মিয়ানমারের শাস্তি চাই।

উখিয়ার থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল খায়ের এর সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন সকালে হঠাৎ করেই রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে রাস্তায় নামার চেষ্টা করে। বাধা দিলে তারা ক্যাম্পের ভেতরেই বিক্ষোভ সমাবেশ করার অনুরোধ জানায়। পরে উখিয়া ও বালুখালীর বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা তাদের কর্মসূচি পালন করে। রোহিঙ্গারা প্রতিবাদ স্বরূপ প্রায় দুই ঘণ্টা তাদের কর্মসূচি পালন করেন। এতে কোনও ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

উল্লেখ্য, গত ২০১৭ ইং সালের ২৫ আগষ্ট রাতের প্রথম প্রহরে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিম রাজ্যের পাহাড়ের পূর্ব পাশে রাশিদং, রাজারবিল, বড়ছড়া, আন্দাম, ধুপমাইল, কুল্লুং, শীতাইক্যা, মন্ডুর মেরুল্লা, হাসছুরাতা, বাগঘোনা, তালাসখ, রাবাইল্যা, ঝিমংখালী, কুয়াংছিপং, তুমব্রু, ক্যাংবং, বুচিদংস্থ টংবাজার, মিংনিশি, পীরখালী, মগডিল, বলী বাজার, ফৈরা বাজার, কুয়ারবিল, মন্ডুর হাইন্ডার পাড়াসহ ২৪টি এলাকার সীমান্ত চৌকি ও সেনা ঘাটিতে স্বশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে।

ওই সময় হামলাকারী ও সরকারী বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি এবং সংঘর্ষের সুত্রপাত হয়ে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে থেমে থেমে লড়াই চলতে থাকে। ব্যাপক ভারী অস্ত্রের ব্যবহার ও বিকট শব্দে সীমান্তের মানুষ চরম আতংকিত হয়ে পড়ে। এই ঘটনার জন্য সংখ্যালঘু মুসলিমদের দায়ী করে। এরপর হতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী, সীমান্ত রক্ষী, নৌ সদস্য ও উগ্র রাখাইনদের যৌথ হামলায় হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয় আর অসংখ্য মানুষ নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়। কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় অগণিত মানুষকে। শেষ পর্যন্ত প্রাণ রক্ষায় উখিয়া-টেকনাফের সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্ষপূর্তিতে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের নিকট রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রীয় ছত্র-ছায়ায় নারকীয় হত্যাযঞ্জের সুবিচার দাবী করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।