ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুন ২০২২

অদক্ষ চালকে সড়কে মৃত্যুর মিছিল : কেন এই অযৌক্তিক ধর্মঘট ?

প্রকাশ: ২০১৭-০৩-০৪ ২২:৪০:৪১ || আপডেট: ২০১৭-০৩-০৪ ২২:৪০:৪১

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে দু’মাসে নিহত-৭২, আহত পাঁচ শতাধিক 
অদক্ষ চালকে সড়কে মৃত্যুর মিছিল : কেন এই অযৌক্তিক ধর্মঘট ?
এম,এস রানা::
সড়কে দুর্ঘটনার নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যার কারনে একজন বেপরোয়া গড়ি চালকের ফাঁসি ও অপর চালকের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের কারনে সারা দেশ অচল করে দিয়ছিল বিভিন্ন গাড়ির শ্রমিকরা। তাতেন দাবী সড়কে মানুষ মরলে কোন প্রকার শাস্তি দেয়া যাবেনা, অর্থাৎ সড়কে মানুষ হত্যার অধিকার দিতে হবে।
বর্তমান সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ জেনেশুনে অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে অন্যায় ও অযৌক্তিক দাবী কখনো মেনে নেয়া হবেনা। অবশেষে প্রশাসনের উচ্চ মহলের জরুরী হস্তক্ষেপে তাদের সেই দাবী রষাতলে চলে গেল। অবসান হলো জনগনকে শাস্তি দেয়া ৫৩ ঘন্টার ধর্মঘটের। ক্ষতি হলো শত শত কোটি টাকার, কিন্তু কেন এই ইস্যুবিহীন ধর্মঘট ? তারা কি দেশের প্রচলিত আইন আদালত কি মানে না?
অথচ তাদের কিছু আনাড়ী এ অদক্ষ চালকের কারনে আজ সড়কে মৃত্যুর  মিছিল হচ্ছে। এক সমিক্ষায় দেখা গেছে শুধু কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়কে গত দুই মাসে মৃত্যু হয়েছে ৭২ জন মানব সন্তানের।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে বেপরোয়া গাড়ির গতি, ওভারটেকিং প্রতিযোগিতা, অদক্ষ চালক ছাড়াও, সড়কের উপর হাটবাজার বসানো সহ নানান কারণে মারাত্মকভাবে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা । ফলস্বরুপ মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। বিগত দুই মাসে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রায় ৭১ জন নিহত এবং ৫ শতাধিক আহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুর্ঘটনা প্রবণস্থান গুলো হারবাং লালব্রিজ, ইসলামনগর, ভেন্ডিবাজার মোড়, আজিজনগর উত্তরগেট মোড়, বরইতলী রাস্তারমাথা, নলবিলা চেকপোস্ট এলাকা, চকরিয়া কলেজ মোড়, জিদ্দাবাজার, ভাঙ্গারমুখ, ফাঁশিয়াখালী, রিংভং, মালুমঘাট, ছগিরশাহকাটা, দরগাহগেট, খুটাখালী মেধাকচ্ছপিয়া ঢালা, নাপিতখালী খেলার মাঠ মোড়, নাপিতখালী হাইস্কুল মোড়, ডুলাফকির মোড়, পানিরছরা, গুচ্ছগ্রাম, সদরের খরুলিয়া আলাউদ্দিনশাহ দরগাহ এলাকা, ইসলামাবাদ নতুন রাস্তার মাথা, খরুলিয়া সমিল এলাকা, রামুর বাইপাস, ও বাংলাবাজার। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের বেসিক, পানের ছড়া, রাবেতা, মরিচ্যাবাজার, উখিয়া বাজার, বালুখালী, উলবনিয়া, খঞ্জরপাড়া, নয়াপড়া, লেদা, জাদিমুরা ও নয়াবাজার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান।
এছাড়াও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণাংশ থেকে চকরিয়ার খুটাখালী পর্যন্ত প্রায় ১শ ১৫ কিলোমিটার সড়কের ৫০টির অধিক এবং কক্সবাজার-টেকনাফ ৭৯ কিলোমিটার সড়কের ৩১টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী দুর্ঘটনা ঘটেছে চকরিয়া সড়কে। এই উপজেলার ৩৯ কিলোমিটার মহাসড়কের অংশে দুই মাসে ১৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৯ জন। সদর উপজেলার লিংক রোড, ঈদগাঁও, ইসলামপুর, রামুর বাইপাস, পানির ছড়া, চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি, আধুনগর, আমিরাবাদ স্টেশন, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, দোহাজারী, পটিয়া, বোয়ালখালী, চরলক্ষ্যা এলাকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ২৯ জন। অন্যদিকে কক্সবাজার টেকনাফ মহ সড়কে নিহত হয়েছেন ৯জন। এছাড়া উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার শহরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচজন মতো নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে।
ট্রাফিক পুলিশ এবং সচেতনমহলের মতে,  ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ওভারটেকিং করা, অদক্ষ চালক, মুঠোফোনে কথা বলা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অতিরিক্ত মালবোঝাই, ভাঙাচোরা সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে সতর্ক চিহ্ন না থাকা, মহাসড়কে লবণবোঝাই ট্রাক চলাচল, নেশাগ্রস্ত চালক, নির্ঘুম থাকা ও  ট্রাফিক আইন অমান্য করায় সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ।
স্থানীয়দের দাবী, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘঠছে। দুর্ঘটনার মাত্রাও ভয়াবহ ঘটছে প্রাণহানি। এছাড়া একইদিনে একাধিক সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ও রয়েছে। তারা বলেন, সাধারণ মানুষের মাঝে সড়ক দুর্ঘটনার আতংক বিরাজ করছে। গাড়িতে করে কোথাও যেতে ভয় করছে। অথচ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।
 জানা যায়, ২ জানুয়ারি কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের রামুর পানেরছড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন।
১০ জানুয়ারি ঈদগাঁওতে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় একজন নিহত হন।
১১ জানুয়ারি কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের চেইন্দা এলাকায় ইটবোঝাই ট্রাকের ধাক্কায় এক পথচারী নিহত হন। ১৬ জানুয়ারি ঈদগাঁওতে বাস খাদে পড়ে ১০ জন আহত হন।
১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ঈদগাঁওয়ে ম্যাজিক গাড়ির ধাক্কায় এক শিশু নিহত হন।
১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কক্সবাজার সদরের ইসলামপুরে ম্যাজিক গাড়ির ধাক্কায় টেকনাফের এক শিশু নিহত হন।
১৯ জানুয়ারি চকরিয়ার চকরিয়া-মহেশখালী সড়কে বাটাখালী এলাকায় সিএনজি-ম্যাজিক গাড়ি মুখোমুখি সংঘর্ষে এক ব্যবসায়ী নিহত হন। এই ঘটনাসহ আরেক দুর্ঘটনায় মোট আটজন আহত হন। একইদিন একই স্থানে ম্যাজিক গাড়ির ধাক্কায় এক বৃদ্ধ নিহত হন। একই দিন  শহরের কলাতলী এলাকায় ডাম্পারের ধাক্কায় মোটরসাইকেলে আরোহী নিহত হন।
২০ জানুয়ারি চকরিয়ায় দু’টি সড়ক দুর্ঘটনায় দু’জন নিহত হন, আহত হন চারজন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হারবাং এলাকায় ম্যাজিক উঠতে গিয়ে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় একজন নিহত হন। এসময় আহত হন আরো চার যাত্রী। অপরদিকে চকরিয়ার চকরিয়া-মহেশখালী সড়কের মাইজঘোনা এলাকায় মোটরসাইকেলে ধাক্কায় এক শিশু নিহত হয়।
২১ জানুয়ারি চকরিয়ার পূর্ব বড়ভেওলায় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় এক বৃদ্ধ নিহত হন।
২৫ জানুয়ারি চকরিয়ায় ডাম্পারের ধাক্কা মাইক্রোবাসের যাত্রী এক শিশু নিহত ও আহত হয় ছয়জন।
২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ের রামু নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে বাসের ধাক্কায় এক যুবক নিহত হন।
১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা পাগলিরবিল এলাকায় মাইক্রোবাস ও তেলবাহী ভাইসারের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক কিশোর নিহত হয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ১০ জন।
২ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ার হারবাংয়ে এসিবাস-নোহা সংঘর্ষে তিন যাত্রী নিহত, আহত হন ১৫ জন। একই দিন রামু-মরিচ্যা সড়কে পিকআপ চাপায় মারা যায় এক স্কুলছাত্র। একই সময় কক্সবাজার শহরের কানাইয়া বাজার রাস্তা পার হওয়ার সময় সময় দ্রুতগামী টমটমের ধাক্কায় মিথিলা নামে এক শিশু গুরুতর আহত হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ ফেব্রুয়ারি মারা যায় মিথিলা।
২৪ জানুয়ারি পেকুয়ার টইটংয়ে নসিমন গাড়িচাপায় এক স্কুলছাত্র নিহত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার উপজেলার হারবাং ইনানী রিসোর্ট এলাকায় পিকনিক বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্য নিহত এবং অন্তত ১৫ যাত্রী আহত হয়েছেন। অপরদিকে রাতে টেকনাফে পথ পার হয়ে চট্টগ্রামগামী সুগন্ধা বাসের ধাক্কায় পারভীন আক্তার (১৩) নামে কিশোরী মারা যায়।
১২ ফেব্রুয়ারি রবিবার কোটবাজারে  টমটম দুর্ঘটনায় নারীসহ ৫জন আহত হন। ১৩ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের বালুখালি টিভি রিলে কেন্দ্র এলাকায় টেকনাফগামি একটি মাইক্রোবাস খাদে পড়ে শিশুসহ ১২ জন আহত হন।
১৬ ফেব্রুয়ারি চকরিয়া-বদরখালী-মহেশখালী সড়কের ইলিশিয়া এলাকায় দাখিল পরীক্ষার্থীদের বহনকারী একটি বাস খালে পড়ে ৫৪ জন পরীক্ষার্থীর আহত হন। ১৯  ফেব্রুয়ারি চকরিয়ায় বানিয়ারছড়া এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় অপর এক গাড়ির হেলপার নিহত হন।  ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে রামুর রাবার বাগান এলএলাকায় যাত্রীবাহী বাস উল্টে ৪০ জন আহত হন । একইদিন চকরিয়ায়  ডুলাহাজারায় বালি ভর্তি ডাম্পার গাড়ির ধাক্কায় মতিউর রহমান নেজামী নামের এক কলেজ ছাত্র গুরতর আহত হন।
হেল্প কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক এম এ কাশেম জানান, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে অপ্রতুল ট্রাফিক ব্যবস্থাকে সড়ক দূর্ঘটনার অন্যতম কারণ।  এছাড়াও  যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, সড়কের উপর অবৈধ হাটবাজার, এলোমেলো যাত্রী উঠানামা প্রতিরোধ করে দূর্ঘটনা কমাতে হবে বলে পরামর্শ দেন।
পরিবহন শ্রমিক নেতা কামাল আজাদ জানান, সব চালক অদক্ষ নন। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে সতর্কতার সাইনবোর্ড না থাকায় জেলার বাইরে থেকে আসা চালকেরা দুর্ঘটনায় পড়েন। এছাড়াও কিছু চালকের প্রশিক্ষণ নেই বলে স্বীকার করেন তিনি।
দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে  ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে সাইনবোর্ড স্থাপন, চালকদের প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স না দেওয়া এবং দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানান সচেতন মহল।