ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২

উখিয়ায় ভর্তি বাণিজ্য !

প্রকাশ: ২০১৭-০১-২২ ২০:৩৭:১৯ || আপডেট: ২০১৭-০১-২৪ ২৩:১৮:৩৮

দুদুকের অনুসন্ধান জরুরী

উখিয়ায় ভর্তি বাণিজ্য !

জসিম আজাদ, সিএসবি২৪ ডটকম :
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ১৬টি উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্র/ছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিদের্শনা উপেক্ষা করে একটি অসাধু চক্র ভর্তির এ মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায় ১ কোটি টাকা বাণিজ্য করে ভাগ-বাটোয়ার করে নিয়েছে। এ চক্রটি ছাত্র-ছাত্রীদের এ ভর্তির সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীদের দরিদ্র অভিভাবককে ৩ গুন হারে অর্থ দিয়ে স্কুলে ভর্তি করাতে হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর বেআইনী কার্যক্রম থেকে উত্তরণ চান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার ১৬টি উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি মাত্র সরকারি ছাড়া বাকিসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি এমপিও ভূক্ত। বিশেষ করে উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ১২শ ছাত্র- ছাত্রী রয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত ভর্তি ফি বাবদ ৫শ টাকার স্থলে ১২শ থেকে ১৩শ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায় করা হচ্ছে। প্রায় ১২শ শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত ভর্তি ফি’র অর্থ বাবদ ৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বাণিজ্য করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থীর দরিদ্র অভিভাবক জানান, শিক্ষা বান্ধব সরকারের হাতে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অনুযায়ী উখিয়া টেকনাফের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উখিয়া টেকনাফে ২টি কলেজ ও ২টি উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। অবহেলিত ও বঞ্চিত দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় রেখে ঝড়ে পড়া রোধ এবং ছেলে মেয়েদের স্কুলমুখী করতে সরকার নানা উদ্যোগের পাশাপাশি যাবতীয় বই খাতাসহ স্কুল উপকরণ দিয়ে আসছে। এমনকি শিক্ষকদের বেতন ভাতা দ্বিগুন হারে বৃদ্ধি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অনিয়ম দুর্নীতি রোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন শিক্ষা বান্ধাব শেখ হাসিনার এ সরকার। তারপরও উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ভর্তির ক্ষেত্রে কেন, কি কারণে ৩ গুণ হারে টাকা আদায় করে চলছে তা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক শ্রেণীর অদৃশ্য শক্তি স্কুলটির আয়ের অর্থের নেপথ্যে জড়িত থাকায় এখানকার দরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়েদের ভর্তি ক্ষেত্রে বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। যা একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোন ভাবেই কাম্য নয়। এ ধরণের অনাকাংখিত এবং অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য অবশ্যই স্কুল কর্তৃপক্ষ দায়ী। অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে ভর্তি করেছেন মালভিটা পাড়া গ্রামের দরিদ্র অভিভাবক নুর আহম্মদ তার এক ছেলেকে। তার দু’ছেলেই উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে এটা তার গর্বের বিষয় হলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অজুহাতে ছেলে মেয়েদের নিকট মন্ত্রনালয়ের নিদের্শনা ব্যতি রেখে টাকা আদায় করা হচ্ছে। যা একটি দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক হয়রানি বলে নুর আহম্মদ মনে করেন। এ প্রসঙ্গে উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন সিরাজী কোন সন্তোষ জনক উত্তর জানাতে পারেনি।

এ দিকে আবুল কাশেম নুর জাহান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, মরিচ্যা পালং উচ্চ বিদ্যালয়, সোনারপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়, পালংখালী উচ্চ বিদ্যালয়, ভালুকিয়া উচ্চ বিদ্যালয়,  বকতিয়ার চেমন বাহার চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, থিমছড়ি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সোনাইছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, এন আই চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, উখিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ উখিয়ার ১৪টি উচ্চ বিদ্যালয় ভর্তির ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মরিচ্যা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতির নজির সৃষ্টি করেছেন। এ বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে বলে একাধিক অভিভাবকের অভিযোগে জানা গেছে। সম্প্রতি উখিয়া উপজেলায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এটিএম জাফর আলমের নামে কোটবাজারে আরো একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষা কার্যক্রম ভাল ভাবে চলছে বলে প্রধান শিক্ষক আবদুল করিম জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার গুরুত্বপূর্ন ও ঐতিহ্যের ধারক হিসাবে আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। একমাত্র এ বিদ্যালয়টিতে ১০০% স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার আওতায় ছাত্র-ছাত্রীদের বোর্ডের নির্ধারিত ফি ৫শ টাকা থেকে আরো ২০ টাকা  কম নিয়ে ছেলে মেয়েদের ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। দক্ষ, সৎ ও নিষ্টাবান বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দের কারণে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে পারেনি। এছাড়া বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পাশাপাশি শিক্ষক শিক্ষিকাদের সৎ মন-মানসিকতায় যদি স্কুল পরিচালনা করে তাহলে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের  স্কুলমুখী করতে আগ্রহী বা উৎসাহ বোধ করবে। এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ১৫শ ছাত্রছাত্রী অধ্যায়নরত রয়েছে।

পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য শিক্ষানুরাগী আবুল হাসনাত চৌধুরী আবুলু বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো হচ্ছে আদর্শ জাতী গড়ার কারখানা। এখানে কোন ধরণের অনিয়ম দুর্নীতির বাসা বাঁধলে সেটা হবে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান গুলোর অন্তরায়। শতভাগ সততার সহিত বিদ্যালয় পরিচালিত হলে অল্প দিনেই সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম কিংবা সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়“ ধর্মের ঢোল বাতাসে বায়বো”। তাঁর মতে, সারাদেশে অনিয়ম দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশে একটি কার্যকর সরকারি সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদুক) রয়েছে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্টান গুলোর অনিয়ম দুর্নীতি তদন্ত, অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে একদিকে যেমন দরিদ্র পরিবারের অর্থের লাঘব হবে, অন্যদিকে প্রতিষ্টান গুলো আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলাসহ স্কুল উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ ইদ্রিচ মিঞা জানান, সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়েও ২০ টাকা কম নিয়ে ছেলে মেয়েদের ভর্তির সুযোগ দিতে পারায় তিনি গর্বিত। তাঁর মতে, উপজেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্টান সংশ্লিষ্টগণ পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের এ নীতি অনুসরণ করতে পারে।

উপজেলার ১৬টি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে বোর্ড নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে, শিক্ষা অফিসার রাইহানুল ইসলাম মিয়া বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোন অভিযোগ আসেনি। উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো ভর্তির নাম দিয়ে সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে ১৬টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কোটি টাকার বাণিজ্য করে হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন সঠিক জবাব দেননি। একটি উপজেলার শিক্ষা প্রশাসন হিসাবে তিনি নিজে কোন অভিভাবক বা শিক্ষার্থীদের নিকট ভর্তির বিষয়ে কথা বলেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোন কেটে দেন।