ঢাকা, রোববার, ২৬ জুন ২০২২

পালং হাই স্কুল: সফলতা-ব্যর্থতার ৭০ বছর

প্রকাশ: ২০১৭-০১-১৫ ১২:২৬:২৩ || আপডেট: ২০১৭-০১-১৫ ১২:২৬:২৩

পালং হাই স্কুল: সফলতা-ব্যর্থতার ৭০ বছরজসিম আজাদ::

কক্সবাজারের দক্ষিণ সীমান্তের ঐতিহ্যবাহী গৌরবময় ইতিহাসের অধিকারী পালং আদর্শ উচ্চ  বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এতদাঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্টির মাঝে নানা ভাবে শিক্ষার আলো ছড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বৃটিশ শাসন আমলে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি সরকারি কোন পৃষ্টপোষকতা না পেলেও ব্যক্তি ও বেসরকারি সহযোগীতায় পরিচালিত বিদ্যালয়টি দক্ষিণ কক্সবাজারে এক সময় বেশ নাম ডাক কুড়িয়ে ছিল। দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিদ্যালয়টি সুনাম ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম হলেও মাঝ পথে স্থানীয় গুটি কয়েক স্বার্থন্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রে বিদ্যালয়টি বন্ধ থাকায়, কয়েক বছর এলাকার ছেলে মেয়েরা পড়া লেখা থেকে বঞ্চিত হয়। যার ফলে এতদাঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টির পারিপার্শি¦ক অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়ে। এক সময়ের নামকরা এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কর্মরত থাকা সহ বিভিন্ন কারণে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এলাকার মানুষের মাঝে নানা ভাবে গুরুত্ব বহন করে আসছে। এলাকার স¤্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী জমিদার মরহুম হোসেন আলী মাতব্বর এলাকার ছেলে মেয়েদের সুশিক্ষায় আলোকিত করতে ১৯৪৬ সালে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মরহুম হোসেন আলী মাতব্বর একদিকে যেমন জমিদার ছিলেন তেমনি গণমানুষের ছেলে মেয়েদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে এলাকায় একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। তার এ ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় নামকরণের মধ্যদিয়ে এ প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে। এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আদর্শ, সুনাম ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়। কিন্ত এক সময়ের নামকরা গর্বিত এই বিদ্যালয়টি কালের আর্বতে ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে। একটি বিদ্যালয় পরিচালানার জন্য একটি কার্যকরী পরিষদের যেমন দরকার তেমনি শিক্ষার মান উন্নয়ন সহ বিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয়ে তদারকি ও সহযোগীতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ সুবাদে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়েও ১৯৯১ সালে একটি দক্ষ ও যোগ্যতা সম্পন্ন পরিচালনা কমিটি বা কার্যকরী পরিষদ ছিল। কার্যকরী পরিষদ অবশ্যই বিদ্যালয়ের নানা দিক দেখভাল করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক আধিপাত্য ও তহবিল তছরূপ করার উদ্দেশ্যে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে বিদ্যালয়টিতে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়। ১৯৯১ সালে প্রধান শিক্ষক এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দ্বন্দ্ব, কোন্দল, আধিপাত্য ও দলাদলির কারণে প্রায় ৪ বছর বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার দিক থেকে বিদ্যালয়টি পিছিয়ে পড়ে। এতদাঞ্চলের দরিদ্র বিশাল জনগোষ্টির ছেলে মেয়েরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির শত চেষ্টার পরেও এই বিদ্যালয়ে আর স্বাভাবিক ও শিক্ষার সুষ্ট পরিবেশ আর ফিরে আসেনি, শিক্ষা বঞ্চিত হয়ে ঝড়ে পড়েছে অন্তত চারটি প্রজন্ম।

১৯৯৪ সালের দিকে এলাকার শিক্ষানুরাগী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিদ্যালয়ের করুন পরিনতির অবসান ঘটিয়ে বিদ্যালয়ের পড়ালেখার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ হাতে নেয়। তবে এলাকার শিক্ষানুরাগী এসব ব্যক্তিবর্গের হাতে নেওয়া পদক্ষেপ বেশিদূর এগুতে পারেনি। কোন রকম ৫ বছর পর্যন্ত সংকটাপন্ন এ বিদ্যালয়টি নানা প্রতিকূলতার মধ্যে অতিবাহিত করলেও ২০০০ সালের দিকে কথিত প্রধান শিক্ষক আবারো বিদ্যালয়টি বন্ধের ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বাস্তবায়ন করেন। তবে প্রধান শিক্ষকের এ ষড়যন্ত্র রুঁখে দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়ালেখার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যান। এলাকার উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের সংগঠিত করে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি স্কুলটি চালু রাখার জন্য সব প্রতিকুল অবস্থা মোকাবেলা করেন। তাদের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ২০০২ সালের দিকে পড়ালেখার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসে। এরপর থেকেই মোটামুটি ভাবে বিদ্যালয়টির পড়ালেখার স্বাভাবিক কার্যক্রম চলে আসাছে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, ষড়যন্ত্র, প্রতিকুলতা ও সমস্যার মধ্য দিয়ে আজ বিদ্যালয়টি ৭০ বছরে পা রেখেছে। কক্সবাজারের দক্ষিণ সীমান্তের একমাত্র প্রাচীন এ বিদ্যালয়ের ৭০ বছর পুর্তি উদযাপনের লক্ষ্যে ১৯৪৬ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত  প্রাক্তন গর্বিত শিক্ষার্থীরা আয়োজনের সকল প্রাথমিক প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাই এ মহতী উদ্যেগটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেয়। যেটা কক্সবাজারের দক্ষিণ সীমান্তের অন্য কোন বিদ্যালয়ের পক্ষে এ কঠিন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। বৃহত্তর উখিয়া উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭০ বছর পুর্তি উদযাপন যুগ যুগ ধরে অনুকরণীয় ও অনুস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এ উপলক্ষ্যে গত ১৩ জানুয়ারি কোর্টবাজার চৌধুুরী মার্কেটের ৩য় তলায় জ্ঞানবৃক্ষ হল রুমে উখিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মাহমুদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও জসিম আজাদের সঞ্চালনায় এক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১০১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক চৌধুরীকে আহবায়ক ও আবুল মনসুর চৌধুরীকে যুগ্ন আহবায়ক করা হয়।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উখিয়া টেকনাফের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি বলেন, নানা সমস্যায় জর্জরিত এ বিদ্যালয়টির পড়া লেখার সুষ্ট পরিবেশ বজায় রাখতে বিভিন্ন প্রনোদনা দিয়ে আসছি। তাছাড়া বিদ্যালয়ের সমস্যা নিরসনে বহুমূখী পরিকল্পনাও রয়েছে এবং স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। যাতে এতদাঞ্চলের ছেলে মেয়েরা শিক্ষার আলো পায়।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য শিক্ষানুরাগী আবুল হাসনাত চৌধুরী আবুলু বলেন, বিদ্যালয়ের সকল ক্ষেত্রে অনিয়ম, দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আধিপাত্য বিস্তারের অনৈতিক কর্মকান্ড পরিহার করে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় আজ ৭০ বছর পুর্তি উদযাপনের মত কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সকলের সহযোগীতায় গৌরবময় এ বিদ্যাপীঠের  উদযাপন অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) ইদ্রিচ মিঞা বলেন, গৌরবান্বিত পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কঠিন থেকে কঠিনতর সমস্যার অবসান ঘটিয়ে বিদ্যালয়ের পড়ালেখার ক্ষেত্রে গতি ফিরে এসেছে। বিরাজমান এ ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে এ বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদেরকে অতীতের মত আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না।