ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২

মাতারবাড়িতেই নির্মিত হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর॥

প্রকাশ: ২০১৭-০১-১৫ ১১:২৩:০৪ || আপডেট: ২০১৭-০১-১৫ ১১:২৩:০৪

মাতারবাড়িতেই নির্মিত হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর॥

আবদুর রাজ্জাক,কক্সবাজার:

কক্সবাজারের মহেশখালী মাতারবাড়িতেই নির্মিত হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর। ভূরাজনৈতিক কারণে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ ‘আপাতত’ সম্ভব না হলেও মহেশখালীর মাতারবাড়ির কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্মিত জেটিই সেই অভাবের বেশ খানিকটা পুষিয়ে দিতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের মতে মাতারবাড়িতে নির্মাণাধীন জেটিতে ১৮ মিটার ড্রাফট ও কমপক্ষে ২২০ মিটার দৈর্ঘ্যরে কমপক্ষে ৮০ হাজার মেট্রিকটনের বেশি ওজনের জাহাজ ভিড়তে পারবে। বলা যায়, মহেশখালীর মাতারবাড়িতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনে নির্মাণ হতে যাওয়া বন্দরে এই সুবিধা পেতে যাচ্ছে দেশ। এদিকে থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরেই গভীর সমুদ্রবন্দরের স্বাদ পাওয়া যাবে।

জানা গেছে, ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে উপকূল থেকে সাগরের দুই কিলোমিটার দূর থেকে ৫৪ ফুট (১৮মিটার) গভীর ও প্রাথমিকভাবে ৩০০ ফুট চওড়া হলেও পরবর্তীতে ৭৫০ ফুট চওড়া চ্যানেলের মাধ্যমে সহজেই জাহাজ একেবারে চরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে।বর্তমানে মাতারবাড়ির সাইবার ডাইল গ্রামের উত্তর দিকের বিশাল চরে ১৮ মিটার ড্রাফটের চ্যানেল তৈরি করতে ড্রেজিংয়ের কাজ করছে বিশ্বের শক্তিশালী ৫টি ড্রেজারের একটি ক্যাসিওপিয়া ভি। কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি হবে দক্ষিণ দিকে। কিন্তু উত্তরের এতো বিশাল জায়গা কি কাজে ব্যবহৃত হবে জানতে চাইলে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (সিপিজিপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক আবুল কাসেম বলেন, ‘আমাদের ব্যবহারের পর বাকি জায়গা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। এতে দেশ গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা পাবে। কারণ এই জেটিতে প্যানামেক্স (৮০ হাজার টনের বেশি ওজন ও ২২০ মিটার দৈর্ঘ্যরে বেশি এবং ১২ মিটার ড্রাফটের বেশি জাহাজ) সাইজের ভিড়তে পারবে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি সুবিধা বাড়বে। এছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় কিছু রোড নেটওয়ার্কও করা হবে যাতে কনটেইনার পরিবহন সুবিধাও গড়ে উঠবে।’গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে তা ব্যবহার করতে পারার বিষয়ে কোনো আপত্তি চট্টগ্রাম বন্দরের রয়েছে কি-না জানতে চাইলে আবুল কাসেম বলেন, ‘কোনো আপত্তি নেই। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তিও রয়েছে। তাই চাইলেই বন্দর কর্তৃপক্ষ তা ব্যবহার করতে পারবে।’এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ড্রেজিংয়ের কার্যক্রম দেখার জন্য সম্প্রতি বন্দর কর্তৃপক্ষের দুজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিদেশ থেকে কোনো জাহাজ এলে কোনো না কোনো বন্দরের আওতায় আসতে হয়। সেই হিসেবে মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৮০ হাজার টনের বাল্ক জাহাজগুলোকে চট্টগ্রাম বন্দরের নামে দেশে প্রবেশ করতে হবে এবং ভিড়তে হবে মাতারবাড়িতে। এ জন্য জেটির নিয়ন্ত্রণ থাকবে চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন। আর কয়লা উঠানো ও নামানোর পর ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জেটিতে কনটেইনারবাহী জাহাজও বন্দর কর্তৃপক্ষ চাইলে ভেড়াতে পারবে। আর সেখান থেকে মালামাল লাইটার জাহাজে করে বা সড়কপথে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা যাবে।

ভূরাজনৈতিক কারণে সোনাদিয়ায় আমরা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে না পারলেও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে ‘মন্দের ভালো’ পাচ্ছি জানিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, যেহেতু রাজনৈতিক কারণে সোনাদিয়ায় এখন গভীর সমুদ্র পাচ্ছি না, সেহেতু মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকে ঘিরে তৈরি হতে যাওয়া বন্দরটিতে আমরা গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা পেতে পারি। এতে হয়তো আমরা আমাদের দেশের প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতে পারবো। তবে সাগর থেকে ৩৫ কিলোমিটার ভেতরে ‘পায়রা’ কখনো গভীর সমুদ্রবন্দর হতে পারে না।জাইকার অর্থায়নে আমরা একটি রেডিমেড গভীর সমুদ্রবন্দর পেলে আমাদের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে জানিয়ে চিটাগাং জুনিয়র চেম্বারের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের যেহেতু ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম করছে। সেহেতু এ ধরনের একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা পেলে অবশ্যই আমাদের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে।শিপিং প্রতিষ্ঠান ওওসিএল এর মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। কিন্তু গভীর সমুদ্রবন্দরে ১২ মিটার ড্রাফটের বেশি ও প্রায় ২০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যরে জাহাজ ভিড়তে পারে। মাতারবাড়িতে এই সুবিধার জাহাজ ভিড়তে পারবে। আর সেসব জাহাজে ৮ থেকে ১০ হাজার একক কনটেইনার নিয়ে জাহাজ ভিড়তে পারবে। কিন্তু আমাদের তো এতো বেশি কনটেইনারবাহী জাহাজের প্রয়োজন নেই। চট্টগ্রাম বন্দরে সাধারণত সাড়ে চার হাজার একক কনটেইনারের জাহাজ ভিড়ে থাকে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি চায় তাহলে বেশি কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়াতে পারবে।

উল্লেখ্য, প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার কয়লা বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্পে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) দিচ্ছে ২৯ হাজার কোটি টাকা ও বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে সাত হাজার কোটি টাকা। এই অর্থায়নের আওতায় গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। আর রাজনৈতিক কারণে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা যাচ্ছে না বলে মাতারবাড়ি দিয়েই হয়তো গভীরসমুদ্র বন্দরের সুবিধা পাবে দেশ।

এদিকে,পর্যটন নগরী কক্সবাজার সংলগ্ন মহেশখালী দ্বীপ ঘিরে দেশী-বিদেশী অর্থায়নে উন্নয়নের যে মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে তাতে শুধু এলাকা নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে মহেশখালী দ্বীপ এলাকা ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে এলএনজি, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প ও গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প। ‘বাংলাদেশ-জাপান কম্প্রিহেনসিভ পার্টনারশিপ’ সমঝোতার আওতায় এ কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। কর্মসূচীর নাম দেয়া হয়েছে বিগ-বি বা বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট। এর আগে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন হয়েছে এ দ্বীপের সোনাদিয়া পয়েন্টে। দেশী-বিদেশী পরামর্শক ও অর্থায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত প্রকল্পের কাজ। দ্বীপের মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, কয়লা আমদানির জন্য জেটি নির্মাণ, মাতারবাড়ি থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিদ্যুত সঞ্চালন লাইন স্থাপন, কক্সবাজার থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত সমুদ্রের ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণ এবং মাতারবাড়ি ইউনিয়নকে একটি টাউনশিপ হিসেবে গড়ে তুলতে অর্থায়ন করবে জাপান সরকার। এজন্য জাপান সরকার খরচ করবে বিপুল অঙ্কের অর্থ। জাপান সরকার বিগ-বি প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে যাবতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মাতারবাড়িকে দেশের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের মধ্যে বিদ্যমান সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শিল্প ও বাণিজ্যের উপযোগী করে ঢেলে সাজা হবে। পরবর্তীতে এর বিস্তৃতি ঘটবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে। এ কর্মসূচীর মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকায় একটি ইন্ডাস্ট্রিাল বেল্ট প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রস্তাবিত বেল্টটির জন্য মাতারবাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুত সরবরাহ করা হবে। কর্মসূচীর আওতায় সরকারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শিল্প স্থাপনের জন্য একটি ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে জাইকার কাছে।মহেশখালীর মাতারবাড়িকে ঘিরে সরকারের উন্নয়নের মেগা প্রকল্পের কারণে একে ঘিরে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা করছে বিশেষজ্ঞরা। ইতোমধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানী রাষ্ট্রদূত, জাইকা প্রতিনিধি, মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ প্রধান এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে যে ক’টি উপকূলীয় দ্বীপ রয়েছে তন্মধ্যে মহেশখালী অন্যতম। ৩৬২ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার জুড়ে এ দ্বীপটি পর্যটন নগরী কক্সবাজার সংলগ্ন। জোয়ারের সময় কক্সবাজারের সঙ্গে দ্বীপটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর ভাটার সময় কক্সবাজারের মূল ভূ-খন্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে। বর্তমান সরকার গৃহীত উন্নয়নের এ মহাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে এলাকার মানুষের মাঝে উল্লাসের শেষ নেই। অজপাড়াগাঁয়ে গড়ে উঠছে টাউনশিপ।