ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২

মাদকের করাল গ্রাসে কোর্টবাজার !

প্রকাশ: ২০১৭-০১-১১ ২২:২১:১৪ || আপডেট: ২০১৭-০১-১১ ২২:২১:১৪

 

জসিম আজাদ::
উখিয়ার বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত কোর্টবাজারে মাদকের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় থাকায় যেন হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক ও ইয়াবা। মাদকের এই সহজ লভ্যতা রোধ করা না গেলে কোর্টবাজারের সামাজিক পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠার পাশাপাশি সুনাম ও ঐতিহ্য নিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রশ্ন দেখা দেবে ? আলোকিত কোর্টবাজার গড়ে উঠার পিছনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে এ মাদক সিন্ডিকেটের কারণে। কোর্টবাজারে দিনের বেলায় পাশ্ববর্তী ৪ ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের বিচরণ থাকলেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই বেড়ে যায় মাদক ও ইয়াবা সেবীদের উৎপাত। ফলে কোর্টবাজার আসা বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ পথচারী লোকজন মাদকাসাক্তদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ নিয়ে উখিয়ার অর্থনৈতিক নির্ভর বাণিজ্যিক স্টেশন কোর্টবাজারের সুনাম, ঐতিহ্য ও আইন শৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির আশংকা দেখা দিয়েছে।

এদিকে সংশিস্নষ্ট প্রশাসন, মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সমিতি ও অসংখ্য সরকারি বেসরকারি সংস্থা মাদক প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টিলগ্নে বছরের পর বছর এর বিরম্নদ্ধে সোচ্চার থাকলেও কার্যত: কোন কাজে আসছে না। সংশিস্নষ্টরা বিপুল পরিমান অর্থের অপচয় করে লোক দেখানো মাদক প্রতিরোধে সভা-সমাবেশ,র্ যালি, মানব বন্ধন করে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য যে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে থাকে, তা মূলত আইওয়াশ বলে মন্ত্মব্য করেছেন কোর্টবাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ কবি আদিল উদ্দিন চৌধুরী।

সরেজমিনে ঘুরে বিভিন্ন লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাত ঘনিয়ে আসার পরপরই শুরম্ন হয় মাদক আসক্তদের আনা গোনা। কোর্টবাজারের চিহ্নিত সহস্রাধিক মাদক আসক্ত ছাড়াও ব্যাপক হারে বাড়ছে বহিরাগত মাদকসেবীর আনা গোনা। এছাড়া বর্তমানে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে কোর্টবাজার এখন মাদকসেবীরা অনেক নিরাপদ মনে করছেন। যার ফলে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা চিহ্নিত নেশা আসক্তরা কোর্টবাজারকে গ্রাস করে ফেলেছে। শুধু তাই নয় লোক সমাগমের ভিড়ে মাদক বিক্রেতা এবং ক্রেতারা এক প্রকার প্রকাশ্যেই চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ মরন ঘাতক এ ব্যবসা।

স্থানীয় সচেতনদের মতে, রাতে কোর্টবাজার চলে যায় নেশা খোরের দখলে। এ কারণে ক্রমশ সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি বসবাসের অযোগ্য হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। ফলে বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে কোর্টবাজারের শান্ত্ম পরিবেশ। আর এতে করে অসহায় হয়ে পড়ছে স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকবৃন্দ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়ার ব্যস্ততম স্টেশন কোর্টবাজর মাদক বেপারীদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য সন্ধ্যা প্রবেশ না করতেই বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক সেবীদের উপদ্রম্নপ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। মাদক সেবন ও মাদক বিক্রির উৎসব চলে গভীর রাত পর্যন্ত্ম। এসব নেশা খোররা মাতাল অবস্থায় পথচারী ও ঘরমুখো লোকজনকে লাঞ্চিত, অপদস্থসহ বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে থাকে। ফলে অনেকেই মান সম্মান অথবা সম্ভ্রামহানীর ভয়ে এসব বিষয়ে কোথাও অভিযোগ বা মনের ক্ষোভ জানাতে বা প্রকাশ করতে পারে না। বিশেষ করে মাদক ও ইয়াবা সম্রাটদের কারণে দিনের পর দিন স্বাভাবিক পরিবেশকে কুলষিত করে তুলছে। এলাকার সচেতন মানুষকে দারণ ভাবে ভাবিয়ে তুলছে, কিভাবে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রÿা পাওয়া যায়। তাছাড়াও মাদক সেবনোত্তর বিশ্রী গন্ধ কোর্টবাজারের সুষ্ট পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।

কোর্টবাজার সংলগ্ন দরগামুরা কবরস্থান সড়কে কাঠমিস্ত্রী শাহজাহান ফার্নিচারের দোকানের নেপথ্যে দীর্ঘ দিন ধরে মাদক ব্যবসা বহাল তবিয়তে চালিয়ে আসছে। তুতুরবিল এলাকার নুরম্নল ইসলাম ফকিরের পুত্র শাহ আলম, তাছাড়া ভালুকিয়া রোডস্থ রিক্সা মেকানিক সাইরা বড়ুয়া, আনোয়ার ওরফে মাস্টার আনোয়ার, সেলিম, রুবেল ও দীর্ঘ ধরে মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে। বড়বিলের তবলা শামশু, মধ্যরত্নার তিলিপ বড়ুয়া, দুলু বড়ুয়া, মসজিদ রোডের সুলতান আহমদেও পুত্র নুর মোহাম্মদ, তার ভাই টুনু খলিবা, সিরাজ, আবদুচ ছালাম, মরিচ্যা বউ বাজারের ডাকাত সিরাজ ও তার স্ত্রী, নজির আহম্মদ ও তার ছোট ভাই নুরম্ন, মনজুর, রমজান, আবুল হাশেম, কামাল, মাছ বাজারের আবদুচ সালাম, মধু ঘোনার জাফর আলম, কোটবাজার সৈকত সড়কে জালিয়াপালংয়ের মোকতার ও শামশু রত্না পালং চাকবৈঠা গ্রামের ইকবালসহ আরো অন্তত শতাধিক মাদক বিক্রেতা কোর্টবাজার জুড়ে তৎপর রয়েছে। ফলে এখানকার স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই বিঘ্নিত হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোটবাজারের পাশ্ববর্তী মনির মার্কেট, রুমখাঁ বাজার, কোটবাজার দক্ষিণ স্টেশন, উত্তর স্টেশন, এন আলম মার্কেট, ভালুকিয়া রোড, ক্লাস পাড়া, করই বনিয়া, চাকবৈঠা, হারুণ মার্কেট, পশ্চিম রত্না, পাইন্যাশিয়া, জুম্মা পাড়া, হিজলিয়াসহ উখিয়া উপজেলার চিহ্নিত শতাধিক মাদকের স্পট থেকে নিয়মিত মাদক ও ইয়াবার সরবরাহ হওয়ায় সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। মাদকের এই ভয়াবহতা কোটবাজারকে গ্রাস করে চললেও রহস্য জনক কারণে সংশিস্নষ্ট প্রশাসন রীতিমত নিরব। ফলে এখানকার উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের নিয়ে অভিভাবকেরা চরম হতশায় ভুগছে। এছাড়াও অনেক মাদকসেবী ও মাদক বেপারীর নিরাপদ পয়েন্ট হিসাবে খ্যাত মনির মার্কেটের শামশু প্রকাশ খোকুন্যা চোরার বাপ, জাগির হোসেন প্রকাশ জাইগ্যা, ছব্বিরের ছেলে শামশু রুমখাঁবাজারে বসবাসকারী ও কোটবাজার স্টেশনে বাদাম বিক্রেতা পলাশ ধর ও সুজিত ধর সহ বেশ কয়েক জন মদ, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা সহ বিভিন্ন মাদক দ্রব্য সেবন ও বিক্রি করে আসছে। এরা সন্ধ্যা না হতেই বাংলামদ খেয়ে মাতাল হয়ে প্রতিবেশীদের দূর্ব্যবহারসহ ঘরমুখো ও পথচারী লোকজনকে লাঞ্চিত ও অপদস্থ করে আসছে।

এ ব্যাপারে রত্নাপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান খাইরুল আলম চৌধুরী বলেন, মাদকাসক্তি বর্তমান সমাজের একটি বড় ব্যধি। যা সমাজে যদি একবার প্রবেশ করে তা কিছুতেই রোধ করা যায় না। জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল আমিন চৌধুরী বলেন, মাদক সমাজের ধ্বংস ডেকে আনা ছাড়াও মাদকাসক্তি প্রচলিত মূল্যবোধ, নতুন প্রজম্মের নেতৃত্ব, জীবনশৈলী ও অর্থনীতির প্রভূত ব্যাপক ক্ষতি করছে। মাদকবিরোধী আন্দোলনকে আরো বেগবান ও তরান্বিত করা দরকার।

হলদিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ শাহ আলম বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার মাদকের বিরম্নদ্ধে দেশব্যাপি জিরো ট্রলারেন্স ঘোষাণা করেছেন। কারণ মাদকাসক্ত জাতি কখনো একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন করে না। এটা অনুধাবন করে আমাদের নেত্রী মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান করেছেন।

পরিছন্ন উখিয়া গড়ি (পউগ) এর নেতা ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলম মাহবুব জানান, মাদকের কারণে শুধু যে মাদকাসক্ত ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্থ হয় তা নয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তির বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবার জীবনে এর প্রভাব পড়ে।

কোটবাজার রত্নাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল গফুর সওদাগর বলেন, নেশায় আসক্ত ব্যক্তিরা অর্থ জোগাড় করার জন্য বিভিন্ন আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অবনতির মত ঘটনার জন্ম দিয়ে থাকেন। যা প্রতিনিয়তই কোথাও না কোথাও ঘটছে। যেমন- চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, হামলা, মারধরসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তা নির্মূলে কাজ করতে হবে।

উখিয়া থানার ওসি মোঃ আবুল খায়ের বলেন, মাদক নির্মূলে পুলিশ সব সময় তৎপর রয়েছে। ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যেই অর্ধশতাধিক ইয়াবা ও মাদক পাচারকারীকে গ্রেফতার করতে পুলিশ সক্ষম হয়েছে।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর কর্মকর্তা এস আই আজাদ বলেন, লোকবল সংকট ও যানবাহন সংকটের কারণে উখিয়া টেকনাফের বিশাল সীমান্ত জনপদের মাদকের ভয়াবহতা থামানো যাচ্ছে না। ফলে কিছুটা নাগলের ভিতরেই পাওয়া যাচ্ছে। তবে মাদক প্রতিরোধে সব সময় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাঈন উদ্দিন বলেন, মাদক পাচারকারীকে ভ্রাম্যমান অভিযানের মাধ্যমে সাজা দিয়ে জেল হাজতে পাঠানো হয়। ২০১৫ সালে ১৩ ডিসেম্বর মরিচ্যা লাল ব্রীজ থেকে পালংখালী পর্যন্ত মাদক প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশাল মানব বন্ধনের আয়োজন করা হয়। কিন্তু তারপরও মাদকের সহজ লভ্যতা রোধ করা যাচ্ছে না।