ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুন ২০২২

মহেশখালী ঘিরে শুরু হয়েছে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ

প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৮ ১৭:৪৩:৫২ || আপডেট: ২০১৭-০১-০৮ ১৭:৪৩:৫২

মহেশখালী ঘিরে শুরু হয়েছে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ

আবদুর রাজ্জাক,কক্সবাজার::

পর্যটন নগরী কক্সবাজার সংলগ্ন মহেশখালী দ্বীপ ঘিরে দেশী-বিদেশী অর্থায়নে উন্নয়নের যে মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে তাতে শুধু এলাকা নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে মহেশখালী দ্বীপ এলাকা ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে এলএনজি, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত প্রকল্প। ‘বাংলাদেশ-জাপান কম্প্রিহেনসিভ পার্টনারশিপ’ সমঝোতার আওতায় এ কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। কর্মসূচীর নাম দেয়া হয়েছে বিগ-বি বা বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট। এর আগে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন হয়েছে এ দ্বীপের সোনাদিয়া পয়েন্টে। দেশী-বিদেশী পরামর্শক ও অর্থায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত প্রকল্পের কাজ। দ্বীপের মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, কয়লা আমদানির জন্য জেটি নির্মাণ, মাতারবাড়ি থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিদ্যুত সঞ্চালন লাইন স্থাপন, কক্সবাজার থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত সমুদ্রের ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণ এবং মাতারবাড়ি ইউনিয়নকে একটি টাউনশিপ হিসেবে গড়ে তুলতে অর্থায়ন করবে জাপান সরকার। এজন্য জাপান সরকার খরচ করবে বিপুল অঙ্কের অর্থ। জাপান সরকার বিগ-বি প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে যাবতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মাতারবাড়িকে দেশের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের মধ্যে বিদ্যমান সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শিল্প ও বাণিজ্যের উপযোগী করে ঢেলে সাজা হবে। পরবর্তীতে এর বিস্তৃতি ঘটবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে। এ কর্মসূচীর মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকায় একটি ইন্ডাস্ট্রিাল বেল্ট প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রস্তাবিত বেল্টটির জন্য মাতারবাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুত সরবরাহ করা হবে। কর্মসূচীর আওতায় সরকারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শিল্প স্থাপনের জন্য একটি ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে জাইকার কাছে।

সূত্র জানায়, মাতারবাড়ি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে জাপান দেবে ৪০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। দশ বছরের রেয়াতি সময়সহ এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে ৪০ বছরে। এ সুদের পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিগ-বি’র মাধ্যমে শিল্প  স্থাপনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা হলে বাংলাদেশের অফুরন্ত সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এদেশের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের উপরে নিয়ে যাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এলএনজি পাইপ প্রকল্প:- বৃহত্তর চট্টগ্রামে গ্যাস সঙ্কট নিরসনে এলএনজি গ্যাস পাইপ মহেশখালী-পেকুয়া-আনোয়ারা পয়েন্ট পর্যন্ত টার্গেট নিয়ে কাজ চলছে। প্রায় ৯৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এর মাধ্যমে দৈনিক ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। দীর্ঘ এ পাইপলাইন স্থাপনে ৫টি কোম্পানি নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে। ৬ হাজার ৭শ’ মিটার দীর্ঘ পাইপলাইনটি মহেশখালী খোয়ানকের ধলঘাটপাড়া হয়ে পশ্চিমে এলএনজি টার্মিনাল পর্যন্ত প্রকল্প কাজ বাস্তবায়ন করবে দীপন গ্রুপ। পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ পেয়েছে অপর চারটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে- টেকনিক গ্রুপ, পিইএল, ম্যাক্সসুয়েল ও গ্যাসমিন। দীপন গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, পাইপলাইন স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এদিকে, মহেশখালী-মাতারবাড়ি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য তিনটি সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এসব পাইপলাইন নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে ‘বিদ্যুত ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ এর আওতায়।সূত্র জানায়, দেশের গ্যাস ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানির মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আমদানিকৃত এ গ্যাস খালাসের জন্য মহেশখালী-মাতারবাড়ি পয়েন্ট দিয়ে সবচেয়ে উত্তম হিসেবে বিশেষজ্ঞ মতামত পাওয়ার পর সরকার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিদেশ থেকে আমদানি করা তরল গ্যাস চট্টগ্রাম অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত গ্যাস জাতীয় গ্যাস গ্রিডের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।

মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প:-মহেশখালীর মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন অনুযায়ী এতে ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। একনেকে এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। এতে জাইকা থেকে ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি, সরকার থেকে ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৬৬ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার ১১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা যোগান দেয়া হবে। প্রকল্প এলাকা চিহ্নিত হয়েছে উপজেলার মাতারবাড়ি ও ধলঘাট ইউনিয়ন। মাতারবাড়ি আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হলে এখান থেকে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১২শ’ মেগাওয়াট। ৬শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতা সম্পূর্ণ পৃথক দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদিত হবে।এদিকে, মহেশখালীর মাতারবাড়িকে ঘিরে সরকারের উন্নয়নের মেগা প্রকল্পের কারণে একে ঘিরে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা করছে বিশেষজ্ঞরা। ইতোমধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানী রাষ্ট্রদূত, জাইকা প্রতিনিধি, মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ প্রধান এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে যে ক’টি উপকূলীয় দ্বীপ রয়েছে তন্মধ্যে মহেশখালী অন্যতম। ৩৬২ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার জুড়ে এ দ্বীপটি পর্যটন নগরী কক্সবাজার সংলগ্ন। জোয়ারের সময় কক্সবাজারের সঙ্গে দ্বীপটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর ভাটার সময় কক্সবাজারের মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্ত থাকে। বর্তমান সরকার গৃহীত উন্নয়নের এ মহাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে এলাকার মানুষের মাঝে উল্লাসের শেষ নেই। অজপাড়াগাঁয়ে গড়ে উঠছে টাউনশিপ। আর সোনাদিয়ায় প্রস্তাবিত সেই গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠা বাস্তবে রূপায়িত হলে দেশের সমুদ্র বাণিজ্যের চেহারাই পাল্টে যাবার পাশাপাশি অর্থনীতিতে আসবে আমূল পরিবর্তন। অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে সরকারের এসব মেগা প্রকল্প গ্রহণে সায় দিয়েছে জাইকাসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা। এসব প্রকল্প যখন বাস্তবায়ন হবে তখন বৃহত্তর চট্টগ্রামের গ্যাস ও বিদ্যুত চাহিদার ঘাটতির অবসান ঘটার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও জাতীয় গ্যাস ও বিদ্যুত গ্রিডের মাধ্যমে সঞ্চালিত হবে সেখানকার উৎপাদিত বিদ্যুত ও আমদানির এলএনজি গ্যাস।