ঢাকা, রোববার, ৩ জুলাই ২০২২

প্রতিবন্ধীদের অর্থ আত্মসাৎকারী নানা অপকর্মের হোতা কমলা সেন চাকমা

প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৬ ১৩:৫২:১৩ || আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ১৩:৫২:১৩

প্রতিবন্ধীদের অর্থ আত্মসাৎকারী নানা অপকর্মের হোতা কমলা সেন চাকমা

নির্মল বড়ুয়া মিলন, রাঙামাটি :: রাঙামাটি পার্বত্য জেলার স্থানীয় একটি বেসরকারী প্রতিবন্ধী সংস্থার পরিচালক কমলা সেন চাকমার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধীত্বের দোহাই দিয়ে নানা ধরনের প্রতারনাসহ সরকারী জায়গা বেদখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলার স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবন্ধী ভুক্তভোগী ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ অভিযোগ করেন।

ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, কমলা সেন চাকমা একজন সাবেক শান্তি বাহিনীর সদস্য থাকা কালীন ১৯৮৮ সালে সেনাবাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে তার ডানপায়ে গুলি লেগে আহত হন। পরে সুস্থ হলেও সেই পা আর স্বাভাবিক পায়ের মত সচল না হওয়ায় পার্বত্য চুক্তির পর তিনি প্রতিবন্ধী সনদপত্র নিয়ে প্রতিবন্ধীদের খাতায় নাম লেখান। সেই সুবাদে পার্বত্য প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা নামে একটি উন্নয়ন সংস্থা পরিচালনা শুরু করেন।

২০০৪ সালে ডিসেম্বর ২৬ তারিখ সমাজ সেবা অধিদপ্তর থেকে তিনি সংস্থাটির নিবন্ধন নেন। সংস্থাটি প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা সেবা ও আর্থিক সাহায্য প্রদান ইত্যাদি প্রতিবন্ধী বান্ধব কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে কমলা সেন চাকমা পরিচালিত সংস্থাটির নিবন্ধন নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায় কমলাসেন চাকমা’র পার্বত্য প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা মুলত জায়গা দখলবাজি, সরকারী সংস্থা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা থেকে অর্থ আত্মসাতের মোক্ষম অস্ত্রমাত্র, সংস্থাটি প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে তেমন কোন ভুমিকা রাখতে পারেনি এবং যেভাবে বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা সেবা ও আর্থিক সাহায্য প্রদান করাসহ সর্বোপরি প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ করেছেন সেভাবে কার্যক্রম ও পরিচালিত হয়নি বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান কয়েকজন কমলাসেন চাকমা’র পরিচালিত সংস্থার সাথে জড়িত ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী।

স্থানীয় প্রতিবন্ধীরা জানান, পার্বত্য প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা প্রতিবন্ধীদের জন্য নয়, এটি কমলাসেন চাকমা’র ব্যক্তিগতভাবে জায়গা দখল ও অর্থ আত্মসাতের হাতিয়ার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পার্বত্য প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থার নাম ভাঙ্গিয়ে স্থানীয় একজন আইনজিবির যোগসাজসে কমলাসেন চাকমা বর্তমান যে স্থানে উপজাতীয় কাঠ ব্যবসায়ি ও জোত মালিক সমিতি জায়গা ক্রয় করে স্থাপনা নির্মান করেছে সে জায়গা প্রথমে ২০০১ সালে কল্যাণপুরে ঠিকাদার কলিমউল্লার প্রায় ২০ শতকের জায়গা দখল করে ব্যক্তিগতভাবে ১বছর ভোগ দখল করার পর কয়েক লক্ষ টাকায় বিক্রি করে দেন।

এরপর কৌশলে নিজে প্রতিবন্ধী সেজে এবং প্রতিবন্ধীদের দোহায় দিয়ে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল সরকারী রাস্তার জায়গা দখল করে তার সংস্থার সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দেন, এসময় প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করার কথা বলে সহানুভুতি দেখিয়ে চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশিষ রায় সেই স্থানের দেড় শতক জায়গা বন্দোবস্তির সুপারিশ দেন। পার্বত্য প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থার সাইনবোর্ড নিয়ে সুপারিশ পেয়ে কমলাসেন চাকমা সেখানে স্বপরিবারে বসবাস শুরু করে এক পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ষ্টোর নামে দোকান চালু করেন এবং নিজেই বিভিন্ন ষ্টেশনারী মালামাল নিয়ে দোকানদারী করেন বেশ কয়েক বছর।

এরপর অতি গোপনে সরকারি দখলকৃত জায়গাটি রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের এম্বুল্যান্স ড্রাইভার ভুপাল বড়ুয়ার কাছ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়ে কিছু দিন গা ঢাকা দেয়। এর পর দখল করেন রাঙামাটি কলেজ গেইট এলাকার সড়ক ও জনপথ বিভাগের আরো ৩শতক জায়গা। প্রতিবন্ধীদের নাম বিক্রি করে কমলা সেন চাকমা’রএমন দখলবাজির চরিত্র, ক্ষোভ প্রকাশ করে বর্ননা করেন একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।

অনুসন্ধান কালিন রাঙামাটি শহরের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিনিধিকে জানান,স্বঘোষিত প্রতিবন্ধী কমলা সেন চাকমা’র দেখা মিলে ২০০১ সালের দিকে রাঙামাটি শহরে সে প্রতিবন্ধী সেজে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছে।

চতুর কমলা সেন চাকমা ও তার পুরো পরিবার খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহন করে এখন আবার বৌদ্ধ ধর্ম পালন করে এটা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা এবং প্রতারনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কমলা সেন চাকমা প্রতিবন্ধীদের নাম বিক্রি করে ক্ষুদ্র নৃ – গোষ্ঠী (আদিবাসি) কোটায় জাতি সংঘের আর্থিক সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রে ১টি সেমিনারে অংশ গ্রহন করে প্রতিবন্ধী থেকে রাতারাতি প্রতিবন্ধীদের নেতা বনে যায়। কমলা সেন চাকমা সেই সেমিনারের বই আর ছবি দেখিয়ে প্রতিবন্ধীদের যুক্তরাষ্ট্রে (আমেরিকা) নিয়ে যাওয়ার কথা বলে প্রতারনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানাযায়।

এলাকার লোকজনকে সেই সেমিনারের বই আর ছবি দেখিয়ে ২০১৪ সালে নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাচনে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে। এলাকাবাসি কমলা সেন চাকমা’র আসল রুপ জেনে তাকে প্রত্যাখান করেন। উপজেলা নির্বাচনে ভরাডুবি হয় প্রতিবন্ধীদের নেতা কমলা সেন চাকমা’র।

কমলা সেন চাকমা’র গ্রামের বাড়ি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের কৃষ্ণমাছড়া গ্রামে। সে কখনো ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর মেজর, আবার কখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর নেতা আবার কখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-সংস্কাপন্থি) পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সময়ে মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছ থেকে সুযোগ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছে বলে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পদবির এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান। ওসি বলেন কমলা সেন চাকমা প্রতিবন্ধী হলে তার নাম সমাজ সেবা অধিদপ্তরের গেজেটে বা তালিকায় থাকার কথা,কিন্তু তার নাম নাই। চোরাই মোটরসাইকেলসহ তার ছেলেকে থানা থেকে ছাড়াতে গিয়ে কমলা সেন চাকমা কথায় কথায় পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতাদের নাম বিক্রয় করে বলে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন।

এসব অপকর্ম করে অর্থ উপার্জন করে ইতোমধ্যে তার নেশাখোর ছেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে (আমেরিকা) পার করে দিয়েছেন।

স্বঘোষিত প্রতিবন্ধী নেতা কমলা সেন চাকমা’র একাধিক স্ত্রী’র কথা তার গ্রামের বাড়ি কৃষ্ণমাছড়া গ্রামবাসি ও আত্মীয়রা জানান।

কলেজ গেইট এলাকার সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৩শতক সরকারি জায়গা দখলের বিষয়ে কমলা সেন চাকমা স্থানীয়দের বলে বেড়ান, এই জায়গা তাকে স্থানীয় একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের প্রধান বরাদ্ধ দিয়েছে, যাহা ডাহা মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকারি জায়গা বা ভুমি যে কোন রাজনৈতিক দলের প্রধানের বরাদ্ধ দেয়ার নজির দেশের প্রচলিত আইনে নাই।

হাসপাতাল সড়কের জায়গা বিক্রয় করে চলে যাওয়ার পর থেকে স্বঘোষিত প্রতিবন্ধী কমলা সেন চাকমা লোকচক্ষের আড়ালে থাকেন বলে কলেজ গেইট এলাকার লোকজন জানান। সে এখন জায়গা বিক্রয় দালাল চক্রের সক্রিয় সদস্য, চোরাই মোটর সাইকেল ও ইয়াবা বিক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে বলে জানাযায়।

সাবেক শান্তি বাহিনীর সদস্য স্বঘোষিত প্রতিবন্ধী নেতা কমলা সেন চাকমা ঠিকাদার কলিমউল্লার জায়গা আত্মসাৎ করে, সরকারি হাসপাতালের সড়কের জায়গা জবদখল করে দোকান ঘর নির্মান করে বিক্রয় করা, প্রতিবন্ধীদের নাম ভাঙ্গিয়ে লক্ষ – লক্ষ টাকা আত্মসাৎকারি ও প্রতারনাসহ নানা অপকর্মের হোতা হওয়ার পরও কি ভাবে স্থানীয় আইনশৃংখলা বাহিনীর চোখে ফাকি দিয়ে ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে নির্বিঘœ তার অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে । আসল রহস্য কি ?

স্থানীয় এলাকাবাসি ও প্রতারিত প্রতিবন্ধীরা তাদের অর্থ আত্মসাৎকারী বিভিন্ন অপকর্মের হোতা কমলা সেন চাকমাকে আইনের আওতায় এনে তার পরিচালিত পার্বত্য প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা নামের প্রতিষ্ঠানটি কালো তালিকাভুক্ত করে নিবন্ধন বাতিলের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন।