ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২

রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীলতার কারণে কক্সবাজারে লাখো পর্যটকের সমাগম॥

প্রকাশ: ২০১৭-০১-০২ ২০:১৮:০৪ || আপডেট: ২০১৭-০১-০২ ২০:১৮:০৪

রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীলতার কারণে কক্সবাজারে লাখো পর্যটকের সমাগম॥

আবদুর রাজ্জাক,কক্সবাজার::“

শনিবার সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে কালের গর্ভে নিমিষেই হারিয়ে গেল ২০১৬ সাল। রোববার উদিত হয়েছে ২০১৭ সালের নতুন সূর্য। ২০১৬ কে পেছনে ফেলে সূর্যের শেষ প্রস্থান দেখতে বছরের শেষ সপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার সকাল থেকে কক্সবাজার সাগরমুখী মানুষের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীলতা ও আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় গত সপ্তাহ ধরে পর্যটন মৌসুমে বিজয় দিবস ও থার্টিফাস্ট নাইট উপলক্ষ্যে প্রায় তিন লাখ পর্যটকের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে বিশ্বের র্দীঘতম সমুদ্র সৈকত পর্যটন নগরী কক্সবাজারে । পর্যটকদের উচ্ছ্বাস যেন নব উদ্যমে রাঙ্গিয়ে তুলেছে কক্সবাজারকে। এতে করে সমুদ্র সৈকত ছাড়াও জেলার পর্যটন স্পটগুলো মুখরিত হয়ে উঠেছে পর্যটকের পদভারে। দেশী-বিদেশী বিপুল পর্যটকের আগমনকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে এখানকার পর্যটন শিল্প। বিজয় দিবস বর্ষবরণকে স্বাগত জানাতে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে আয়োজন করা হয়েছিল বর্ণিল অনুষ্ঠানের। এসব আয়োজনে অংশ নিয়ে ইতিহাসের ধারক হতে সৈকত নগরীতে অবস্থান নেন প্রায় তিল লাখ পর্যটক। খালি ছিল না শহরের হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস ও কটেজের কক্ষ।থার্টি ফার্স্ট নাইটকে ঘিরে গত কয়েকদিন থেকে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না কক্সবাজারে। পর্যটকে টইটম্বুর পর্যটন রাজধানীর সর্বত্র।এ আশানুরূপ পর্যটকের উপস্থিতিতে কক্সবাজারে পযংটন শীল্পে প্রায় শতকোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে জানান পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা জানান, বিজয় দিবস ও থার্টিফাস্ট নাইট উপলক্ষ্যে গত ১২ ডিসেম্বর থেকে সব হোটেল-মোটেল ও গেষ্টহাউজের শতাভাগ রুম বুকিং হয়ে গেছে। ছোট থেকে বড় কোন হোটেল-মোটেল, গেষ্ট হাউস-কটেজ কিংবা ফ্ল্যাটে তিল ধারণের জায়গা নেই। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও হরতাল-অবরোধ না থাকায় শত কোটি টাকার বাণিজ্যিক লেনদেন হওয়ায় স্বস্থির নি:শ্বাস ফেলছেন এখানকার ছোট-বড়-মাঝারি সকল স্থরের ব্যবসায়ীরা। হোটেল-মোটেল-গেষ্ট হাউস, বার্মিজ মার্কেট থেকে শুরু করে ডিম, আচার বিক্রেতাদের পাশাপাশি বাণিজ্যিক লেনদেন হওয়ায় খুশিতে আত্মহারা সকল স্থরের ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের পেয়ে খুশির ভাগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না বাস-মিনিবাস-রিক্সা-টমটম, সিএনজি থেকে শুরু করে পরিবহণ সেক্টরে বিনিয়োগকারীরাও। তাদের মতে সাগরকন্যা কক্সবাজারে গত কয়েকদিন ধরে আশানুতীত পর্যটকের আগমন হওয়ায় দীর্ঘদিনের লোকসান আর হতাশাকে কাটিয়ে নব উদ্যমে পুরোদমে পর্যটন ব্যবসা চালু হয়ে উঠায় শত কোটি টাকার বাণিজ্যিক লেনদেন হয়েছে বলে জানান। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীলতা ও আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার কারণে ব্যাপক পর্যটক সমাগম হয়েছে বলে মনে করছেন এখানকার সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। বীচপার্ক মার্কেট মালিক বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন-বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীল অবস্থার কারণে এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ব্যবসায়ীরা সুন্দর মতো ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। ফলে স্বস্থিতে দিন কাটাতে পারছে ব্যবসায়ীরা। শহরের বার্মিজ মার্কেটের একাধিক পানের দোকানদারেরা জানান,দীর্ঘদিন পর পর্যটকের মুখ দেখায় তাদের পানের দোকানে দৈনিক আগে যেখানে কয়েক’শ টাকা বিক্রি হতো সেখানে বর্তমানে কয়েক হাজার টাকার বিকিকিনি করতে পেরে ভীষণ খুশি। একই সুরে শহরের পাশ্ববর্তী ঝিলংযা ইউনিয়নের রিক্সা চালক করিম বলেন,পর্যটকদের বহন করে দৈনিক এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সুখে দিনাদিপাত করছি।

এদিকে আবাসন, ভোগবিলাস, ট্রান্সপোর্ট, ইন্টারটেইনমেন্টসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় এ বাণিজ্য হয়েছে বলে মন্তব্য করেন কক্সবাজার চেম্বার সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা।তিনি বলেন, হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস ও কটেজ এবং রেস্ট হাউস মালিক কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, কক্সবাজারে অর্ধসহস্রাধিক আবাসন সেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেখানে লাখো মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা করা যায়। সৈকত তীরে আসা ভ্রমণপিপাসুদের আহার সংস্থানে রয়েছে অভিজাতসহ বিভিন্ন ধরনের কয়েকশ রেস্তোরাঁ।যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত যানবাহন ছিল। বর্ষবিদায় ও বরণ উপলক্ষে তিনদিন ধরে সৈকতে অবস্থান করা লাখো পর্যটক পর্যটন সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণ করেছে। সব মিলিয়ে গড় হিসাবে দৈনিক ৩০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে।ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ভ্রমণপিপাসু সেন্টমার্টিন গেছেন। জাহাজ অনুসারে টিকিটের মূল্যের তারতম্য বিবেচনা করে গড়ে পার টিকিট এক হাজার টাকা হলে শুধু টিকিট মূল্য এসেছে প্রায় কোটি টাকা।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, আয়ের বাড়তি জোগান দিয়েছে হোটেল-মোটেল জোনে চলমান কক্সবাজার শিল্প ও বাণিজ্য মেলা। সন্ধ্যার পর থেকে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা ভিড় জমান মেলায়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নাগরদোলা, নৌকা ও রেল রাইডসে চড়ার পাশাপাশি জাদু, মোটরসাইকেল গেম দেখে এবং পরিবার ও নিজের প্রয়োজনীয় নানা পণ্য সামগ্রী ক্রয় করেছেন আগতরা।শনি ও রোববার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মেলায় আসেন বলে জানান আয়োজক কমিটির প্রধান সমন্বয়ক সাহেদ আলী সাহেদ।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেষ্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব আবুল কাশেম সিকদার বলেন-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় এবার বিপুল পর্যটকের সমাগম হয়েছে কক্সবাজারে। পর্যটকদের আগমনে অতীতের লোকসান পুষিয়ে এখন আমরা লাভের মুখ দেখতে পেয়ে ভিষণ খুশি। পর্যটকদের আগমনে লাভের মুখে রয়েছে পরিবহণ সেক্টরও। কক্সবাজার ঝিনুক শিল্প বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি কাসিম আলী জানান-পর্যটকদের আগমনে ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের সাথে জড়িত পর্যটন নির্ভর কয়েক হাজার পরিবারের মাঝে স্বস্থি ফিরে এসেছে। শুধু কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত নয়, দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পথভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে জেলার দর্শনীয় পর্যটন স্পটগুলো। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সীমাবদ্ধ না রেখে তা ছড়িয়ে পড়েছে ইনানী পাথুরে বীচ, হিমছড়ির অপরুপ ঝর্ণা, দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন, দরিয়ানগর, রামুর নব-নির্মিত বৌদ্ধ বিহার, আদিনাথ মন্দিরের অপরুপ সৌন্দর্যের মাঝে।

কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনসহ ভ্রমণে আসা পর্যটকে ভরে গেছে কক্সবাজার। গত কয়েক দিনের পর্যটক পরিস্থিতি একই রকম রয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর এসেছে। এতে বাণিজ্য ভালো হওয়ারই কথা। সরকারের ইচ্ছা কক্সবাজারকে পর্যটনের প্রধান গন্তব্য হিসেবে তৈরি করা।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমেদ বলেন, বড়দিনের ছুটিসহ থার্টি ফার্স্ট নাইটের লোকারণ্য কক্সবাজারের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। ফলে কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে হোটেল-মোটেল জোন ও শহরের প্রধান এবং উপ-সড়কে ট্রাফিক জ্যাম ছিল ভোগান্তির পর্যায়ে।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব,বিজিবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাদা পোষাকে পুরুষ-মহিলা পর্যটক বেশে পর্যটন নগরী সমুদ্র সৈকতসহ পুরো কক্সবাজারে অবস্থান করায় কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিজয় দিবস ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষ হয়।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রায়হান কাজেমী বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, ইনানী, হিমছড়ি টেকনাফ সৈকত ও সেন্টমার্টিনে ট্যুরিষ্ট পুলিশের একাধিক টহল দল সার্বক্ষণিক নিয়োজিত নিয়োজিত থাকায় কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিজয় দিবস ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষ হয় ।