ঢাকা, সোমবার, ৪ জুলাই ২০২২

বর কনের বয়স নিয়ে বিতর্ক : পিছু ছাড়ছেনা নারীবাদীরা

প্রকাশ: ২০১৫-১২-১৯ ১৮:৫১:২৪ || আপডেট: ২০১৫-১২-১৯ ১৮:৫১:২৪

kazi farid

মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন :

সরকার বর কনের নূন্যতম বয়স ২১ ও ১৮বছর বহাল রেখে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৫ এর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দিলেও কনের বয়স নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। নারীবাদীরা বর-কনের বিবাহের নুন্যতম বয়স বাড়িয়ে কার্যত বিবাহ প্রথাকেই জটিল ও বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। তাদের কারো দাবী বরের নুন্যতম বয়স ২৩ কনের বয়স ২১ বছর, আবার কারো দাবী বরের নুন্যতম বয়স ২৫ কনের নুন্যতম বয়স ২৩ বছর। এ ধরনের উদ্দেশ্য মূলক আবদারে সরকারকে বাধ্য করতে মহামান্য হাইকোর্টে রীট পিটিশন দায়ের করতেও কসুর করেনি তারা।

তাদের মনগড়া আবদারে সরকার নতি স্বীকার না করায় শেষ পর্যন্ত অন্তত: বরের বয়স ২১ ও কনের বয়স ১৮ শর্তহীন ভাবে বহাল রাখার আবদার করছেন। তাদের অসহায়ত্ব দেখে মায়া লাগাটা স্বাভাবিক। মূলত: তারা বাল্য বিবাহ বন্ধের নামে বিবাহ প্রথাকেই বিতর্কিত করে বাংলাদেশের পরিবার প্রথাকে ভেঙ্গে দিয়ে বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচারের প্রসার ঘটিয়ে লীভ টুগেদারে উৎসাহিত করছে নানা ভাবে, তাই তাদের বাল্য বিবাহ (ঈযরষফ গধৎৎরধমব) এর সাথে জোর পূর্বক বিবাহ (ঋড়ঁৎপব গধৎৎরধমব) তত্ত্ব নিয়ে গনমাধ্যমে সোচ্ছার হতে দেখা যায়। তাদের উদ্দেশ্য বাল্য বিবাহ বন্ধ করে জনমানুষের কল্যাণ নয় বরং বিবাহ প্রথাকে বিতর্কিত করে বাংলাদেশে বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচারের অভয়ারন্য সৃষ্টি করা।

১৯২৯ সালের বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনে বিবাহের আইনগত বয়স বরের ১৮ বছর ও কনের ১৬ বছর নির্ধারিত ছিল। ১৯৮৪ সালে উক্ত বয়স সংশোধন পূর্বক বরের বয়স ২১বছর ও কনের বয়স ১৮ বছর নির্ধারন কর হয়। দেশের আর্থসামাজিক, জলবায়ু ও ভৌগলিক অবস্থা বিবেচনায় সংশোধিত বয়স ২১ ও ১৮ বছর প্রয়োগ কঠিন হওয়ায় সরকার বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সমন্বয় করে বরের বয়স ২১ ও কনের বয়স ১৮ বছর বহাল রেখে বিশেষ ক্ষেত্রে তথা ‘‘কোন বিশেষ কারন থাকিলে অথবা বিশেষ কারনের উদ্ভব হইলে পিতা-মাতা বা অভিভাবকের সম্মতি অথবা আদালতের অনুমতিক্রমে ১৬ (ষোল) বৎসর পূর্ন করিয়াছেন এমন কোন নারীর সহিত ২১(একুশ) বা তদুর্ধ বৎসরের অধিক বয়স্ক কোন পুরুষের বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা বাল্য বিবাহ বলিয়া গন্য হইবেনা” মর্মে বিকল্প বিধান সম্বলিত নতুন ধারা সংযোজন করেছেন।

এতে দেশে বিবাহ জনিত সামাজিক সমস্যা হ্রাস পাবে এতে সন্দেহ নেই। সরকারের এই বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্তের প্রতি আপামর জনতার সমর্থন রয়েছে। প্রতিটি আইনেই বিকল্প ব্যবস্থা থাকা বাঞ্চনীয়, নতুবা আইনী জটিলতায় সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। দেশের বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে কম বয়সী ছেলে মেয়েরা বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে অন্তস্বত্ত্বা হয়ে পড়ে, সামাজিক বাস্তবতায় তাদের বিবাহ ছাড়া গত্যন্তর না থাকলেও আইন এ ক্ষেত্রে নিরব।

১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের বিবাহ নিবন্ধনের কোন সুযোগ না থাকায় অহরহ সমাজিক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার এই বাস্তবতা উপলদ্ধি করেই কনের বয়সের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা রেখে আইনের খসড়া চুড়ান্ত করে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। এতে দ্বিমত পোষন করার সুযোগ নেই। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই বিবাহের নুন্যতম বয়স বরের ১৮ ও কনের ১৮/১৭/১৬/ ১৫/ ১৪/১৩ আবার কোন দেশে বর কনের বিবাহের নুন্যতম বয়স নির্ধারিত নেই।

উইকিপিড়িয়ার সৌজন্যে জানা যায়, বাংলাদেশ এবং ভারতে বিবাহের নুন্যতম বয়স ২১/১৮, তবে ভারতের হাইকোর্ট ২০১২সালে এক আদেশে বলেছে মুসলিম মেয়েদের ১৫বছর বয়সে বিয়ে দেয়া যাবে। হংকংএ বর ২১ কনে ১৬ পিতা-মাতার সম্মতিসহ, ইন্দোনেশীয়ায় বর ১৯ কনে ১৬, ইরানে বর ১৫ কনে ১৩, ইরাকে বর ১৮ কনে ১৫, পিতা-মাতার সম্মতি ও আদলতের অনুমতি স্বাপেক্ষে, ইসরাইলে বর কনে ১৮, জাপানে বর ২০ আদালতের অনুমতি স্বাপেক্ষে বর ১৮ কনে ১৬, জর্ডানে বর ১৬ কনে ১৫, কাজাকস্থানে বর ১৮ কনে ১৬ পিতা-মাতার সম্মতি সহ, দক্ষিণ কোরিয়ায় পিতা-মাতার সম্মতি সহ বর ১৮ কনে ১৫, সম্মতি ছাড়া বর কনে ১৮, কুয়েতে বর ১৭ কনে ১৫, খিরগিস্থানে বর কনে ১৮, লেবাননে বর ১৮ কনে ১৭ আদালতের অনুমতি সহ ১৫, মালয়েশিয়ায় বর ২১ কনে ১৮ মুসলিম মেয়েদের আদালতের অনুমতি নিয়ে ১৬ বছরে বিয়ে দেয়া যাবে, মালদ্বীপে বর ১৮ কনে ১৫, নেপাল বর ২১ কনে ১৮ তবে পিতামাতার সম্মতিসহ বর ১৮ কনে ১৫, পাকিস্তানে বর ১৮ কনে ১৬, ফিলিস্তিনে বর ১৬ কনে ১৫, মঙ্গোলিয়ায় বর কনে ১৮, ফিলিপাইনে বর কনে ১৮ তবে মুসলিম ছেলে মেয়েদের জন্য ১৫, রাশিয়ায় বর কনে ১৮ বিশেষ বিবেচনায় ১৬, সৌদি আরবে অনির্ধারিত, সিঙ্গাপুরে বর ২১ কনে পিতা-মাতার সম্মতিসহ ১৮ বিশেষ অনুমতিক্রমে আরো কম, শ্রীলংকায় বর ১৮ কনে ১৮, সিরিয়ায় বর ১৮ কনে ১৭ আদালতের অনুমতি স্বাপেক্ষে বর ১৫ কনে ১৩, থাইওয়ানে বর কনে ২০ পিতা-মাতার সম্মতিসহ বর ১৮ কনে ১৬, থাইলেন্ডে বর কনে ১৭, ওজবেকিস্থানে বর ১৮ কনে ১৭, বিশেষ অবস্থায় বর ১৭ কনে ১৬, ভিয়েতনামে বর ২০ কনে ১৮, ইয়েমেনে বয়স নির্ধারিত নেই।

বাংলাদেশে বিয়ের বয়স বিশেষ ক্ষেত্রে ১৬ নির্ধরণ মানে এই নয় যে, ১৬ বছর বয়স হলেই সব মেয়েদের বিয়ে দিতে হবে। বরং বিরজমান সামাজিক সমস্যা থেকে বাঁচতে সরকার দেশের বাস্তবতা উপলব্ধি করে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যা জাতী, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকলের কাছে সমাধৃত। গোটি কয়েক নারীবাদীরা একদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে অন্য দিকে বিয়ের বয়স ২৫/২৩ ও ২৩/২১ করার জন্য আবদার করছে। তার মানে তারা কি পশ্চিমা ষ্টাইলে বিবাহ প্রথা বন্ধ করে লীভ টু গেদার চালু করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে? বর্তমানে বাল্য বিবাহ ক্রমহ্রাসমান। সরকার শিক্ষাখাতে উপবৃত্তি চালু করার পর থেকে স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্য অনেক বেড়েছে। শিক্ষার হার বাড়লে বাল্য বিবাহ আরো কমে যাবে এতে সন্দেহ নেই।

লেখক- মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, সহকারী অধ্যাপক ও আইন বিষয়ক সম্পাদক- বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ রেজিষ্ট্রার সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি। মোবাইল- ০১৮১৮- ৮৫ ০৩ ৪৯।